
পর্ব ১৬
ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে নৃত্যশিল্পের এক ধারক-বাহককে আমাদের বাংলার এক যুবক যিনি নিজে নৃত্যশিল্পী একটি মোক্ষম প্রশ্ন করে ফেলেছেন সমাজমাধ্যমে, “বিশুদ্ধ কী? আপনি কি একটু ব্যাখ্যা দিয়ে বলবেন দয়া করে?” এবং তাতেই বিতর্কের বিরাট এক বাঁধ খুলে গেছে। সত্যিই কী এই বিশুদ্ধতা যা নিয়ে প্রায়ই তথাকথিত গুরু, সংগঠক এমনকি আরও বহু লোক মাঝেমাঝে ধুয়ো তুলে ছাত্রছাত্রীদের নাকাল করে। সমগ্র ভারতবর্ষের কথা বলতে পারব না তবে এই ‘বিশুদ্ধ’-র অত্যাচারে বাংলার নৃত্যশিক্ষা মহলে বহু ক্ষয়ক্ষতি প্রায়শই হয়ে থাকে। অনেক স্বপ্নের বলি হয়। অনেক প্রতিভা অকালে ঝরে পড়ে। কিন্তু কেউ নতুন প্রাণকে সঠিক দিশা দেখাতে পারে তা বলা যায় না। ভারতীয় সমস্ত শাস্ত্রীয়নৃত্যের প্রকরণে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য স্থৈর্য। যে কোনও ভালো শিল্পের মতোই শাস্ত্রীয়নৃত্যে সময় লাগে। শরীর তৈরি করতে হয়, তাল-জ্ঞান গড়ে তুলতে হয়, কঠিন অংশগুলোকে চর্চা করে করে সহজ করে নিতে হয়। এই নৃত্যশিক্ষায় প্রবেশের প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থী জানে তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু তা বলে সে যত পরিশ্রমই করুক না কেন কেবলমাত্র ‘বিশুদ্ধ’-র দোহাই দিয়ে তাকে কোনও রকম জায়গাই দেওয়া হবে না সেটা নিঃসন্দেহে শোষণ। এই জায়গা পাওয়া মানে ‘পে অ্যান্ড পারফর্ম’-এর জঘন্য সংস্কৃতিতে যোগ দেওয়া নয় ঠিকই, কিন্তু অন্য কোথাও পারফর্ম করতে চাইলে অকারণে শুনতে পাওয়া ‘তোমার হচ্ছে না, তুমি তৈরি হওনি’। অথচ একই রকমের, বয়সের অন্য একটি ছাত্র বা ছাত্রীকে অঢেল সুযোগ করে দেওয়া সেটা কোন দেশি বিশুদ্ধতা হল?
আমাদের ছোটোবেলাতে দেখেছি সব নাচের স্যার, দিদিমণিরা একে অপরের প্রসঙ্গে এক কথাই বলছেন যে ও ভালো শেখায়নি, সে ঠিকঠাক জানে না কিছু। কেউ এর ছাত্র টেনে নিয়েছে তো এ আবার ওর ছাত্রীকে বুঝিয়েছে এতদিন কিছুই শেখা হয়নি। অথচ দুজন শিক্ষকই দেখা গেছে একই গুরুর শিষ্য! এটা ঠিক কথা কলকাতা ‘গুরু’ খুব কমই পেয়েছে। ফাঁকা মাঠে গোল দেবার মতো নিজে গুরু সেজে নিয়েছে তাদের কথা বলছি না, কিন্তু শ্রদ্ধেয় গোবিন্দন কুট্টি-থাঙ্কমণি কুট্টি, শ্রী খগেন্দ্রনাথ বর্মন, গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র, পণ্ডিত বিরজু মহারাজ, গুরু বিপিন সিং, উদয়শঙ্কর কিংবা মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের বাইরে যে অঢেল গুরু ছিলেন কলকাতায়, তা তো নয়। কুচিপুরি গড়ে উঠতে পারেনি আর মোহিনীআট্যম টিমটিম করে জ্বলছে। কথাকলিও তথৈবচ। তার মধ্যে শ্রীমতী মহুয়া মুখোপাধ্যায় একজন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম নিঃসন্দেহে- বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয়নৃত্য