
পর্ব ৭
রাজদীপ ব্যানার্জি ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পে একটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত নাম। যে কোনও শাস্ত্রীয় নৃত্যের এক বিশেষ দিক তার সৌন্দর্যতত্ত্ব। রাজদীপের ‘পরম্পরা’ দলের কিংবা একক রাজদীপের ভরতনাট্যম যাঁরা অবলোকন করেছেন তাঁরা জানেন কী উচ্চমার্গের শিল্প সেটি। কিন্তু রাজদীপকে এসব কথা বললেই সে হাসে। একগাল মুক্ত ছড়িয়ে সে আমাদের এসব বক্তব্য উড়িয়ে দেয়। নিজেকে একেবারেই ‘সিরিয়াসলি’ না নেওয়া রাজদীপ কেমন করে ওই সুমধুর ব্যক্তিত্ব ধরে রাখে, তা আজও আমাদের কাছে এক বিস্ময়। রাজদীপ, যাকে কখনও দর্জির কাছে বানানো সুন্দর পাঞ্জাবি-চুড়িদার ছাড়া দেখিনি, শৌখিন ব্যাগ ছাড়া লক্ষ্য করিনি আর ওই যে মাথার ওপরে চশমা রাখার একটা অনবদ্য স্টাইল- এসবই আমাদের বলে দেয় নৃত্যশিল্প একজন মানুষকে কতটা সূক্ষ্মতা প্রদান করতে পারে। ও যদি নৃত্যশিল্পী নাও হত তবে নির্দ্বিধায় একজন নামকরা ফ্যাশন ডিজাইনার হতে পারত বলে আমার মনে হয়।
‘কিন্তু আমি সেটা কোনওদিন হতে চাইনি বিশ্বাস করো’, রাজদীপ বলে। ‘আমি মনে প্রাণে সব সময়ই নৃত্যশিল্পী হতে চেয়েছি এবং একেবারে ছোটোবেলা থেকেই।’
আমি বলি, ‘কিন্তু এখন তো কত ছেলেমেয়ে নাচের পাশাপাশি কত কিছু করছে। মেকআপ করছে, ড্রেস ডিজাইন করছে, বুটিক খুলছে এবং সমাজমাধ্যমে যথেচ্ছ ভাগও করে নিচ্ছে সেসব। রিলগুলোয় তাই তো দেখি।’
রাজদীপ গম্ভীর হয়। বলে, ‘ওটাই তো সমস্যা, ভাস্কর। নাচ জিনিসটা বিশেষত শাস্ত্রীয়নৃত্য তোমার কাছে অনেক সময়, অনেক পরিশ্রম এবং অনেক স্যাক্রিফাইস দাবি করে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে-জিনিসটা এই শিল্পকে তোমায় দিতেই হবে তা হল লয়্যালটি। আদা-জল খেয়ে একদম শেষদিন অবধি নাচের পায়ে তোমাকে পড়ে থাকতে হবে। এমনকি একটা স্টাইল নিয়েই চর্চা করে যেতে হবে বছরের পর বছর। তবে না তুমি একদিন শিল্পী হয়ে উঠবে! মেকআপ, ডিজাইন সবকিছু শেখো কিন্তু নাচের জন্যই। তোমার একমাত্র পরিচয় যেন হয় তুমি নৃত্যশিল্পী। আর কিচ্ছু না!’

প্রতিটা অক্ষর সত্যি। রাজদীপ নিজের জীবনেই তো তা সত্য করেছে। উত্তরপাড়ার বনেদি বাড়ি-র ছেলে রাজদীপ। পূর্ববঙ্গের জমিদার বংশ। বড়ো বাড়িতে থাকা এবং বাড়ির গাড়িতে চড়াই তার ছোটোবেলার অভ্যাস। কিন্তু একটা সময় এমনও এসেছিল যখন বংশগত ব্যবসাটি আসতে আসতে গুটিয়ে আসছে এবং বাড়ির সবাই চাকরির দিকে ঝুঁকছে। রাজদীপ সে সময় ছোটো। উত্তরপাড়ার অমরেন্দ্র বিদ্যাপীঠের ছাত্র। সেই কঠিন সময়গুলোতে সে দেখত বাড়ির একেকটা আসবাব বিক্রি হচ্ছে এবং সেই অর্থে বাড়ির রেশন আসছে। কিন্তু তাও ঠাকুরদা তাকে নাচে ভর্তি করিয়েছিলেন। শিল্পীর জীবন কুসুমাস্তীর্ণ নয় জেনেও তাঁরা ওকে ওর মতনই গড়ে উঠতে দিয়েছিলেন। উত্তরপাড়ার মেয়ে, তখনকার দিনের নামকরা শিল্পী পুষ্প চ্যাটার্জির কাছে রাজদীপকে ভর্তি করিয়েছিলেন ওর ঠাকুরদা।
