
পূজনীয় বাবা,
যে-চিঠি তোমাকে কোনওদিন লিখতে পারিনি আজ লিখছি। লিখছি কারণ জীবনের গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়ে আমার স্মৃতিপটে বহু ঘটনা ঘাই মেরে যায় ইদানীং। মনে পড়ে অশোকনগরে আমাদের বাড়ি- মা, তুমি আর আমরা পাঁচ বোন। এতগুলো বোনের পর আমার জন্মকে ঠাকুমা নাম দিয়েছিলেন ‘সাত রাজার ধন এক মানিক’। বাড়িতে ওই নামটাই আমার থেকে গেল। ভালো নাম রাখা হল ইতি। মণিপুরের রাজা তাঁর চিত্রাঙ্গদাকে যে-ভাবে বড়ো করেছিলেন তোমরা সবাই তেমন করেই ইতিকে লালন করেছ। দিদিরাও। আসলে স্বপ্নটা ছিল তোমার। এতগুলো মেয়ে! এতগুলো মেয়ে! বলে তোমায় যে শুনতে হত, তুমি বলোনি কোনওদিন কিন্তু একটি পুরুষ সন্তানের থেকে কন্যা সন্তান যে কোনও অংশে কম নয় সেটা তোমার পিতৃত্ব দিয়ে তুমি প্রমাণ করেছিলে। অশোকনগরে সেই ষাটের দশকে আমরা সবকটা বোন সাইকেল চালাতাম, সব পেয়েছির আসর-এ শারীরিক কসরত করতাম। স্বপন বুড়ো (অখিল নিয়োগী) আসতেন আসর করাতে। ভাবা যায়! তোমার প্রশ্রয়েই তো করতাম সব। তুমি বলতে সাইকেলে করে তোমায় স্টেশনে ছেড়ে আসতে। তখন তোমার গর্বিত মুখটা দেখে কে! আর ওই যে আমাদের বোনেরা মানে বড়দি গান গাইত, মেজদি তবলা বাজাত আর বাকি আমরা নাচতাম সেটা সে-সময় অশোকনগরে আলোচনার বিষয় ছিল বটে।

অবশ্য আমি তখন নাচ করি না। আমি তো ভেবেছিলাম স্পোর্টসে যাব। কত লংজাম্প, হাইজাম্পে পুরস্কার পেয়েছি! কিন্তু সেই এক ফাংশানে কী যে হল জীবনের মোড় ঘুরে গেল। মনে আছে তোমার? তখন আমার চার-পাঁচ বছর বয়স। দিদিকে নাচ শেখাতেন কলকাতার আদিত্য মিত্র। অশোকনগরে আসতেন উনি। একবার ঠিক হল দিদিদের ফাংশনে আমি এক্কেবারে সামনে নাচব। কারণ, আমি কেঁদে কেটে অস্থির যে আমাকে নিতেই হবে। আমাকে সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল যাতে যা-ই ভুল করি না কেন বাচ্চা বলে মাফ পেয়ে যাব কিন্তু সেবার আমিই সব থেকে ভালো, এতটুকু ভুল না করে সেই নাচ নেচেছিলাম। তুমি কোনও স্পার্ক দেখেছিলে আমার মধ্যে সেদিন নাহলে পরবর্তীকালে আমাকে নাচের দিকে তো তুমিই ঠেলে দিয়েছিলে। তুমি বলেছিলে শুধু অশোকনগরে পড়ে থাকলে কিছু হবে না আমাকে কলকাতায় শিখতে হবে। কিন্তু তুমি কেবল বলে ক্ষান্ত দাওনি। প্রতি রবিবার আটটা আটের ট্রেনে আমাকে কলকাতার বাণীচক্র-এ নিয়ে যেতে তুমি। ফিরতে ফিরতে বিকাল হত। পরদিন তোমার অফিস। কিন্তু মেয়েদের জন্য বিশেষত আমার জন্য সপ্তাহান্তের দিনটি বিসর্জন দিতে তুমি এতটুকু দ্বিধা বোধ করতে না।
আজ ভাবি ঘরে ঘরে তোমার মতো অভিভাবক পেলে বাংলার আরও কত না ছেলেমেয়ে নাচ, গান আর অন্যান্য কলাক্ষেত্রে নাম করতে পারত। তারপর তুমি ভর্তি করালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন আমাদের প্রি-ডিগ্রি বলে একটা কোর্স ছিল। আমি, বুলবুল, মালবিকা ভর্তি হলাম। আমরা খুব বন্ধু ছিলাম তিনজন। একবার বেলাদি (প্রখ্যাত কথকনৃত্যশিল্পী বেলা অর্ণব) আমাদের একটা অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের জীবনের প্রথম উপার্জন আড়াইশো করে টাকার পাবার কথা ছিল। কস্টিউম কেনা