পুরুষমানুষের নাচে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে ওডিসি নৃত্যে অদ্বিতীয় সুবিকাশ মুখার্জি

পর্ব ৬

ড়ন্ত বিকেলের রোদ। চলে যাবার আগে ঘরে ঢুকে এসেছে এই বেলা দুটি জানালা দিয়ে। একটু আগেই জানালাগুলো খুলে দিয়েছে সে। স্কুলের দারোয়ানকে বলে বড়ো এই ঘরটা ঝাঁট দেওয়ানো হয়েছে। ব্যাগে একটা ধূপকাঠির প্যাকেট রাখাই থাকে, সে চারটে ধূপ বের করে জ্বেলে দিয়েছে। সারা ঘরটা পবিত্রতায়, সুগন্ধে মনোরম হয়ে উঠেছে। কিন্তু যাদের জন্য এতসব তারা কোথায়? আধঘণ্টা পেরিয়ে গেল কোনও ছাত্রছাত্রীর দেখা নেই। সামনে সংকল্প নৃত্যায়ণ-এর বার্ষিক অনুষ্ঠান। মাষ্টারমশাই কিন্তু সকালে উঠে ক্লাস করিয়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গেছিল আসন্ন একটি অনুষ্ঠানের জন্য নিজে প্র্যাকটিস করতে। দুপুরে ভালো করে খাওয়া হয়নি। আবার তিনটে বাজতে না বাজতে এই স্কুলে এসে হাজির যাতে কোনও ছাত্রছাত্রীকে তার জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা নিজের খেয়ালে এগোলেও সেই ছাত্রছাত্রীরা এখনও এসে পৌঁছাল না। বিকেলের ঢিমে রোদে ভরা, ধূপের সুগন্ধ মাখা বিরাট আয়না লাগানো ক্লাসঘরটায় এই বাংলার ওডিসি নৃত্য-এর একজন অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী সুবিকাশ মুখার্জি তখনও একাকী ছাত্রছাত্রীদের অপেক্ষায়।

গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রর সঙ্গে সুবিকাশ

এভাবে বসে থাকতে থাকতে সুবিকাশের মন চলে যাচ্ছে কুড়ি বছর আগেকার ভুবনেশ্বরে। শিবুদা (রতিকান্ত মহাপাত্র) হঠাৎ জানালেন, ‘তোমায় দিল্লি যেতে হবে। বিরজু মহারাজের বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠান। তুমি ‘সৃজন’-কে রিপ্রেজেন্ট করবে।’

সুবিকাশ খানিকক্ষণ হাঁ হয়ে থাকে। ‘সৃজন’ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র-এর ওডিসি-নিবাস। শিবুদা (রতিকান্ত মহাপাত্র) সেই সংস্থাকে আরও উন্নত করেছেন নিঃসন্দেহে। সুবিকাশরাও সৃজন-এ শিখছে প্রতিনিয়ত কিন্তু সেই সৃজন-এর একেবারে প্রতিনিধিত্ব করবে কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডের তিনতলা বাড়িটার ছোটো ছেলেটি, সুবিকাশ? এ-ও সম্ভব? সুবিকাশ আমতা আমতা করে বলে,

‘কিন্তু শিবুদা আমার যে কস্টিউম নেই! সব কলকাতায়। এখন কলকাতা গিয়ে কস্টিউম নিয়ে আবার দিল্লি যাব তাহলে তো খুবই দেরি হয়ে যাবে।’

‘ঠিক আছে এক কাজ করো, ওই ঘরে কস্টিউমের ট্রাঙ্ক আছে। খুলে দ্যাখো কী পাওয়া যায়।’

অবাক কাণ্ড। ট্রাঙ্ক খুলে সত্যিই একটা কস্টিউম পাওয়া যে গেল সেটা শ্রদ্ধেয়া সংযুক্তা পাণিগ্রাহীর! আর তখন ভুবনেশ্বর থেকে ট্রেনে দিল্লি যেতে পাক্কা দিন তিনেক সময় লাগত। স্লিপার ক্লাসে সুবিকাশ, রোজি (রাজশ্রী প্রহরাজ) আর কৌস্তভী যে কামরা পেয়েছিল পুরো নাচটাই ওখানে কোরিওগ্রাফি করতে করতে গিয়েছিল দিল্লি।

ট্রেনে তিন যুবক-যুবতীকে ক্লান্তিহীন নেচে যেতে দেখে সবাই তো অবাক! কিন্তু সুবিকাশের কিছু যায় আসেনি সেদিন। কেন? কী বলে এগুলোকে? ডেডিকেশন? হতে পারে। কিন্তু কেবল তা দেখানোর জন্যে সুবিকাশ মাঝে মাঝেই এই ঝক্কি সামলাত, তা নয়। নাচকে, ওডিসি নাচকে, মনপ্রাণ দিয়ে সারাজীবন ভালোবেসে গেছে সে। এগুলো তার বহিঃপ্রকাশ।

