ছাত্রছাত্রীদের নৃত্যচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন চন্দ্রানী মুখার্জি

পুজোর মরসুম শেষ করে আর বিশ্বকাপের জ্বর ছেড়ে গিয়ে চারিদিকে এখন পরীক্ষার মরসুম শুরু হয়ে গেছে। দশম-দ্বাদশের টেস্ট আর অন্যান্য শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা। সঙ্গে একাদশের হাফ-ইয়ার্লিও আছে। এখন নতুন বছরের সঙ্গে স্কুলে স্কুলে নতুন শিক্ষাবর্ষও চালু হয়ে যায়। আমাদের ছোটোবেলায় এমন হত না। বসন্ত পার করে সেই মার্চ-এপ্রিলে অ্যানুয়াল পরীক্ষা হত, আর মে মাস থেকে নতুন ক্লাস। আমার শৈশব-কৈশোর সে-নিয়মও মানত না। আমি নতুন ক্লাসে ভর্তি হতে পারতাম সেই জুলাইতে গিয়ে। টাকা থাকত না আগে ভর্তি হবার। কখনও সেপ্টেম্বরও হয়ে যেত। পরে ভর্তি হয়ে স্কুলটাকে তখন খুব অদ্ভুত লাগত।

ক্লাস ফাইভে আমি এমনই দেরি করে ভর্তি হয়ে স্কুলটাকে আর চিনতেই পারছিলাম না। এক ঝাঁক নতুন স্টুডেন্ট আর টিচার তখন আমাদের ছোট্ট স্কুলে। আগের বছরই সাকুল্যে তিন-চারটে টিচার ছিলেন আর এখন বারো-পনেরোজন। সাবজেক্ট-স্পেসিফিক সব টিচার। ফাইভে আমি যেদিন ক্লাস করা শুরু করলাম প্রথমেই বাংলা ক্লাস। কী সুন্দর, জোর দিয়ে বুঝিয়ে বুঝিয়ে পড়াচ্ছেন নতুন আন্টি! ডিক্টেশন দিচ্ছেন। সবাই না পারলেও আমি ফটফট সব টুকে নিচ্ছি। আন্টি প্রায় অর্ধেক সেশনে ভর্তি হওয়া নতুন ছেলেটার বাংলা দ্রুত ডিক্টেশন নেওয়া দেখে একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও তুমি! তুমিই কি ভাস্কর?’ মাথা তুলে বললাম, ‘হ্যাঁ’। আর আমাদের সেদিন থেকে একে অপরের সঙ্গে এক আজীবনের সম্পর্ক তৈরি হল। আন্টির নাম তখন জেনেছিলাম চন্দ্রানী আন্টি। চন্দ্রানী মুখার্জি।

নতুন স্টুডেন্ট আর নতুন নতুন টিচারে সে-সময় আমাদের স্কুলে যেন নতুন রং লাগল। কত রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হল। একদিন ক্লাসে ডিক্টেশন দিতে দিতে চন্দ্রানী আন্টি বললেন, “তোমাকে ছুটির পর কে নিতে আসেন? তাকে একটু থাকতে বলবে। দরকার আছে।” ভাবলাম গার্জিয়ান-কল। কিন্তু না ছুটির পর দেখা গেল আমাকে থাকতে হবে তার কারণ একটা অনুষ্ঠানের রিহার্সাল তাতে কোনও একটা চরিত্রে আমাকে নেওয়া যাবে কি না তার পরীক্ষা। বলা বাহুল্য, সেটা নাচের অনুষ্ঠান। ওই রিহার্সাল-ঘরে গিয়ে আমি আরও অবাক। চন্দ্রানী আন্টি তড়াক করে আমায় চ্যাংদোলায় কোলে তুলে নিলেন। আমি কিছু বুঝে ওঠবার আগেই উনি কাকে একটা উদ্দেশ্য করে বললেন, “একে নেওয়া যাচ্ছে রে। একেই ঋষিকুমার করব।” সেই শুরু হল সেবারের কালমৃগয়া নৃত্যনাট্য-এর মহড়া। আন্টি আমাকে প্রথম নাচ তোলালেন ‘বেলা যে চলে যায় ডুবিল রবি’ গানের ওপর। আমাদের স্কুলে এর আগে কখনও পুরোদমে কোনও নৃত্যনাট্য হয়নি। সমস্ত স্কুলে অতএব সাড়া পড়ে গেল। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটা জিনিস হল। আমার ক্লাসমেট ছিল প্রভিজিৎ। আমার থেকে খুবই ভালো নাচ করত। কিন্তু একটু ওজন বেশি ছিল বলে ঋষিকুমারের চরিত্রে ওর কাস্টিং সে-বছর হল না। ও করলো বিদূষক। আর গোটা স্কুলে ভাস্কর-প্রভিজিৎ আর চন্দ্রানী আন্টির একটা সাংস্কৃতিক টিম তৈরি হল।