হয়েছিল। কিন্তু হায়! যে আমাদের ওই প্রোগ্রামে বরাত দিয়েছিল সেই লোকটাই পালিয়ে গেল। খুব মন খারাপ হয়েছিল। তুমি বুঝিয়েছিলে কর্মপথে বিশেষত কলাক্ষেত্রে এগুলো আরও আসবে। কিন্তু ওই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েই একদিন আমরা বসে আছি, খবর এল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোকরঞ্জন শাখা-তে কিছু নৃত্যশিল্পীর প্রয়োজন। ওদের একটা দুর্ঘটনায় কয়েকজন শিল্পী আহত হয়েছে কিন্তু অনুষ্ঠান চালিয়ে যেতে হবে। আমরা গেলাম। নেওয়া হল কেবল আমাকেই।

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে, বিভিন্ন জায়গায় জনগণের মনোরঞ্জন, তাদের সংস্কৃতির ছোঁয়া দেওয়াই ছিল লোকরঞ্জন শাখার কাজ। কারণ, তখনও টেলিভিশন আসেনি। দু-এক বছর পর আসবে কিন্তু তাও ঘরে ঘরে টেলিভিশন পৌঁছাতে সময় লাগবে আরও কুড়ি-পঁচিশ বছর। আমি চাকরি করছিলাম কিন্তু পোস্টটা পার্মানেন্ট করার জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। আমি এতদিন চাকরি করেও সেবার ওই পোস্টে আমার নাম থাকল না। খুবই মনোকষ্টে বাড়ি ফিরছিলাম যে চাকরিটা আর রইল না। বাংলার গ্রামে গ্রামে নাচ নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোটা আর থাকল না। কিন্তু সেদিনের রাত আটটার খবরে প্রকাশিত হল তৎকালীন অজয় মুখার্জির সরকার পড়ে গেছে। মসনদে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কংগ্রেস সরকার আসছে। তুমি বললে এমন হলে সরকারি সব জায়গাতেই আবার ইন্টারভিউ হয়। আগের রিক্রুটমেন্ট ক্যানসেল হয়। হলও তাই। আমার চাকরি পুনরায় বহাল হল। আমি এবার লোকরঞ্জন শাখার পার্মানেন্ট স্টাফ হলাম।
বাঙালি বাড়ির মেয়েদের চাকরি করা খুব সহজ ছিল না কোনওদিন। আরও কঠিন ছিল বাড়ির বউদের চাকরি। বিয়ের প্রথম সম্বন্ধ এল যখন তারা চেয়েছিল আমি চাকরি না করি। কিন্তু আমি চাকরি করা থেকে সরিনি। ঠিক করেছিলাম চাকরি চালাতে না দেওয়া হলে বিয়েও করব না। সেই সম্বন্ধ আবার ফিরে এল। তোমাদের তদারকিতে বিয়ে হল আমার। তোমার জামাই মস্ত ইঞ্জিনিয়ার, অনেক টাকা মাইনে। কথায় কথায় ট্যুর, পার্টি লেগেই থাকত। ও নিজেও প্রথম প্রথম চায়নি আমি চাকরি করি। আবার যে চাকরি নাচের, হোক সরকারের তাও নাচের তো ওর পৌরুষে কোথাও হয়তো আটকাত। ও আমাকে উৎসাহিত করতে পারত না। আমি যদিও কিছু মনে করতাম না তেমন। মানিয়ে গুছিয়ে নিতাম। সংসার করতাম আবার অফিসের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যেতাম। আমাদের বিখ্যাত প্রযোজনা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাসের দেশ আর আমি করতাম হরতনীর চরিত্র। কিন্তু আমার ঘরেতে ভ্রমর গুনগুনিয়ে আসত না। তখন ছেলে হয়ে গেছে, কত ছোটো আমার ছেলে, ওকে নিয়ে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করতে যেতাম। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগঞ্জে তো যেতামই আবার দিল্লি, ত্রিপুরা, মাদ্রাজ (চেন্নাই)-এসব জায়গাতেও যেতে হয়েছে। কতদিন এমন হয়েছে আমার ছেলেকে খাওয়াচ্ছে অন্যেরা আর আমি হয়তো তখন স্টেজে উঠছি!
