পর্ব ১৪
পুজোর মরসুম শেষ করে শীত এসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে। আমার বাড়ি থেকে আট-দশ মিনিটের দূরত্বে সংগীত রিসার্চ একাডেমি। এই শীতের সময়ই প্রতি বছর দু-তিনদিনের শাস্ত্রীয়সংগীতের অনুষ্ঠান সেখানে চলে। আহা! কী অনন্যসাধারণ শিল্পীরা জড়ো হন সব সারা দেশ থেকে ওই সময়! আমি সেই কোন ছোটোবেলা থেকে সংগীত রিসার্চ একাডেমির এই সব অনুষ্ঠানের দর্শক-শ্রোতা। ওই এক অতিমারীর সময় ছাড়া কোনও বছরের অনুষ্ঠান বন্ধ দিইনি। এই সম্মেলনে কদাচিত শাস্ত্রীয়নৃত্যের অনুষ্ঠানও থাকত। এমনই একবার ওখানে দেখেছিলাম শ্রদ্ধেয় চিত্রেশ দাসের নাচ।

কিন্তু চিত্রেশ দাসের নাচ সে-বার আমি চাক্ষুষ প্রথম করলেও মানসে তার আগে বহু, বহু বছর থেকেই দেখে আসছিলাম। উনিশশো ছিয়ানব্বই-সাতানব্বই নাগাদ আমি আমাদের কাছের একটি স্কুলে নাচে ভর্তি হই। এই নাচের স্কুল চলতো প্রতি শনি-রবি। প্রথম থেকেই দেখতাম সেই নাচের স্কুলে নাচ জিনিসটা বেশ গম্ভীর জিনিস হিসেবে অভিহিত হত। সেই সময় নাচেরও আমাদের ক্লাস-টেস্ট হত! ভাবা যায়! আর একটা বই পড়তে হত যাঁর প্রণেতা শ্রী প্রহ্লাদ দাস। এই প্রহ্লাদ দাসকে আমাদের নাচের দিদি ‘মাস্টারমশাই’ বলে সম্বোধন করতেন। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করতাম আর এখনও তা করি যে দিদি যে-শ্রেণির কথকনৃত্য আমাদের শেখাতেন তেমন প্রকরণের কথক তখনও অন্য কোথাও দেখতাম না। এখনও দেখি না। কথকনৃত্য, ঠিক ঝটকামারা নয় একটু আলতো, নরম একটা স্টাইল আর পায়ের কাজ মারাত্মক। কিন্তু এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই অভিনয়াংশে ওই ঘরানার কথক খানিক খাটোই ছিল। কিন্তু নৃত্য সম্বন্ধে যে-কোনও ধারণা আমাদের ওই স্কুল থেকেই তৈরি হয়েছিল। এমনকি ওই বিশেষ নৃত্যের নামটা যে কথক, কত্থক নয় যা আজও অনেকে (তাদের মধ্যে বহু নৃত্যসমালোচকও) অল্প ভুল করে ব্যবহার করে থাকেন, সেটা ওই দিদির কাছেই শেখা। আর দিদি বার বার যাঁর কথা বলতেন, সব নাচের পর একবার করে অন্তত উল্লেখ করতেন যেন সেই ব্যক্তিই আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত; তিনি হলেন ওঁর মাস্টারমশাই প্রহ্লাদ দাসের সুযোগ্য পুত্র চিত্রেশ দাস। দিদি চিত্রেশ দাসকে কোনও একটা ডাকনামে সম্বোধন করতেন যা আজ আর আমার স্মৃতিতে নেই। ওই প্রহ্লাদ দাসের যে-বই আমরা পড়তাম যেটার নাম ছিল কথক নৃত্য, ওতে চিত্রেশ দাসের একটা সাদা-কালো ছবি থাকত: ছিপছিপে চেহারার এক যুবক, প্রায় হাঁটু অবধি ঘুঙুর দু-পায়ে আর বলে না দিলে কেউ ঠাহর করতে পারবেন না ইনি তবলার জাকির হুসেন নন। দুজনের হেয়ার স্টাইলের অদ্ভুত মিল! কুচকুচে কালো ঝাঁকড়া চুল ছিল তাঁর।
