পর্ব ১৭

খন নাচ-গানে ভারতীয়দের বিশ্বময় চলাফেরা সহজ। কেউ না ডাকুক অন্তত প্রবাসী ভারতীয় এমনকি বাঙালিদের বার্ষিক অনুষ্ঠানে একটু নেচে গেয়ে দিয়ে আসতে পারলে বাঙালি শিল্পী মনে করে বিশ্বজয় করলো। প্লেনে চড়ার ছবিতে তার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ভরে যায়। কিন্তু যদি ভাবি গত শতাব্দীর বিশের দশকের কথা আর ভাবি ইউরোপ-আমেরিকা আর তার ওপর আধুনিক নৃত্য, তাহলে সে যুদ্ধ যে শিল্পী জয় করেন তিনি সাধারণ মানুষ বা সাধারণ প্রতিভা নয় এটা অবশ্যই পরিস্কার হয়ে যায়। উদয়শঙ্কর চৌধুরী নিঃসন্দেহে একজন মহামানব। রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন যেমন; ঠিক তেমনই উদয়শঙ্কর (Uday Shankar)। এখন ভাবলে অবাক লাগে যে-মানুষটার ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যে কোনও ফর্মাল ট্রেনিং ছিল না কোনওদিন, যিনি পেন্টিংয়ে তাও আবার জে.জে স্কুল অফ আর্টস আর গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয় ঘুরে লন্ডনে রয়্যাল কলেজ অফ আর্টে স্বয়ং রদেনস্টাইনের ছাত্র, তিনি প্রায় উদ্ভাবন করলেন একেবারে নতুন একটা নৃত্যধারা যাতে সংগীত, নৃত্য, নাট্য, অঙ্কন, ভাস্কর্য সমানভাবে মিশে গেছে। কিন্তু উদ্ভাবন করে ক্ষান্ত দিয়েছেন তাও না।

ত্রিশ-চল্লিশের দশকে উদয়শঙ্কর ব্যালে ট্রুপ-এর ইউরোপ-আমেরিকায় যা অনুষ্ঠানের সূচি এমনকি কেবল আমেরিকাতেই প্রায় চুরাশিটি শহরেজোড়া ট্যুর — সেই রেকর্ড বোধহয় আজও কোনও ভারতীয় নৃত্যশিল্পীর আছে কিনা সন্দেহ। তারপর চেহারা; বড়ো বড়ো চোখ, অত সুন্দর দৃঢ় নাসিকা, ভাস্কর্যসম শরীর — সে তো ওই সময় তো নয়ই, এই আশি-নব্বই বছরেও ভারতে হাতে-গোনা পুরুষ নৃত্যশিল্পীর ছিল বা থেকেছে। শুধু কি নৃত্য? নৃত্যসংগঠনেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। যে-সব দেশ, শহরে অনুষ্ঠান করেছেন ভারতীয় নৃত্যের ইতিহাস সাবলীল ইংরেজি অথবা ফরাসিতে দর্শককে বুঝিয়ে নৃত্য শুরু করতেন। ভারতে ফিরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে আলমোড়াতে যে নৃত্যবিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন সেখানে কথাকলিতে শঙ্করণ নাম্বুদিরি, ভরতনাট্যমে কন্ডাপ্পা পিল্লাই, মণিপুরিতে অম্বি সিং আর সংগীতে নিয়ে গিয়েছিলেন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবকে। নিজের ভাই রাজেন্দ্র, দেবেন্দ্র, রবি তো ছিলেনই সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন গুরু দত্ত, রুমা গুহ ঠাকুরতা, লক্ষ্মী শঙ্কর, শান্তা গান্ধী, নরেন্দ্র শর্মা, জোহরা-উগ্রা ভগিনীদ্বয়, শান্তি বর্ধন, প্রভাত গাঙ্গুলি, সত্যবতী, অম্লান, সিমকি প্রমুখ। তাঁর বহুকৌণিক প্রতিভার স্বাক্ষর রয়ে গেছে কল্পনা-তেও। কল্পনা সিনেমা হিসেবে আজও আমাদের বিস্মিত করে। শুধু আমাদের না বিশ্বজোড়া তাবড় ছবিকরিয়েদের তা করেছে। সেই তালিকায় রয়েছেন সত্যজিৎ রায়, মার্টিন স্করসেসি পর্যন্ত!