আমি কৃতজ্ঞ আমাদের অফিসের রেখা ভৌমিকের কাছে। রেখাদি আমায় শম্ভুদা (শম্ভু ভট্টাচার্য)-র সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের একটা কয়্যার ছিল। শম্ভুদার সঙ্গে আমি ডুয়েট নাচ করতাম। একটা টিম তৈরি হয়েছিল আমাদের যাতে গান গাইতেন শ্রীমতি আরতি মুখোপাধ্যায়, নাট্যকৌতুক করতেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-শুক্লা বন্দ্যোপাধ্যায়, মিউজিকে থাকতেন কল্যাণ সেন বরাট আর নাচে আমি-শম্ভুদা। একবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধী আমাদের নৃত্যনাট্য দেখে অনেক রাত অবধি সকলের সঙ্গে আড্ডা মেরেছিলেন। কোনও রকম নিরাপত্তা বেষ্টনীর তোয়াক্কা না করে উনি আমাদের সঙ্গে (সেটা শান্তিনিকেতনে) গল্পগুজব করেছিলেন। ওঁর মা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী-র পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে। উনি বিভোর হয়ে কয়েকজন (যেখানে আমি ছিলাম খুবই অকিঞ্চিতকর) শিল্পীকে সেই কাহিনি শুনিয়েছিলেন সে রাতে! আরেকবার অনুষ্ঠান করেই (শিশির মঞ্চ বা রবীন্দ্রসদন হবে হয়তো) আমি গ্রিনরুমের দিকে ছুটছি হঠাৎ আমাদের সেক্রেটারি আমায় ডাকছেন, ‘দেখুন তো আপনার নাচ দেখে কারা আলাপ করতে এসেছেন!’ ফিরে দেখি তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি মীরা ভট্টাচার্য। চোখে জল চলে এসেছিল সেদিন। কতটুকু নাচ করতে পেরেছি জীবনে যে এত বড়ো বড়ো মানুষগুলো বাহবা দিচ্ছে? স্বামী-সন্তান আর তার সঙ্গে চাকরি ও নাচ- খানিকটা গুছিয়ে এনেছিলাম কিন্তু এমতাবস্থায় তোমার জামাই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হল।

কর্কটরোগের চিকিৎসা আজকের মত সহজলভ্য ছিল না তখন। এবং টাকাও লাগত প্রচুর। ওর চিকিৎসাতে আমরা ধনে-প্রাণে শেষ হলাম। আফসোস হত না যদি ওকে বাঁচাতে পারতাম। ও চলে যেতে জীবন-সংগ্রাম বেড়ে গেল বহুগুণ। সন্তানকে বড়ো করা তখন আমার জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। চাকরির সঙ্গে সঙ্গে কিছু ব্যবসাও করতে হয়েছিল। একটা সময় খাবারের স্টলও দিয়েছি। অনেক কষ্ট করেছি কিন্তু নাচ ছাড়িনি। কিংবা নাচ হয়তো আমাকে ছাড়েনি। আমি প্রথাগত শাস্ত্রীয়নৃত্যতে খুব পারঙ্গম হতে পারিনি কিন্তু আনন্দের শারীরিক বহিঃপ্রকাশ যে নৃত্য তাতে পারদর্শী হয়ে ওঠবার চেষ্টা করেছি। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি কিন্তু নাচ সংক্রান্ত নানা কাজে নিযুক্ত হয়েছি। সেই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের নিয়েই আমাদের একটা সংগঠন গড়ে তোলা গেছে। এখন দেশের নানা জায়গায় নাচের অনুষ্ঠান করি আমরা।
তুমি যেদিন চলে গিয়েছিলে সেদিন বাগানের স্থলপদ্ম গাছটা ফুলে ফুলে ভরে গিয়েছিল হঠাৎ। আমি খুব কাঁদিনি সেদিন, কিন্তু ওই ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে শপথ করেছিলাম তোমার মেয়ে জীবনে কোনওদিন হাল ছেড়ে দেবে না। কত বছর আগে বাণীচক্র থেকে ফেরার সময় তুমি একথাটাই বলতে যে কখনও যেন না হারি জীবনে। তোমার কথা অনেকটাই রাখতে পেরেছি। জানি তুমি যেখানেই থাকো খুব খুশি হবে জেনে যে কয়েকটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমি গড়ে তুলেছি ছোট্ট একটা নাচের আস্তানা ইউরেকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টার। তোমার মেয়েদের মতো, আরও আরও মেয়েদের নাচের আপন ঠিকানা হবে এই ইউরেকা। যুদ্ধ করবে কিন্তু পিছিয়ে থাকবে না। আর ততদিন তোমার এই মেয়েটা রণে ভঙ্গ দেবে না।
ইতি
তোমার মানিক (ইতি দাস)
চলবে…
____
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।