হেমা মালিনীর সঙ্গে সুবিকাশ

আজ থেকে নয়। সেই যে চার-পাঁচ বছর বয়স থেকে লতিকা মেমোরিয়াল স্কুলে কথক আর ভরতনাট্যম শিখতে যেত যে ছেলেটি, আর মন পড়ে থাকত উল্টোদিকের আরেকটা নাচের স্কুলে যেখানে গুরু গিরিধারী নায়েক ওডিসি শেখাতে আসত সেখানে, সে তখনও জানত না নাচে তার ভবিতব্য কী। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের ছেলে সে। বড়ো দাদার মতো তাকেও গিটার কিনে দেওয়া হয়েছিল, গিটারের স্কুলে ভর্তিও করা হয়েছিল, কিন্তু ওই গিটারই সে পঞ্চাশ টাকায় বেচে একজোড়া ঘুঙুর কিনে নিয়ে আসল একদিন। মা-বাবা উপলব্ধি করলেন ছেলে আসলে কী চাইছে। সুবিকাশকে গুরু গিরিধারী নায়েকের কাছে ওডিসিতে ভর্তি করানো হল। ওই যে গুরুজি প্রথমবার তাকে চৌকাতে (ওডিসি নৃত্যের একটি প্রাথমিক প্রকরণ, চৌকা) বসালেন, সে লাফিয়ে আবার চৌকাতে বসল- সেদিনের পর সুবিকাশের আর কোনও নাচের প্রতি কোনও আকর্ষণ থাকল না। তার ধ্যান-জ্ঞান সেদিনের পর থেকে এক এবং একমাত্র ওডিসি নৃত্যে গভীরভাবে ধরা রইল। গুরু গিরিধারী নায়েকের প্রথম ‘পুরুষ’ শিষ্য সুবিকাশ মুখার্জি।

সুবিকাশ তখন থেকেই নিজেকে পরম করুণাময় ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য বলে মনে করে। নাহলে এই যে গুরু গিরিধারী নায়েক রাসবিহারীতে নাচের ক্লাস শেষ হলে তাকে হাত ধরে প্রায় বাড়ির মুখ অবধি ছেড়ে দিয়ে যেতেন, সেটা কি সম্ভব ছিল? তাকে অসম্ভব ভালবাসতো গুরুজির ‘ওডিসি আশ্রম’-এর বড়ো দিদিরাও। অনিন্দিতাদি, অণিমাদি, সংযুক্তাদি, সমর্পিতাদি-দের অপার স্নেহতে সে লালিত হয়েছে। বাড়িতে মায়ের যা আদর, স্কুলে দিদিদেরও একই প্রশ্রয়। কিন্তু এই সুরক্ষিত ঘেরাটোপও তাকে একদিন ছাড়তে হল। মাত্র সতেরো বছর কিছুমাস বয়সের সুবিকাশের ডাক এল ভুবনেশ্বরের ‘ওডিসি রিসার্চ সেন্টার’ থেকে। সে পাড়ি দিল। ‘ওডিসি রিসার্চ সেন্টার’ আধুনিক গুরুকূল। কাকভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়, কসরৎ করতে হয়, ঠাকুরের জন্য ফুল তুলতে হয়, ঘর ঝাড়পোছ করতে হয় আর তারপর শুরু হয় নাচ-প্র্যাকটিস। আটঘণ্টা, নয়ঘণ্টা, দশ ঘণ্টা শুধু নাচের তালিম চলে। ছাত্রছাত্রীদের প্রতিটি শরীরী বিভঙ্গ কুঁদে সঠিকার্থে ওডিসিযোগ্য করে তোলেন স্বয়ং শ্রীমতি কুমকুম মোহান্তি। কুমকুম মোহান্তি, যাঁর জন্য গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র কত অভিনয়, কত পল্লবী তৈরি করেছেন, তাঁর হাতে তৈরি হতে থাকল সুবিকাশ। কুমকুমজি স্নেহকলস উপুড় করে দিতেন সুবিকাশের ওপর। তাকে নিয়ে তালিমের শেষে তিনি কটকের কত শত জায়গা ঘুরতেন। একবার নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একটি বিশেষ ঘর দেখিয়ে বললেন, ‘এই ঘরটাকে প্রণাম করো। এই ঘর ওডিসি নৃত্যের আঁতুরঘর। এই ঘরেই বহুদিন, বহুরাত্রি গুরুজি (কেলুচরণ মহাপাত্র) আর পণ্ডিত ভুবনেশ্বর মিশ্র নানা কম্পোজিশন করেছেন। প্রণাম করো!’ সুবিকাশ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। বড়ো গুরুজি গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র (ছোটো গুরুজি ছিলেন গুরু গিরিধারী নায়েক তখনও), পণ্ডিত ভুবনেশ্বর মিশ্র, শ্রীমতি সংযুক্তা পাণিগ্রাহী, পণ্ডিত রঘুনাথ পাণিগ্রাহী- এই নামগুলো তখন তার কাছে স্বপ্ন। কিন্তু ওডিসি রিসার্চ সেন্টারের কোর্স শেষ করে কলকাতায় ফিরলে সুবিকাশ যখন বুঝতে পারে না কী করবে, কীভাবে এগোবে; এমন একজনের কাছে তখন শিখতে শুরু করেছে যিনি কিছু তেমন শেখাচ্ছেনই না, এইরকম একটা দিশেহারা অবস্থায় কলকাতায় ওয়ার্কশপ করাতে এসে গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রই সুবিকাশকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোকে আর কারও কাছে যেতে হবে না। আমার কাছে চলে আয়।’