উদয়শঙ্কর কলকাতার বালিগঞ্জে থিতু হলেন ষাটের দশকে। যখন যৌবনের বিশ্বজয়ী টাট্টু ঘোড়াটি তিনি আর নেই তখনও মাটিতে একটা পা মাড়লে সারা পাড়ায় সেই শব্দ নাকি শোনা যেত। এটা আমি শুনেছি আমার নাচের দিদির কাছে। চল্লিশ-দশকের উদয়শঙ্কর আর ষাটের দশকের উদয়শঙ্করে অবশ্যই তখন অনেক তফাৎ। এমনকি নৃত্যের বিশ্বনাবিক শুধু কলকাতায় বসে ছাত্রছাত্রীদের নাচ শেখাচ্ছেন এটা মানা সহজ নয় কিন্তু এটাও সত্যি বাঙালি উদয়শঙ্কর ও তাঁর নৃত্য ঘরানাকে ভরিয়ে দিয়েছে। আর কোনও বাঙালি নৃত্যশিল্পীকে নিয়ে ‘আঁতেলেকত্যুয়েল’ বাঙালি সমাজে কখনও কোনও আলোচনাই হয়নি আর উদয়শঙ্কর ‘দেশ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ হয়েছেন! তিনিই প্রথম এবং এখনও অবধি একমাত্র বাঙালি নৃত্যশিল্পী যিনি পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত। সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ এখনও অবধি খুব সম্ভবত দুজন বাঙালি নৃত্যশিল্পী পেয়েছেন তাঁর মধ্যে একজন উদয়শঙ্কর (অন্যজন শান্তিদেব ঘোষ)। এমনকি উনি মারা যাবার পরেও ঝাঁকে ঝাঁকে বাঙালি ছেলেমেয়ে ওই ঘরানায় নাচ শিখেছে। এখনকার সব বাঙালি ছেলেমেয়েই যেমন কখনও গুরু গিরিধারী নায়েকের কাছে একবার অন্তত ওডিসি করেছে কিংবা গুরু থাঙ্কমণি কুট্টির কাছে ভরতনাট্যম তেমনই উদয়শঙ্কর ঘরানার নৃত্যে জীবনে একবার অন্তত তারা নাম লিখিয়েছিলই। এই ঘরানার জনপ্রিয়তা বিশেষত বাঙালি পুরুষ নৃত্যশিল্পীদের মধ্যে অভূতপূর্ব। যে-সব মা-বাবা ছেলে ‘মেয়েলি’ হয়ে যাবে বলে নাচ শিখতে দিত না তারা অবলীলায় উদয়শঙ্কর ঘরানার নাচে পুত্র সন্তানকে ভর্তি করে দিত।

 

