শ্রীমতী গৌরী দত্ত : মণিপুরী নৃত্যে গুরু বিপিন সিংয়ের প্রথম বাঙালি ছাত্রী

পর্ব ১৯

“বৃহস্পতিবার দিনটা আমার আজও ভালো লাগে না। এমনই এক বৃহস্পতিবার গুরুজি আমাকে বলেছিলেন রূপ গোস্বামী বিরচিত উজ্জ্বলনীলমণি বইটা কলেজ স্ট্রিটের সংস্কৃত পুস্তকালয় থেকে কিনে আনতে। তখন আমার ফেলোশিপের কাজ চলছে। সপ্তাহান্তে বইটা কিনে গুরুজিকে দিয়ে আসব ঠিক করেছি। কিন্তু হঠাৎ শান্তিনিকেতন থেকে ডাক- একটা দরকারি কাজে। গেলাম। আমি তো তখন প্রতি শুক্রবার বিকেলের ট্রেনে শান্তিনিকেতন যাই, শনিবার ফেলোশিপের কাজ করি, নীলিমা সেনের বাড়িতে নাচের ক্লাস করাই আর রবিবার কলকাতা ফিরি। আমি কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবিনি ওই একটি রবিবার ফিরে গুরুজিকে যে দেখব সেই গুরুজি আর কথা বলবেন না আমার সঙ্গে। গুরুজি ইতিমধ্যে পরপারে চলে যাবেন। আর উজ্জ্বলনীলমণি ধরা থাকবে আমার হাতে। আজও ধরা আছে। গুরুজি হয়তো এই বার্তাই আমাকে দিতে চেয়েছিলেন যে মণিপুরি নৃত্যের নির্যাস আসলে বৈষ্ণবীয় সাহিত্য। গৌরী, তুই ও-বই তোর কাছে রাখিস।”

শ্রীমতী গৌরী দত্ত যে কলকাতায় গুরু বিপিন সিংয়ের প্রথম ছাত্রী সে তো জনবিদিত। গৌরীদি বোধকরি গুরু বিপিন সিংয়ের প্রথম বাঙালি ছাত্রীও।

ঝপ করে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। গৌরীদির শচীশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে আলপনা-আঁকা উঠোনটায় আমি বসে। গৌরীদি অন্য দিকে তাকিয়ে। বুঝতে পারছি গৌরীদি আসলে বিশ বছর আগের সেই দিনটায় এখন চলাফেরা করছেন। গৌরীদির চোখ চিকচিক করছে। আমি প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করি-

– আপনি কি প্রথম থেকেই নাচে এবং মণিপুরিতেই ছিলেন?

– আমি উত্তর কলকাতার হাটখোলা দত্তবাড়ির মেয়ে। নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে ছিল আমাদের আদি বাড়ি। আমার বাবা, জানো, এসরাজকে তারসানাই করে নাদেশ্বর বলে একটা যন্ত্র বাজাতেন। চেলোর আওয়াজ বার করতেন। অনিল কুমার দত্ত বোধকরি ভারতবর্ষে একদম হাতে-গোনা কয়েকজনের একজন, যাঁরা এ যন্ত্র বাজাতেন। বাবা তিমিরবরণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে বাজিয়েছেন। রবিশঙ্করজির সঙ্গে বহুবার দিল্লিতে ছিলেন। একবার তো প্রায় একুশ-বাইশদিন একটানা দিল্লিতে। সংগীত এবং নৃত্যজগতের বহু গুণী মানুষ আমাদের বাড়ি আসতেন। বাবা ধনঞ্জয় মল্লিকের কাছে আমাকে সেতার শিখতে পাঠিয়েছিলেন। আমি লেক স্কুল ফর গার্লসের হায়ার সেকেন্ডারির ছাত্রী তখন। আমাদের সময় স্কুল ফাইনাল ছিল না। তারপর বাংলা নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। বৈষ্ণব পদাবলী আর মঙ্গলকাব্য আমার বিষয় ছিল। একদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে শুনলাম গুরু বিপিন সিং বাড়িতে ঘুরে গেছেন দক্ষিণীর আদিত্য সেনা রাজকুমারকে নিয়ে। তার আগে রানি শঙ্করী লেনে ব্রজবাসী সিঙের কাছে আমি খানিকটা মণিপুরি শিখেছি। উনি ছিলেন শিলচরের কাছাড়ের বাসিন্দা। গুরু বিপিন সিংও ছিলেন ওখানকার বাসিন্দা। ওঁর সঙ্গে দেখা করে বাবা মুগ্ধ। বাবাই আমাকে গুরু বিপিন সিঙের তত্ত্বাবধানে মণিপুরি শিখতে দিলেন। সেই-ই শুরু।

