কৃষ্ণকলি, চন্ডালিকা থেকে চিত্রাঙ্গদা, সীমাদির নাচের আশ্চর্য ভুবন

পর্ব ৪

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের যে মেয়েটি পরবর্তীকালে পাড়ার সেলাই-দিদিমণি হয়েছিল, তেমন দিদিমণিদের দেখা আমরাও পেয়েছি ছোটোবেলায়। কেউ নাচের দিদিমণি ছিল, কেউ গানের, কেউ আবার বাড়ি বাড়ি টিউশন পড়াতে আসত। আমাদের ছোটোবেলার নাচের স্কুলে বড়োদিদিমণির একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। নাম সীমাদিদি (সীমা দেবনাথ)। আমাদের নাচেখড়ি ওই সীমাদির হাতেই। এক দঙ্গল মেয়ের মাঝে আমি ছিলাম একটি মাত্র ছেলে। নাচ ভালোই পারতাম। আর তাই ‘মেন-রোল’ সব সময়ই আমার থাকত। আমার নাচ ভালো লাগত ওই সীমাদির জন্য। কথক নাচ সীমাদি শেখাত অপূর্ব আর সীমাদি ঘুরত যখন মনে হত বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড ঘুরছে। তৎতৎ-এক, তৎতৎ-দো, তৎতৎ-তিন, তৎতৎ-চার এমন করে বোধ হয় আশি-নব্বইবার টানা ঘুরতে পারত সীমাদি। আর সবাই যখন বুকের কাছে দুটো হাত পতাকা-মুদ্রায় সোজাসুজি ধরত, সীমাদি নিজের হাতে খেলাত ত্রিপতাকা। আর আমি ওই ছোটোবেলাতেও লক্ষ্য করতাম সীমাদি কী অপূর্ব খোঁপা করে একটা, কী সুন্দর পিঠ-কাটা ব্লাউজ পরে অথচ একটুও খারাপ লাগে না দেখতে আর ওই যে সীমাদির গায়ের রং; ওই চাপা রংটাই ওর আসল সৌন্দর্য। ওতেই সীমাদি রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি, চন্ডালিকা কিংবা কুরূপা চিত্রাঙ্গদা হতে পারে! বড়োদিদিমণি আমাদের শেখাত অল্পই। গল্প করতে ভালবাসত বেশি। আমরা নাচ যা শিখতাম সীমাদির কাছেই শিখতাম। সীমাদি আমাদের নাচের দিদি, সীমাদি আমাদের মাইনে নেওয়ার ক্লার্ক, সীমাদি আমাদের ঘুঙুর পরিয়ে দিত আবার সীমাদিই আমাদের নাচের সঙ্গে গান গাইত। সীমাদির গানের গলাটাও ছিল অনন্যসাধারণ। যখন ‘এত বড়ো আকাশটাকে ভরলে জোছনায়’ গাইত সীমাদি সেদিন যেন আকাশে সত্যিই একটা ইয়াব্বড়ো চাঁদ উঠত!

এ হেন সীমাদি হঠাৎ নাচের স্কুলে আসা বন্ধ করে দিল। আমরা খুব কষ্ট পেতাম তখন। সীমাদির অনুপস্থিতি আমাদের অনেকটা বড়ো করে দিল যেন। কেন আসে না? কেন আসে না সীমাদি? বড়োদিদিমণি বলে, ‘তোমাদের সীমাদিদির বেবি হবে।’ মেয়েদের এই যে মাতৃকালীন ছুটির সময়টি, খোঁজ নিয়ে দেখলে জানা যাবে কত ছাত্রছাত্রী এ সময় ওই দিদিমণিকে চোখে হারায়। তার কথা বারবার মনে পড়ে। আমাদেরও অমন হত। আমরাও নাচের স্কুলে ছোটোদের ক্লাস নিতাম তখন, কিন্তু সীমাদির মতো আদর করে শেখাতে পারতাম কোথায়? তারপর আসতে আসতে আমাদের মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক চলে এল আর আমরাও নাচের কথা, নাচের স্কুলের কথা ভুলে গেলাম।

এর বহু বছর পর সীমাদির সঙ্গে দেখা। সীমাদি এক রয়ে গেছে- কোনওদিন সোনা-রুপো পরতে দেখিনি সীমাদিকে। কখনও শাড়ি ছাড়াও দেখিনি। একটা আশ্চর্য, অন্যরকম রঙের শাড়ি আর মাটির গয়না-পরা সীমাদি এত বছর পরেও একইরকম আছে। কী করে আছে?