গৌড়ীয়র এই গুরু নৃত্যের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাকেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এঁদের বাইরে? এঁদের বাইরে যাঁরা সত্তর-আশির দশকে নৃত্যের শিক্ষার্থী ছিলেন তাঁরা অবশ্য আজ সঠিকার্থেই গুরু কিন্তু একই রকম গতিতে সব শাস্ত্রীয়নৃত্যই বিভিন্ন গুরুর আশীর্বাদ ও তত্ত্বাবধানে বাংলায় বেড়ে উঠতে দুর্ভাগ্যক্রমে পারেনি। তাতে একটা জিনিস হয়েছে যে কয়েকটা নৃত্য যেমন ভরতনাট্যম, কথক, ওডিসি কখনও মণিপুরী আর শঙ্কর ঘরানার নৃত্য-এ ভীষণরকম ভিড় বেড়ে গেছে। এত এত ছাত্রছাত্রী আবার সেই তুলনায় প্রকাশের মঞ্চ একেবারে হাতে গোনা। অতএব যা হবার হয়েছে নৃত্যশিল্পকে নিজের ছাঁচে কেউ কেউ ঢেলে নিয়েছে। এই ‘বিশুদ্ধ’-র কথা যে উদ্যোগপতি বলেছিল সে বিশুদ্ধ আসলে কী তার উত্তর দিতে পারেনি। উল্টে প্রশ্নপ্রার্থীকে সমাজমাধ্যমে ব্লক করেছে। কিন্তু আমরাও কি এর উত্তর জানি?
আজকের যে শাস্ত্রীয়নৃত্য ভারতবর্ষের তা যে প্রাচীনকাল থেকে একই জায়গায় রয়ে গেছে তা নয়। সময়ের দাবি মেনে সেগুলি যুগোপযোগী হয়েছে। তথাকথিত বিশুদ্ধতা একইরকম ভাবে বজায় থাকেনি।
কিছুটা জানি, কিছু আজও অধরা। যেমন আজকের যে শাস্ত্রীয়নৃত্য ভারতবর্ষের তা যে প্রাচীনকাল থেকে একই জায়গায় রয়ে গেছে তা নয়। সময়ের দাবি মেনে সেগুলি যুগোপযোগী হয়েছে। তথাকথিত বিশুদ্ধতা একইরকম ভাবে বজায় থাকেনি। শাস্ত্রীয়নৃত্যকে লঘু করা যায় না যেমন তেমন দর্শকের উপযোগী করা যে যায় সেটাও শাস্ত্রীয়নৃত্যগুলিরই আভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা। যেমন আজকাল নাচের রিয়েলিটি শো অনেক হয়। তাতে বহু তথাকথিত গুরু নাক কোঁচকান আবার দেখা যায় তাঁকে বা তাঁদেরই যখন টিভি চ্যানেলগুলো বিচারক বানিয়ে নিয়ে যায় তখন তাঁরাই ‘খুব ভালো হয়েছে, ভেরি গুড!’ ইত্যাদি বলে জায়গাটা অস্পষ্ট করে দেন। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে রিয়েলিটি শো শাস্ত্রীয়নৃত্যের কোনও উপকারই করতে পারে না কিন্তু যে ছেলেমেয়েগুলো, বাচ্চাগুলো নাচছে তাদের এই বার্তাটুকু পৌঁছে দেওয়া যে আরও পথ বাকি আছে। কিংবা শাস্ত্রীয়নৃত্যের যে পোশাক পরে তারা নাচছে সেগুলোর একটা ইতিহাস এবং গাম্ভীর্য আছে। সবাই শাস্ত্রীয়নৃত্যের রাস্তাই গ্রহণ করবে সেটা যেমন একগুঁয়ে ধারণা একটি তেমন যে রাস্তাই তারা নিক তাদের দিশেহারা যেন না হতে হয় সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আজ যা বিশুদ্ধ কাল তা প্রাচীন হবে, পরিবর্তনও আসবে কিন্তু কোথা থেকে কী হল কিংবা সেই পরিবর্তনের ইতিহাসটা কী সেটা বিশুদ্ধর দোহাই যারা দেবে তাদেরই দায়িত্ব পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেওয়া।
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।