এ কাহিনিটা আমার জানা। শ্রীমতী গৌরী দত্ত যে কলকাতায় গুরু বিপিন সিংয়ের প্রথম ছাত্রী সে তো জনবিদিত। গৌরীদি বোধকরি গুরু বিপিন সিংয়ের প্রথম বাঙালি ছাত্রীও। আমি জিজ্ঞেস করি-

– প্রথমদিকের সেই দিনগুলো কেমন ছিল, গৌরীদি?

– গুরুজির স্নেহ-আশীর্বাদ-ভালোবাসার থেকেও বেশি ছিল কলাবতীদির সাহচর্য। তুমি জানবে গুরুজি তো একজন প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই। আমরা ওঁর হাতে-গড়া। কিন্তু কলাবতীদির মতো নৃত্য-গীত-বাদ্যে পারদর্শী শিল্পী ভারতবর্ষের নৃত্যশিল্পের ইতিহাসেই বিরল। গুরুজি আর কলাবতীদি তখন এস আর রোডের একটা ছোট্ট বাড়িতে থাকতেন। সেটা টালিগঞ্জ ব্রিজের কাছাকাছি। তখন তো কলকাতায় ওঁদের তেমন কেউ চিনতেন না। তখন ওঁদের জীবনসংগ্রাম ছিল মারাত্মক। কিন্তু ওই সময়ই আমি, গুরুজি আর কলাবতীদি নৃত্য-গীত-বাদ্যের মধ্যে দিয়ে কত যে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা কাটিয়েছি, সেইসব দিন এখন মনে হয় অন্য কোনও জন্মের।

– কেমন ছিল সেই শিক্ষা?

– সেই শিক্ষা? সেটা কেবল শিক্ষা নয় গো, একটা যাপন। আর গুরুজির শেখানোর পদ্ধতি হয়তো বা আজকের দিনের মানুষ উপলব্ধি করতে পারবেন না। গুরু বিপিন সিং ছিলেন মানব-ঘড়ি। এতটুকু ক্লাসে দেরি হলে তিনি আর ক্লাস করতে দিতেন না। ক্লাস চলতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। প্রাত্যহিক অন্তত তেরো থেকে চোদ্দ ঘণ্টা। নাচ শেখার পাশাপাশি বাজনা। আর থিয়োরি তো ছিলই। প্রফেশনাল নৃত্যশিল্পী কীভাবে গড়ে ওঠে গুরুজি দেখিয়েছিলেন আমাদের। আজকের শনি-রবিবারের উইকেন্ডের নাচের ক্লাসের যে-প্রজন্ম তারা হয়তো বুঝবে না। নাচের পাশাপাশি গুরুজি বাজনাতেও জোর দিতেন। উনিই আমাকে মণিপুরে গুরু বীরমঙ্গল সিঙের কাছে পাঠিয়েছিলেন মৃদঙ্গ শিখতে। গুরু বীরমঙ্গল সিঙের শিষ্যত্ব আমার সারাজীবন ছিল।

– গৌরীদি! মণিপুরী নর্তনালয় কবে প্রতিষ্ঠিত হল?

