নৃত্যশিল্প নিয়ে যোগ্য আলোচনা-সমালোচনা কি বিলুপ্তির পথে?


পর্ব ২১

নিশশো পঁচানব্বই সাল নাগাদ সর্বভারতীয় এক ইংরেজি দৈনিক ঘোষণা করে তারা আর নৃত্যশিল্পের কোনও আলোচনা-সমালোচনা তাদের কাগজে ছাপবে না। সংগীতানুষ্ঠানের আলোচনা ছাপা হবে, নাটক-সিনেমার সমালোচনা লেখা হবে কিন্তু বাদ থাকবে কেবল নৃত্যশিল্প। এবং সেই প্রখ্যাত দৈনিকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তারপর হাতে গোনা কয়েকটা কাগজ ছাড়া প্রায় সব দৈনিকই নাচ নিয়ে কিংবা নাচের অনুষ্ঠান নিয়ে কোনও রকম আলোচনা-সমালোচনাকে নিজেদের কাগজে আর স্থান দিল না। হয়তো কবে, কোন অনুষ্ঠান, কোথায় হবে- সেসবের তথ্য জানানো হলো কিন্তু নাচ অবলোকন করে তার একটা সমালোচনা-সাহিত্য তেমন করে আর লেখা হলো না। এতে ভারতীয় নৃত্যজগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছিল এ নিয়ে আজ আর কোনও সন্দেহ নেই।

কিন্তু কী কারণে নৃত্যালোচনা বন্ধের সিদ্ধান্ত? জানা যায় ভারতবর্ষে নৃত্যশিল্পের সমালোচনা বিশেষত শাস্ত্রীয়নৃত্যের, একটি অতীব কঠিন কাজ। একজন শিল্পী মঞ্চে কোন আইটেম নাচলেন কেবল সেই তথ্য হাজির করাকে নৃত্যসমালোচনা হিসেবে চিহ্নিত করার যে রেওয়াজ তার কথা বলছি না; বলছি নৃত্যশিল্পী ও সাধারণ দর্শকের মধ্যে একটা সেতু গড়ে দেবার কাজ যে লেখা করে, তার কথা। একে তো ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যগুলি একে অপরের থেকে শৈলীগত দিকে বহু যোজন দূরে, দ্বিতীয়ত তার যে সাহিত্যের ভাষা সেটাও শিক্ষিত দর্শক না হলে উপলব্ধি করা মুশকিল। ধরুন, মহাভারতের কোনও কাহিনি নৃত্যশিল্পী অভিনয় করছেন। কিন্তু কোনও দর্শক অভ্যন্তরীন কাহিনিটা, মহাভারত মহাকাব্যটি যদি না জানেন তবে তার পক্ষে সে-অভিনয়ের রসাস্বাদন সহজ হবে না। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের আকছার হয়ে থাকে। আবার শুদ্ধ নৃত্যের যে জায়গাগুলো সেই তাল, সেই ছন্দ যদি দর্শকের খানিক জানা না থাকে তবে শিল্পের গহনে ডুব দিতে পারা মুশকিল। অতএব শাস্ত্রীয়নৃত্য ও সাধারণ দর্শকের মধ্যেকার যে দূরত্ব তা কেবল ঘোচাতে পারে একজন দক্ষ সমালোচকের লেখনীই।

যোগ্য সমালোচকের অভাবে শাস্ত্রীয়নৃত্যের যে জগৎ তা সাধারণ দর্শকের কাছে উন্মুক্ত হতে পারে না। চিত্রশিল্প, নাটক, সিনেমাতেও হয়তো প্রাথমিকভাবে এই অসুবিধা ছিল কিন্তু এত বহুমাত্রিক বিষয়ে এই শিল্পগুলি এগিয়েছে তাতে সাধারণ দর্শক-শ্রোতার সেগুলি বুঝতে পারার পথে অনেক বাধাই সরে গেছে।