প্রভিজিৎ আর আমি একসঙ্গে স্টেজে উঠলে কেউ অন্যদিকে তাকাতে পারত না। আর আমাদের দু-জনকে একসঙ্গে পেয়ে চন্দ্রানী আন্টি নতুন নতুন অনেক স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করলেন। একবার হল নদীর গানের ওপর নাচ। একবার হল দুর্গা বিষয়ক। একবার হল লোকগানের ওপর। কিন্তু আমি যদি মেন-রোল না পেতাম তো গোঁসা করতাম। কথা বলতাম না। দু-চোখ ভরে টলটল করতো জল। চন্দ্রানী আন্টি ওতেই কি জানি ওঁর সব নাচেই গুরুত্বপূর্ণ অংশে আমায় রাখতেন। আমি শুধু চন্দ্রানী আন্টিকে ভালোবাসতাম বলে ওঁর বাংলা বিষয়কেও ভীষণরকম মন দিয়ে পড়তাম। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস টুয়েলভ অবধি বাংলাতে ক্লাসে আমার সর্বোচ্চ নম্বর থাকত।

চন্দ্রানী আন্টি, গুরু থাঙ্কমণি কুট্টি-র ছাত্রী, পড়াতেন অপূর্ব কিন্তু আমার কোথাও মনে হত নাচই যেন ওঁর প্রকৃত বিচরণক্ষেত্র। নাচের কথা শুনলে ওঁর মুখে আলাদা আভা খেলে যায়, উনি ওঁর মুক্তঝরা বিখ্যাত হাসিটা হেসে ওঠেন। নাচ শেখাতে ওঁর কোনও ক্লান্তি নেই। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে, বাড়িতে মেয়ে ছোটো, রক্তে শর্করা। কিন্তু উনি আমাদের নাচ শিখিয়ে যেতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলত রিহার্সাল। পড়ানো, লেখানো, পড়া-ধরা, পরীক্ষা নেওয়া, সময় মতো খাতা দেখা ও দেখানো, রেজাল্ট তৈরি- সবেতেই উনি নিখুঁত। এমনকি প্রথম ক্লাসে যে গলার স্বরে পড়ান পাঁচ-ছটা ক্লাসের পর সেভেন্থ পিরিয়ডেও একই গলার জোর ধরে রাখতে পারেন। তাও নাচের মতো আনন্দ বোধ হয় আর কোনও কিছুতেই উনি পেতেন না। আমাদের ওই ছোটো স্কুল যখন বড়ো হয়ে উঠল স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানের কথা মুখে মুখে ফিরত। এবং সেই সংস্কৃতির নিঃসন্দেহে পুরোধা আমাদের চন্দ্রানী আন্টি।

চন্দ্রানী আন্টি, গুরু থাঙ্কমণি কুট্টি-র ছাত্রী, পড়াতেন অপূর্ব কিন্তু আমার কোথাও মনে হত নাচই যেন ওঁর প্রকৃত বিচরণক্ষেত্র। নাচের কথা শুনলে ওঁর মুখে আলাদা আভা খেলে যায়, উনি ওঁর মুক্তঝরা বিখ্যাত হাসিটা হেসে ওঠেন। নাচ শেখাতে ওঁর কোনও ক্লান্তি নেই।