– সেটা হল গুরুজি আর কলাবতীদি যখন দেশপ্রিয় পার্কের কাছে বিপিন পাল রোডের বাড়িতে উঠলেন, তখন। মাঝে ওঁরা হাজরার কাছে নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য লেনে ছিলেন। গুরুজি আবার আমার যে নাচের স্কুল মণিপুরী নর্তনাশ্রম সেটাও প্রতিষ্ঠা নিজের হাতেই করেছিলেন। নামটাও ওঁরই দেওয়া। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মতো বিকশিত হবে, সেটাও ওঁর চাহিদা ছিল সব সময়। আমি যেমন ওঁর কাছেই সিনিয়র ফেলোশিপ পেয়েছিলাম। এবং সেই ফেলোশিপে উনি যে কী সাংঘাতিক সাহায্য করেছিলেন তা তো আর বলার নয়। তবে আমি মনে করি গুরুজি সব ছাত্র-ছাত্রীকেই সেই আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। তবে দেখো নাচ যেমন শিখতাম সঙ্গে সংসারটাও তো দেখতে হত। বাবা শিল্পী ছিলেন। শিল্পীদের সম্মান থাকলেও তখনকার দিনে অর্থ তো তেমন ছিল না। আর আমি ছিলাম বাড়ির বড়ো। নর্তনাশ্রমের পাশাপাশি আমি বিড়লা স্কুলে শিখিয়েছি, মিসেস বি.কে বিড়লা নিজে আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। আর তারপরে তো অশোক-হল স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করি। বহুবছর পড়িয়েছি, নাচও শিখিয়েছি। তারপর শান্তিনিকেতনে নীলিমা সেনের বাড়িতে মণিপুরী নর্তনাশ্রমের একটি শাখা তৈরি হয়েছিল। সপ্তাহান্তে সেখানে আমায় যেতেই হত।

আমি উপলব্ধি করি গৌরীদি নীলিমা সেনের বাড়ি হয়ে সেই দুঃখের বৃহস্পতিবারটাতে ফিরবেন। অতএব, অন্য এক প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ি। জিজ্ঞেস করি, আপনার নাচের স্ক্রিপ্ট কেমন হতো? বিষণ্ণ মুখটাতে গৌরীদির খানিকটা আলো খেলে যায়। উনি বলেন-

– সেটাও গুরুজিই। আমার স্ক্রিপ্ট, কেনা বাঁশি বায়, উনি তৈরি করে দিয়েছিলেন। বাজিয়েছিলেন গুরু বীরমঙ্গল সিং। কণ্ঠ দিয়েছিলেন কলাবতীদি। সেও ছিল এক মহাযজ্ঞ। গুরুজি প্রতি পদে আমাকে এভাবেই ওঁর আশীর্বাদধন্য করেছেন।

– তারপর?

– তার তো আর পর নেই গো। যে দায়িত্ব গুরুজি তাঁর ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে গেছেন সেটাকেই তো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি আমার মতো এগোচ্ছি। গুরুজির শিক্ষাই আমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছি। নিজের বলে তো কিছু নেই। সব গুরুজির আশীর্বাদ।

– আর অন্যেরা?

– অন্যেরা বলতে গুরু বিপিন সিঙের ছাত্রভাগ্য ভীষণই ভালো। আবার এমন গুরুই বা কজন পায়, বলো? আমাদের সময় কলাবতীদির পাশাপাশি দর্শনাদি (দর্শনা জাভেরি) আসতেন কলকাতায়, প্রীতি (প্রীতি প্যাটেল) যেমন এখনও যে-কোনও স্ক্রিপ্ট শুরু করার আগে আমার কাছে একবার ঘুরে যাবেই এমনকি কলাবতীদির বয়স হয়েছে কে বলবে? বাচ্চা মেয়েদের মতো বায়না ধরেন আমার কাছে ছুটে আসবেন বলে মানুষটি! আর বিম্বা তো গুরুজি-কলাবতীদির মেয়ে কেবল নয়, ও তো আমাদেরও মেয়ে। আমাদের সংসার এভাবেই চলছে। আমরা থাকব না যখন অন্য সবাই এই সংসার চালাবে!

তাই তো! মণিপুরি নৃত্য-এর এই বিশ্ব, গুরু বিপিন সিঙের এই ঘরানা তো চলতেই থাকবে। এখন ঘোর সন্ধ্যা। এবার উঠতে হবে। আমি গৌরীদির উঠোন ছেড়ে নামি। গৌরীদি হাসিমুখে বিদায় দেন। সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে গিয়ে স্মরণ করি পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এই রাস্তা দিয়েই হেঁটে যেত তাঁতের শাড়ি পরা একটি বাঙালি মেয়ে এস.আর দাশ রোডে তার গুরুজি বাড়ি যাবে বলে। হয়তো তখনও তার হাতে ধরা আছে রূপ গোস্বামীর উজ্জ্বলনীলমণি!

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by