তবে উদয়শঙ্করের যে জিনিয়াস তা ওঁর মৃত্যুর পর এই ঘরানার মধ্যে উপস্থিত ছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে। উদয়শঙ্কর তাঁর ‘হাই-ডান্স’-কে পরবর্তী কালে নাম দিয়েছিলেন ক্রিয়েটিভ ডান্স, কিন্তু ক্রিয়েটিভের নামে ভরতনাট্যম বা ওডিসির পোশাক পরে রবীন্দ্রনাথের গানের ওপর হাত-পা নাড়ার যে বাংলা নাচের সংস্কৃতি তা থেকে উদয়শঙ্কর ও তাঁর নাচ সহস্র আলোকবর্ষ দূরে। উদয়শঙ্কর একজনই হন এবং ক্রিয়েটিভ নৃত্য গড়ে তুলতে যে প্রতিভা, বিদ্যা ও বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন তা সকলের থাকে না। আরেকটা জিনিস হল এগিয়ে নিয়ে চলা। উদয়শঙ্কর যখন ছিলেন তখন এবং তার পরেও তাঁর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিলেন অমলাশঙ্কর। আনন্দশঙ্করের অকালপ্রয়াণ এই ঘরানার নাচে এক বিরাট শূন্যস্থান রচনা করলেও তনুশ্রীশঙ্কর তা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এখনও তা করে চলেছেন মমতাশঙ্করও। কিন্তু এঁদের পর? আশা করি এরপরেও এই ঘরানা জীবন্ত থাকবে। আবার ভয়ও হয় যে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই ঘরানার আর কোনও ছাত্রছাত্রী তেমন চোখে পড়ল না।

এই প্রসঙ্গেই একটা কথা বলে শেষ করি। ধীমানশঙ্কর মুখার্জি সম্প্রতি প্রয়াত হলেন। শঙ্কর উনি ছিলেন না কিন্তু শ্রদ্ধেয় আনন্দশঙ্কর (ধীমানের প্রিয় আনদা) ও তনুশ্রীশঙ্করের প্রথম দিকের ছাত্র ছিলেন ধীমান। তাঁদের ট্রুপের সঙ্গে বিশ্ব ঘুরেছেন। সম্ভ্রান্ত বাড়ির ছেলে ছিলেন। ভালো নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য প্রশিক্ষক ছিলেন। কিন্তু একটা সময় তাঁর আর তেমন কাজ ছিল না। ফিল্মের নাচের সঙ্গে যে যোগ ছিল তাও ছিন্ন হয়েছিল। আমি যে সংস্থার নৃত্য উৎসবের সঙ্গে জড়িত সেই উৎসবে এসে জগন্নাথ বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে তাঁকে হাপুশ নয়নে কাঁদতে দেখতাম। বারবার বলতেন, “আমাকে একবার সুযোগ দিয়েন!” হোয়াটস্যাপে তাঁর সমস্ত সার্টিফিকেট পাঠাতেন। রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং আরও নানা গণ্যমান্য ব্যক্তির সার্টিফিকেট তাঁর কাছে ছিল। সবই তাঁর নাচের প্রশস্তিসুলভ। কিন্তু তাও নাকি তাঁকে ‘কেউ ডাকত না!’ আমার কাছে উনি অনুযোগ করতেন, ‘আমাদের শঙ্করডান্স কি ভালো নাচ নয়? কেন সবাই মুখ ফিরিয়ে থাকে বলুন তো?’ আমি তাঁর কষ্টের তল পেতাম না। আবার তিনি কষ্ট পান তাও চাইতাম না। বহুদিন সাফারি পার্কের পাশ দিয়ে তিনি উদাস হয়ে হেঁটে চলেছেন, যেতে গিয়ে দেখেছি। অতিমারীর সময় আমরা নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে এক সিরিজ সাক্ষাৎকার ‘তালে আলাপে’নাম দিয়ে তৈরি করেছিলাম। ধীমানশঙ্কর মন দিয়ে সেসব দেখে জানাতেন। ওঁকেও নিতে বলতেন। বলতেন, ‘আয় সোয়্যার টু গড, আয় হ্যাভ লট টু সে!’

আজ পরম শ্রদ্ধেয় শ্রী উদয়শঙ্করের জন্মদিন। তিনি আজও বাঙালির মধ্যে আছেন। আরও অনেক বছর থেকেও যাবেন। কিন্তু সেই বিরাট প্রদীপের নিচে অন্ধকার হয়ে ধীমানশঙ্করদের যেন না থাকতে হয় সেটা আমাদের দেখতে হবে। তাঁদের যে অনেক কথা সেসব শোনার সময় যেন আমাদের থাকে।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।  

Written by