‘পুষ্পদিকে দেখে আমার মনে হয়েছিল নৃত্যশিল্পীকে বুঝি এমনই দেখতে হওয়া উচিত। ছিপছিপে গড়ন, চোখে গভীর কাজল, একহারা শাড়ি আলুথালু আর কাঁধে লুটানো একটা খোঁপা। পুষ্পদির কাছে ক্লাস ফোর থেকে ক্লাস টুয়েলভ অবধি নাচ শিখেছি আমি। আমার প্রকৃত গুরু পুষ্পদিই’, রাজদীপ জানায়।
তবে শুধু উত্তরপাড়াতেই রাজদীপের শিক্ষা নয়। রাজদীপ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও পরবর্তীকালে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছে। সেই সময় রবীন্দ্রভারতীতে ভরতনাট্যম শেখাতেন গুরু খগেন্দ্রনাথ বর্মন। ‘বর্মন’ গুরুজি নামে তিনি সুবিখ্যাত। একটু ‘মুডি’ গোছের মানুষ কিন্তু শেখাতেন দুর্দান্ত। গানের গলাও অসাধারণ। কিন্তু রাজদীপ এই সময় প্রকৃত তৈরি হয় শ্রীমতি অম্বালিকা প্রহরাজ-এর হাতে। অম্বালিকাদি তখন সদ্য দক্ষিণ ভারতের ‘কলাক্ষেত্র’ থেকে ভরতনাট্যম নিয়ে পড়াশোনা করে ফিরেছেন। এই অম্বালিকাদি রাজদীপকে ন্যাশনাল স্কলারশিপ-এর জন্য তৈরি করেন। এবং অচিরেই রাজদীপ ভরতনাট্যমে পূর্ব ভারত থেকে ন্যাশনাল স্কলারশিপ পায়। দক্ষিণ ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যে চট করে স্কলারশিপ পাওয়া অন্তত সেই সময় খুবই শক্ত ছিল। মোহিনীআট্যম, কথাকলিতে আজ অবধি কেউ পেয়েছে কী না সন্দেহ আছে। কুচিপুড়িতে এক্কেবারে হাতে গোনা। এই অবস্থা ভরতনাট্যমেও ছিল। তাও এখন যে অনেক ছেলেমেয়েই ভরতনাট্যমে ন্যাশনাল স্কলারশিপ পাচ্ছে, সেই বাঁধ বেশ খানিকটা এই রাজদীপরা স্কলারশিপ পাওয়ার পরই ভেঙে গেছে। ন্যাশনাল স্কলারশিপ পাবার পর রাজদীপ চেন্নাই (তখনও মাদ্রাসার নাম ছিল) গেল। সেখানে গুরু গঙ্গা থাম্পির কাছে তার তালিম শুরু হল।
‘গুরু গঙ্গা থাম্পি-র কাছে আমি প্রথম শিখি নাচ আর আধ্যাত্মিকতার সংযোগটা ঠিক কোথায়। বিশেষত ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্য অধ্যয়ন যে আসলে তপস্যা সেটা গুরুজি আমাকে সেখান। আর তারপর গুরু লীলা স্যামসন কলকাতায় এলে তাঁর কাছে আমি ওয়ার্কশপ করি আর উনি বলতেন ভরতনাট্যমকে কন্টেম্পোরাইজ করার কথা। মানে, তুমি আরামান্ডি (ভরতনাট্যম নৃত্যশৈলীর এক প্রকরণ)-তে বসছো, হাত করছো কিন্তু পুরোটাই হবে একটা স্মার্ট রিপ্রেজেন্টেশন। যুগোপযোগী। লীলা স্যামসনের দলের ওই যে সিম্পল সাজগোজ কিন্তু ঝকঝকে স্টাইল- ওটা আমি আজও নিজের মধ্যে ধারণ করি’, রাজদীপ বলে।
রাজদীপের দল পরম্পরা-র নাচ সত্যিই নয়নমনোলভা। দেখতেই কত সুন্দর লাগে। রাজদীপ শেখায়ও অসাধারণ। রাজদীপের থেকে শিখে আরও বড়ো গুরুর কাছে শিক্ষিত হয়েছে এমন ছেলেমেয়ের উদাহরণ প্রচুর। উত্তরপাড়ায় বসে রাজদীপ যা শেখায় সেই শিক্ষা দিল্লি বা দক্ষিণ ভারতেও গৃহীত হয়, এটা বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্বের। কিন্তু এই রাজদীপকেই কত বিদ্রুপ শুনতে হয়েছে নাচ শেখানো নিয়ে।