যোগ্য সমালোচকের অভাবে শাস্ত্রীয়নৃত্যের যে জগৎ তা সাধারণ দর্শকের কাছে উন্মুক্ত হতে পারে না। চিত্রশিল্প, নাটক, সিনেমাতেও হয়তো প্রাথমিকভাবে এই অসুবিধা ছিল কিন্তু এত বহুমাত্রিক বিষয়ে এই শিল্পগুলি এগিয়েছে তাতে সাধারণ দর্শক-শ্রোতার সেগুলি বুঝতে পারার পথে অনেক বাধাই সরে গেছে। কিন্তু ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে বহুরকম নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। দশকের পর দশক যে নৃত্যসমালোচনা সাহিত্যের শাখা বিস্তার হয়েছে তা তো নয়। সে জন্য সারা ভারত জুড়ে বহু নৃত্য সমালোচক তৈরি হয়েছেন তাও নয়। সুনীল কোঠারি বা তপতী চৌধুরীর যোগ্য উত্তরসূরী তেমন তৈরি হতে পারল কোথায়! তারপরেও অবশ্য লীলা ভেঙ্কটরমণ, শ্যামহরি চক্র, নীতা বিদ্যার্থী, শর্মিলা বসু ঠাকুর, কথাকলি জানা, শিল্পী সাম্ভমূর্তি রয়েছেন। এক সময় নৃত্যশিল্পী চৈতি ঘোষও নৃত্য সমালোচনা সাহিত্যে ভালোরকম নাম করছিলেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রটিতে আরও অনেক নতুন মুখের আসা দরকার ছিল।

দ্বিতীয়ত, নৃত্যসমালোচনা বস্তুটির চলন কেমন হবে? ‘কন্স্ট্রাকটিভ ক্রিটিসিজম’ বলতে আমরা যা বুঝি তা কি শাস্ত্রীয়নৃত্যে প্রয়োগ করা সম্ভব? যেমন অনেক নৃত্য সমালোচক বলে থাকেন ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্য যেহেতু বিশেষ সময় এবং পরিসরে আবদ্ধ এবং পৌরাণিক চরিত্রের নাট্যায়ন তাই নৃত্যশিল্পীরা অনেক সময় কেবলমাত্র ‘প্রশংসা’ই আশা করে থাকেন। কিংবা নৃত্যসমালোচক যদি কখনও ভুল করেও নৃত্যের কোনও বিশেষ অংশের বা সামগ্রিকের আলোচনা করে বলেন যে ‘এই জায়গাটা ঠিক হলো না’ তবে নাকি শিল্পীদের মনে হয় সমালোচক ‘ব্যাপারটা বোঝেনি’।

সমালোচক শিল্পী নন এটা যেমন সত্যি, তেমন এটাও সত্যি যে সমালোচক অবশ্যই রসিক এবং শিল্পে শিক্ষিত হয়েই তিনি এ-পথে পা বাড়িয়েছেন। সমালোচক পাতি দর্শক নন। সত্তরের দশকে সমালোচনা পছন্দ না হলে কোনও কোনও সমালোচক নাকি আইনি নোটিশ পর্যন্ত পেতেন! নৃত্যশিল্পীদের মন রেখে লিখতে গেলে যেমন সমালোচনা-সাহিত্যের মান নেমে যায় তেমনই সাধারণ দর্শকের সঙ্গে শিল্পের সেতুবন্ধনের পথ বাধাপ্রাপ্তও হয়। ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যের জনপ্রিয়তা শাস্ত্রীয়সংগীতের থেকে কম এ নিয়ে আমরা অনুযোগ করি। শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীর পরিশ্রম শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীর থেকে অনেক গুণ বেশি হলেও শাস্ত্রীয়নৃত্যের শিল্পীরা আরও অনেক পরিচিত কেন হচ্ছেন না, কেন তাঁদের নিয়ে আরও বিভিন্ন লেখা হচ্ছে না; এমন অভিযোগ আমাদের চিরকালীন। কিন্তু আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে নৃত্যশিল্প যদি আরও সৃষ্টিশীল সমালোচনার মধ্যে দিয়ে না যায় তবে শিল্পটিই কোনওদিন বিকশিত হতে পারবে না। শুধু শিল্প, শিল্পী আর দর্শক-শ্রোতা নয়, রসিক সমালোচকের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by