কিন্তু আমরা ঠিক কী পেয়েছিলাম, শিখেছিলাম তাঁর কাছে? নাচ যে একটা বিশেষ জিনিস, নাচের যে মুদ্রা, অভিব্যক্তি, তালজ্ঞান লাগে চন্দ্রানী আন্টি আমাদের প্রথম সেটাই শিখিয়েছিলেন। পাড়ার ফাংশানের হাত-পা নাড়া থেকে উনি আমাদের প্রকৃত নৃত্যচর্চার মধ্যে এনে ফেলেছিলেন। শাস্ত্রীয়নৃত্য কোনটা কী, ভরতনাট্যম ও কুচিপুড়ির পার্থক্য কী আমরা ওঁর কাছেই শিখেছিলাম। আর জেনেছিলাম রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একাডেমিক চর্চায় আজও রবীন্দ্রনৃত্য ব্রাত্য হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথের লেখা নৃত্যনাট্যগুলি তাঁর সাহিত্যভুবনের আলোচনা প্রসঙ্গে কম আসে। কিন্তু এটা যে একেবারেই ঠিক নয় সেটাও আমাদের চন্দ্রানী আন্টিই শিখিয়েছিলেন। এখন ভাবলে অবাক লাগে নাচ নিয়ে যে-কোনও রকম শিক্ষা আমার তবে কোনও নাচের স্কুলে হয়নি। পড়ার স্কুলে আমি নাচ পড়েছিলাম, শিখেছিলাম! পুরোটাই চন্দ্রানী আন্টির দৌলতে। সে জন্য তাঁর কাছে আমি চিরজীবন কৃতজ্ঞ।

কিন্তু উনি স্কুলে পড়িয়েছিলেন বলে, প্রাথমিকভাবে শিক্ষকতার চাকরি বেছে নিয়েছিলেন বলে এ-ও ঠিক যে কলকাতা একজন বিরাট শিল্পীর গড়ে ওঠা দেখতে পেল না। ওঁর সম্ভাবনা ছিল ভারতজোড়া নামের। মঞ্চে মঞ্চে দাপিয়ে বেড়ানোর কথা ছিল তাঁর। কেউ শিল্পী হতে চায় আর কেউ কেউ শিল্পসত্ত্বা নিয়েই জন্মায়। আমাদের চন্দ্রানী আন্টি দ্বিতীয় জন। শিল্পসত্ত্বা নিয়েই তাঁর জন্ম। কিন্তু শিক্ষকতার পথে এসে তিনি হয়তো নিজের নৃত্যকে খানিক অবহেলাই করেছেন। কিংবা মধ্যবিত্ত বাঙালি বাড়ির মেয়ে তিনি, নৃত্যকেই আঁকড়ে এগিয়ে যাবার পথে কতটুকু প্রেরণা পেয়েছেন তা জানা নেই। তবে তিনি ছাত্রছাত্রীদের নৃত্যচর্চায় এগিয়ে দিয়েছেন। নিজের সবটুকু দিতে কখনও কার্পণ্য করেননি। শুধু আমাদের স্কুলেরই কত শত ছেলেমেয়ে যে পরবর্তীকালে নাচকে কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে তাঁর অনুপ্রেরণায়, একদিন বোধ করি সেই ইতিহাস লিখবে কেউ।

প্রথমেই বলেছি ক্লাস ফাইভেই চন্দ্রানী আন্টির সঙ্গে আমার আজীবনের সম্পর্ক রচিত হয়েছিল। স্কুল-কলেজের পর আমি আমার স্কুলেই শিক্ষকতার চাকরি নিই। তখন শ্রদ্ধেয় চন্দ্রানী আন্টি আমার সহকর্মীও। কিন্তু তখনও দেখেছি উনি নাচ ছাড়েননি এতটুকু। ছাত্রছাত্রীদের নিরলস নাচ তোলাচ্ছেন যে-কোনও অনুষ্ঠানে। ওদের সাজিয়ে দিচ্ছেন। ওরা যখন মঞ্চে নাচছে তখন বাচ্চাদের মতো দু-চোখ ভরে ওদের দেখছেন। কিন্তু ওই বাচ্চারা কম বয়েসের চন্দ্রানী আন্টিকে মঞ্চে নাচ করতে দেখেনি। আমি দেখেছি। ক্লাস ফাইভের চিলড্রেন্স ডে-এর অনুষ্ঠানে আমাদের জন্য কালো শাড়ি, কোমরে লাল ওড়নার চন্দ্রানী আন্টি নাচছেন- ‘অঞ্জলি লহ মোর’ আর স্কুলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে, হেডআন্টি আর অন্য আন্টিদের সঙ্গে সেই নাচ দেখে যাচ্ছে স্কুলবিল্ডিং, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ, আকাশ-বাতাস এমনকি স্কুলের গা দিয়ে বয়ে যাওয়া চওড়া খালটিও যেন নিঃশব্দে সেই নাচ দেখতে দেখতে যাচ্ছে। আমাদের সে-দেখার আজও শেষ হয়নি।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by