সুবিকাশ মুখার্জির দল

সেই গুরুজি সুবিকাশকে নিজের হাতে নিলেন। গুরুজি গত হতে সুবিকাশের দায়িত্ব নিলেন শিবুদা (রতিকান্ত মহাপাত্র)। শুধু কি ওডিসি শেখানো? কুমকুম মোহান্তি কোণারক উৎসবে যে-বছর শেক্সপিয়ারের ‘কিং লিয়র’ করলেন ওড়িয়া নৃত্যনাট্য হিসেবে ‘লিয়র’ কুমকুম মোহান্তির পাশে ‘এডমন্ড’ চরিত্র করতে হয়েছিল সুবিকাশকে। সমগ্র ভুবনেশ্বরে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। শিবুদা নিজে বহুদিন সুবিকাশকে ‘এডমন্ড’ সম্বোধনেই ডাকতেন। এবং সেই শিবুদা একদিন সুবিকাশকেই শেখালেন তাঁর নিজের অভিনীত ‘চূড়ামণি প্রদান’ অভিনয়টি। ‘চূড়ামণি প্রদান’ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র তৈরি করেছিলেন সঙ্কটমোচন মন্দিরে যে-বছর মহিলা নৃত্যশিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেই বছর। এই অভিনয়ের দুই চরিত্র, সীতা আর হনুমানের চরিত্রে সর্ব প্রথম অভিনয় করেছিলেন শ্রীমতী সংযুক্তা পাণিগ্রাহী ও শ্রী রতিকান্ত মহাপাত্র। এরপর সীতা বহুবার বদলেছে- কখনও সুজাতা মহাপাত্র, কখনও রিনা জানা আবার কখনও নন্দিনী ঘোষাল সীতা হয়েছেন কিন্তু হনুমানের চরিত্রে কেবল শিবুদা। সেই চরিত্রই শিবুদা হাতে ধরে সুবিকাশকে শিখিয়েছিলেন। এবং ওডিসি নৃত্যের ইতিহাসে কেবলমাত্র সুবিকাশ মুখার্জিই এই অভিনয় একই মঞ্চে দ্বৈত-চরিত্রেই পারফর্ম করেছে বহুবার! এই অভিনয় তাকে বিদেশের মাটিতেও টেনে নিয়ে গেছে। সেও কি কম প্রাপ্তি কিছু? এক সময় গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে সুবিকাশ। শিবুদা তো আছেনই কলকাতার সমস্ত বরিষ্ঠ শিল্পীদের ভালোবাসাও সে যথেষ্ট পেয়েছে। এ দেশে পুরুষমানুষের নাচে অনেক বাধা, কিন্তু সুবিকাশ সকলের আশীর্বাদে সে-সব বাধা অতিক্রম করেছে।

এতসব ভাবতে ভাবতে সুবিকাশ বিভোর ছিল। অতীতে ডুবে ছিল। অনেকক্ষণ পর খেয়াল হল বহু ছাত্রছাত্রী ইতিমধ্যে এসে পড়েছে, ঘুঙুর পরে তৈরিও হয়ে নিয়েছে। স্যারকে বিরক্ত করেনি কেউ। সুবিকাশের মুখে হাসি খেলে যায়। ছাত্রছাত্রীদের দেখলে তার আনন্দের সীমা থাকে না। সে বড়ো বড়ো গুরুদের কাছে ওডিসির যা-কিছু শিখেছে তা অবশ্যই এদের শিখিয়ে যেতে হবে। ওডিসি নৃত্যের পরম্পরাই তো তাই। এদের নিয়ে ‘সংকল্প নৃত্যায়ণ’-এর বার্ষিক অনুষ্ঠান তার ভালো হবেই।

চলবে…

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।

Written by