ওর কাছেই শুনি- ‘আমি ক্লাস ইলেভেন থেকে জানো নাচ শেখাই। পড়াশোনার টিউশন করে যেমন ছেলেমেয়েরা হাতখরচ জোটায় জীবনের একটা সময়, আমিও তাই করতাম নাচের টিউশন করে। আরও করতাম নাচের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার জন্য। কিন্তু আমাকে শুনতে হয়েছে ‘ওই যে গুরুজি যাচ্ছে!’ কেউ বলেছে আমি নাকি রবীন্দ্রভারতীর গেটে দাঁড়িয়ে স্টুডেন্ট ধরি! কিন্তু এই আমিই যখন বাংলাদেশ গেছি পরবর্তীকালে, কত ওয়ার্কশপ করিয়েছি, ওখানে একটা স্টুডেন্ট-বেস আমার তৈরি হয়েছে, তাঁরা আমায় সম্মানিত করেছেন, তখন এই মানুষগুলোই সেখানে তাদের সুযোগ করে দেবার জন্য কত অনুনয়-বিনয় করেছে! আবার ভরতনাট্যমের এক বিখ্যাত গুরু আমায় বারবার বলতেন মাথায় উইগ লাগানোর কথা। দ্যাখো, আমার যে মাথায় চুল কম বা আসতে আসতে ঝরে গেছে, সেই অবস্থাতেই আমাকে সবাই দেখেছে মঞ্চে তাই আমার এই মাথাভরা টাক নিয়ে কিছু আসে যায় না। আমার বা আমার দলের নাচে আমার টাক কোনও অন্তরায় নয়। কিন্তু যখন আর কিছু নিয়ে পারেনি তখন মানুষ আমার টাক নিয়ে পড়েছিল এখন ভাবলেও হাসি পায়। তবে আমি কোনও বিদ্রুপেই কান দিইনি। কেবলমাত্র নাচ নিয়ে থেকেছি। আমার কোনও ছাত্র এসে যখন বলে স্যার আমায় নাচ করতে দেখলে বন্ধুরা ‘লেডিস’ বলে, ‘বৌদি’ বলে; তখনও আমি তাদের একটাই কথা বলি, ‘নাচে মন দাও। বাকি সব কিছু বন্ধ হয়ে যাবে একদিন। এগুলো জাস্ট ডিসট্র্যাকশন!’

তবে রাজদীপের মতে আজকের দিনের ছাত্রছাত্রীরাও অনেক ‘রিসিলিয়েন্ট’। তাদের সহ্যশক্তি প্রচুর। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা নাচ ছাড়েনি। কিন্তু সমাজমাধ্যম অন্য সব পেশার মানুষের মতো নৃত্যশিল্পীদেরও দিশেহারা করে দিচ্ছে। সকলেরই মনে হচ্ছে সে আরও অনেককিছু পারে। সত্যিই তো পারে। কিন্তু ওই যে নাচ অনেক অনেক সময় দাবি করে শিল্পীর! অনেককিছু পারলেও অনেককিছুতে জড়িয়ে পড়া নৃত্যশিল্পীর চলে না। এমনিতেই যে-কোনও নৃত্যশিল্পীর শেখার পথে, এগিয়ে চলার পথে বাঁধা অনেক। এখন তো এমন একটা অবস্থা তৈরি হচ্ছে যে টাকা ছাড়া আর কোনও মঞ্চ পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ জাগছে কিন্তু নৃত্যশিল্পীদের তাও টিকে থাকতে হবে। টাকা থাকলেও মুড়ি-মুড়কির এক দর হতে দিলে চলবে না। নৃত্যশিল্পী হিসেবে সকলকেই এই শপথ গ্রহণ করতে হবে। করোনা মহামারী নৃত্যশিল্পের একটা মারাত্মক ক্ষতি করেছে। এই তিন বছর পরেও যে সেই রেশ কেটে গেছে তা নয়। ধীর গতিতে সবাই ছন্দে ফিরেছে। কলকাতাকেন্দ্রিক নৃত্যশিক্ষা ও নৃত্যশিল্প যেন গতিতে হালে পানি পেয়েছে নিঃসন্দেহে আরও ধীরতর গতিতে জেলা-মফস্বলে সব ঠিক হয়েছে, আগের জায়গায় ফিরেছে। তবে আরও পথ চলা বাকি। একটা প্রজন্মের পর রাজদীপরা বাংলার নৃত্যশিল্পে হাজির হয়েছিল, রাজদীপদের পর আরও বহু প্রজন্ম আসবে নিশ্চয়ই কিন্তু নৃত্যশিল্পীদের আরও অনেক প্রাপ্তি বাকি আছে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পাশের গলিতে এক দোকানি (ঘুঙুর পাওয়া যেত সে দোকানে ভালো) রাজদীপকে বলেছিল, ‘নাচ করতে এসছো। খুব কঠিন রাস্তা। পকেটে দশটাকা থাকলে একশো টাকা আছে ভাবতে হয় এই লাইনে, কিন্তু জানবে শেষ কথা তোমরাই বলবে। কারণ, তোমরা শিল্পী।’
আজও রাজদীপ ব্যানার্জি সে-কথার মর্মার্থ খুঁজে চলেছে। ভারতে, ভারতের বাইরে বিভিন্ন মঞ্চে ভরতনাট্যম প্রদর্শন করা এই গুণী শিল্পীর শেষ কথা বলা এখনও যে বাকি!
চলবে…
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।