‘এখনও নাচ করো, সীমাদি?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘পায়ে পায়ে করি না, মনে মনে করি। নাচ কি ছাড়া যায়?’

কী আশ্চর্য কথা! কত সত্যি কথা! মনে প্রাণে নৃত্যশিল্পী হতে চাওয়া সব মানুষই নাচ থেকে দূরে গেলেও বোধহয় মনে মনে নাচেই থেকে যায়।

সীমাদি আর আমার মধ্যেকার নাচের স্কুলটা আর থাকেনি ঠিকই, কিন্তু একে অপরের যোগাযোগে থেকেছি আমরা। সীমাদির পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছি আমি আর সীমাদি আমার কর্মস্থলেই চাকরি নিয়েছে। কিন্তু নাচের স্কুলের দিদিমণি যখন স্কুলের ‘ডান্স টিচার’ হয়, তখন অনেকটা পথ পেরিয়ে আসতে হয় তাকে। নিঃসন্দেহে। নিঃশব্দে। সে হয়তো ‘পারফর্মার’ হতে পারেনি, কিন্তু ওই যে শিক্ষক হয়েছে সেটাই অনেক বিরাট ব্যাপার। যে-মেয়েটির একটা ফ্রক পরে পুজোর চারটে দিন কাটত, যে-মেয়েটি নাচ করে ঘেমে নেয়ে বাড়ি ঢুকলে ঠাকুরদা ঠাট্টা করে বলতো, ‘আইজ কত কামাই কইরা আইলা ঘুঙুর বাইন্ধা?’ আর ঠাকুমা পাশ দিয়ে খিকখিক করে হেসে উঠত (কথার অন্তর্নিহিত শ্লেষটা তখনও পেটে একটাও দানা না পড়া মেয়েটা বুঝতেই পারেনি), যে-মেয়েটির নাচের পরীক্ষার দিন পাঁচ টাকা ছিল না বলে আর মাথার চিকিৎসায় মা হাসপাতালে ছিল বলে পরীক্ষাই দিতে দেওয়া হয়নি অথবা তরুণ মজুমদারের একটি প্রখ্যাত ছবিতে যে-মেয়েটির একটা গোটা নাচ করবার কথা ছিল, যাকে প্র্যাকটিসও করানো হয়েছিল কিন্তু শুটিঙের দিন বলা হল ‘তোর রংটা চাপা তো ক্যামেরায় ভালো আসছে না’ – সেই মেয়েটি যখন কোনও এক সময় অন্তত একটি নামজাদা স্কুলের ডান্স টিচার হতে পারে, তার সত্যিই অনেকটা প্রাপ্তি হয় তখন।

 

আসলে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্প ও শিল্পীদের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে করতে আমরা কখনও ভুলে যাই এর একটি স্তরে এমন কিছু শিল্পী থাকেন বা আছেন, যাঁদের জীবন-সংগ্রাম এতটুকু কম নয়। তাঁরা হয়তো জাতীয় স্কলারশিপের দৌড়ে থাকতে পারেননি, দূরদর্শন থেকে নাচের ডাক আসেনি কখনও, তাঁরা হয়তো সঠিকার্থে শাস্ত্রীয়নৃত্য চর্চারই সুযোগ পাননি, কিন্তু তাঁরাও অনেক স্বপ্ন নিয়ে নাচ শেখা শুরু করেছিলেন। তবে তেমন গুরুর দেখা মিলল কোথায় জীবনে, সে-ভাবে প্রকাশিতও হতে পারলেন না। অথচ, নৃত্যের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা-টান-আবেগ আজও অনেক প্রথিতযশা শিল্পীর থেকে কয়েকগুণ বেশি। এই যে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠা নাচের স্কুলগুলিকে ফুচকার দোকানের সঙ্গে তুলনা করেন বরিষ্ঠ শিল্পীরা, তখন তাঁরা সীমাদিদের ইতিহাস উপেক্ষা করেই কথাগুলো বলেন। কিন্তু এই পাড়ার নাচের স্কুল আর শেখানকার নাচ-শেখানো দিদিমণিদের যে আজও প্রয়োজন কত অপরিসীম তা হয়তো ভাবীকাল লিপিবদ্ধ করবে কখনও।

চলবে…

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।

Written by