কিন্তু এর প্রায় পনেরো-সতেরো বছর পর যে চিত্রেশ দাসকে আমি সংগীত রিসার্চ একাডেমি-তে দেখি তিনি প্রবৃদ্ধ। ওই ঝাঁকড়া চুলে অবশ্যই পাক ধরেছে। ছিপছিপে চেহারায় খানিক আলগা ভাব এসেছে। এই চিত্রেশ দাস তখন এক প্রতিষ্ঠান। আমেরিকায় একার হাতে কথকনৃত্যের প্রচার করায় তিনি পথিকৃত। আলি আকবর মিউজিক কলেজের হয়ে আমেরিকায় পা রেখেছিলেন প্রথমে নয়। সেটা পরে। আলি আকবর তাঁকে সানফ্রান্সিসকোতে ডেকে নিয়েছিলেন কথক শেখাবার জন্য সত্যিই, কিন্তু উনিশশো সত্তরে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি স্কলারশিপ নিয়ে পৌঁছেছিলেন এবং ওখানে বেশ কয়েক বছর কথকনৃত্য শিখিয়েছিলেন। আলি আকবর মিউজিক কলেজে থাকতে থাকতেই তিনি চিত্রেশ দাস ডান্স কোম্পানি-র গোড়াপত্তন করেন উনিশশো আশি সালে এবং সেই থেকে তাঁর কথকনৃত্যে বিশ্বজোড়া প্রচার ও প্রসার আর থামেনি। আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তের সফল বাঙালিদের নিয়ে শ্লাঘা বোধ করি। রবিশঙ্কর, আলি আকবরের শাস্ত্রীয়সংগীত গোলকময় ছড়িয়ে পড়ার কাহিনি লিপিবদ্ধ করি অথচ এই একজন বিশিষ্ট বাঙালি কথকনৃত্যকে একক চেষ্টায় কীভাবে আমেরিকা জয় করিয়ে দিল সেটা মনে রাখি না। এটা আমাদের বাঙালিদেরই মারাত্মক ইতিহাসবিমুখতা। নাকি বুঝি না নৃত্যশিল্পী বলেই চিত্রেশ দাসের প্রতি এ বাংলার এত হেলাছেদ্দা জুটল!
প্রথমে পায়ের কাজে ঘুঙুরে ট্রেনের শব্দ তুললেন। শুধু পায়ের কাজে, কথকনৃত্যের পা দুটো দিয়ে এমন ম্যাজিক যে দেখানো যায় তা আমি স্বপ্নেও ভেবে দেখিনি কোনওদিন। ওঃ! কী দৃশ্য! ট্রেন শুরু হতে হতে মাঝের স্পিডে আর শেষে তীব্র গতিতে ছুটছে।

তার কারণ ওই যে সংগীত রিসার্চ একাডেমির অনুষ্ঠান সন্ধ্যাবেলার ওখানে বিশেষ কোনও নৃত্যশিল্পীকে সেদিন দেখিনি। সংগীতশিল্পীরা ছিলেন। প্রখ্যাত তবলিয়ারা ছিলেন কিন্তু নৃত্যশিল্পী কাউকে তেমন চোখে পড়েনি। আমি যে দিদির কাছে নাচ শিখতাম, যিনি সারাজীবন চিত্রেশ দাসের উচ্চমানের নৃত্যের কথা বলতেন এমনকি তিনিও সেদিন গড়হাজির ছিলেন। এবং আমি বলবো যাঁরা উপস্থিত ছিলেন না তাঁরা সেদিন কী না হারিয়ে ছিলেন! উনি প্রথমে পায়ের কাজে ঘুঙুরে ট্রেনের শব্দ তুললেন। শুধু পায়ের কাজে, কথকনৃত্যের পা দুটো দিয়ে এমন ম্যাজিক যে দেখানো যায় তা আমি স্বপ্নেও ভেবে দেখিনি কোনওদিন। ওঃ! কী দৃশ্য! ট্রেন শুরু হতে হতে মাঝের স্পিডে আর শেষে তীব্র গতিতে ছুটছে। দর্শকাসনে পিন-ড্রপ সাইলেন্স যাকে বলে সেই নীরবতা। সবাই ঘুঙুরে ট্রেনের শব্দ শুনছে আর তারপরেই চারিদিক হাততালিতে ফেটে পড়লো। তবলায় সেদিন চিত্রেশ দাসের সঙ্গে ছিলেন শ্রদ্ধেয় অভিজিত ব্যানার্জি। ওঁর প্রায় ঘাম ছুটে যাচ্ছিল। উনি মিষ্টি করে মাইক্রোফোনে বলে নিলেন, ‘আপনারা তো বুঝতেই পারছেন কী জিনিস চলছে, আমার যদি ভুলচুক কিছু হয় তো মাফ করে দেবেন!’ কোনও তবলা বাদককে তাও আবার অভিজিত ব্যানার্জির মতো একজনকে আমি আগে কোনও শাস্ত্রীয় সংগীতকারদের সঙ্গে অনুষ্ঠানেও এমন বলতে শুনিনি। চিত্রেশ দাসের লয়কারি ছিল দেখার মতো। কীসব আড়াই, সাড়ে সাত, সাড়ে নয়ের গুনতিতে চলছিলেন মাইরি! বাচ্চা ছেলের মতো সারা মঞ্চ জুড়ে চলাফেরা করছেন। যেন একটা বিদ্যুৎরেখা খেলে যাচ্ছে এধার-ওধার। দর্শকের সত্যি অন্য দিকে এক পলক তাকাবার ফুরসৎ ছিল না সেই সন্ধ্যায়। সেদিন ওঁর সঙ্গে আরেকজন ছিল। যতদূর মনে পড়ছে বিখ্যাত আমেরিকান ট্যাপডান্সার জেসান স্যামুয়েল্স স্মিথ। কিন্তু চিত্রেশ দাসের পায়ের কাছে ও কাজে সে নেহাত শিশু। ওই অনুষ্ঠান, ওই কথকনৃত্য আর ওই চিত্রেশ দাসকে সত্যিই ভোলার নয়। আমি রবিশঙ্কর, আলি আকবর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি শুনিনি, আমি বালা সরস্বতী, কেলুচরণ মহাপাত্র কিংবা কলামণ্ডল গোপীকে কাছ থেকে দেখিনি, উদয়শঙ্কর তো নয়ই কিন্তু আমার আফসোস নেই। আমি চিত্রেশ দাসের নাচ দেখেছি। আমার জীবন সেদিনকার সব দর্শকের মতো সার্থক।

এই অনুষ্ঠানের কয়েক বছর পরই চিত্রেশ দাস মারা যান। ভারতবর্ষে সম্ভবত সংগীত রিসার্চ একাডেমির ওই অনুষ্ঠানই ওঁর শেষ অনুষ্ঠান ছিল। নভেম্বর ওঁর জন্ম-মাস। কথকনৃত্যের ওই বিশিষ্ট প্রকরণ আমেরিকায় জনপ্রিয় হলেও ভারতবর্ষে খুব একটা প্রচলিত হয়নি কোনওদিন তেমন। প্রহ্লাদ দাসের ছাত্রছাত্রীই তো ছিল হাতে গোনা। আমরাও ভালো করে নাচ শিখে উঠতে পারিনি কখনও। তবু বছরে দু-একবার একটা স্বপ্ন দেখি যে আমরা সব ছোট, কেউ কেউ বড় আমাদের ওই নাচের স্কুলে শীতকালের কোনও সন্ধ্যায় সবাই হাজির… দিদি ধীর গলায় বলছেন চুপ! মাস্টারমশাই আসছেন… সবাই দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবছে এই বুঝি প্রহ্লাদ দাস ঢুকলেন হাতে কথকনৃত্য বইটা নিয়ে… উনি হয়তো আজ ক্লাস-টেস্ট নেবেন… কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখা গেল চিত্রেশ দাস সঙ্গে ওঁর স্ত্রী জুলিদি (ওঁর প্রথম স্ত্রী আমেরিকান জুলিয়া ম্যাক্সওয়েল)… আর আমি চিত্রেশ দাসের কাছে গিয়ে বলছি আমি কিন্তু আপনার নাচ দেখেছি… উনি বলছেন সে তো দেরি আছে কিন্তু এসো… কোথায়… কেন সংগীত রিসার্চ একাডেমি!
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

