
বাংলা ভাষায় একটা গান আছে ‘সোহাগ চাঁদ বদনী ধনি নাচো তো দেখি’। গানটিতে কোনও এক বালিকাকে নাচ দেখাতে বলা হচ্ছে। অবশ্য ‘নাচো তো দেখি’-র আরও স্পষ্টত অর্থ দাঁড়ায় সে কীরকম নাচতে পারে তা পরীক্ষা করতে চাওয়া। আবার তার আগেই এই মেয়েকে ‘চাঁদ বদনী’ সম্বোধন করা হয়েছে মানে তার শারীরিক সৌন্দর্য এখানে বিচার্য। এবং পরের অংশেই ‘বালা নাচো তো দেখি’ বলা হয়েছে তিনবার। বাঙালি মেয়ের নাচ অতএব ‘দেখবার’ বিষয়! বাঙালি মেয়ের ‘নাচ করার’ ইতিহাস অবশ্যই ব্যথার ইতিহাস। এত সহজে সে শিল্পীর কৃতিত্ব অর্জন করে নিতে পারেনি। বহু প্রতিভাধর নারী নৃত্যশিল্পী কালের গর্ভে তলিয়ে গেছেন কেবলমাত্র পারিবারিক ও সামাজিক চাপে। কাজটা কঠিন থেকেছে সব সময়ই। আজও যে সেই ছবি খুব পরিষ্কার হয়েছে তা নয়।

কলকাতার একটি নৃত্যোৎসব প্রথমবার আমার দায়িত্বে এলে মেয়েদের নাচ করতে পারার নানা অসুবিধার পাশাপাশি আরও অনেক কিছুই আমার গোচরে আসে। আগের যে অবয়ব ছিল অর্থাৎ অনুষ্ঠানের সাতটি দিন কেবল ওডিসি নৃত্য হবে এবং তার দেখভাল করবেন গুরু গিরিধারী নায়েক, আমি সেটা সম্পূর্ণ ভেঙে দিই। গুরুজির সঙ্গে যোগাযোগ করি না এবং ভারতবর্ষের আটটি স্বীকৃত শাস্ত্রীয় নৃত্যের মধ্যে শুধু অসমের সত্রীয় ছাড়া চালু করি বাকি সবকটিই। বাংলার গৌড়ীয়ও ডাক পায়। এমন কাজ করতে গিয়ে দেখি কলকাতায় যে কত শত গুণী শিল্পী আছেন প্রতিটি নৃত্যক্ষেত্রে বিশেষত নারী, তা আর বলার নয়। কলকাতাতে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিক্ষার প্রসার কিন্তু ব্যাপক তবে প্রচার তেমন নেই বললেই চলে। বাঙালির যে সাংস্কৃতিক অহংকার, সেই বিশাল প্রাচীর ভেদ করে শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পীরা যে-ভাবে অনায়াসে ঢুকে পড়েছেন; কাগজে-টিভিতে তাঁদের নিয়ে খবর হয়েছে, সাহিত্য হয়েছে, সেই সাহিত্য বহুল প্রচারিত পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তাঁরা সেলিব্রিটি হয়েছেন অচিরেই- সেই সৌভাগ্য আরও অনেক সংগ্রাম, পরিশ্রম করেও নৃত্যশিল্পীদের একদমই জোটেনি। বাঙালি মানসে স্থান পেয়েছেন বড়ো জোর উদয়শঙ্কর ও পরিবার, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার ও রঞ্জাবতী, শ্রীমতি থাঙ্কমণি কুট্টি কিংবা সুতপা তালুকদার। পরবর্তী কালে প্রীতি পাটেল, শর্মিলা বিশ্বাস। ভেবে দেখুন, আটটি শাস্ত্রীয় নৃত্যের এত চর্চা, একটা গোটা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-যেখানে নৃত্যে ডিগ্রি কোর্স আছে, সেখানকার এত বছরের এত ছাত্রছাত্রী, অথচ কলকাতার সংস্কৃতির অঙ্গনে ঠিকঠাক কল্কে পেল মাত্র চার-পাঁচ জন! এগুলো হওয়া উচিত ছিল না।
কিংবা বলা যায় নৃত্যশিল্পীদের বিশেষত শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী-দের প্রতি অন্যায়ই হয়েছে। বারাসাতের যে-ছেলেটি কলকাতায় আসে মণিপুরী শিখতে কিংবা কলকাতার যে-মেয়েটি অতি কষ্টে কিছু টাকাপয়সা জোগাড় করে চেন্নাই যাচ্ছে কুচিপুরীর ওয়ার্কশপ করবে বলে আজ দুজনের কাছে সত্যিই কোনও সঠিক দিশা নেই। হয় তাকে একটা নিজের নাচের স্কুল খুলতে হবে অথবা পকেট থেকে টাকা দিয়ে পে অ্যান্ড পারফর্ম অনুষ্ঠান যেগুলো হয়, তাতে ‘প্রতিভা প্রদর্শন’ করতে হবে। ডোভারলেন মিউজিক কনফারেন্স বা সংগীত রিসার্চ একাডেমির মতো সারারাত জেগে তার বা তাদের নাচ কেউ দেখবে না কোনওদিন। খুব বেশি হলে কোনও চ্যানেলে হিন্দি গানের সঙ্গে ছোটোদের নাচ শেখানোর কাজ জুটবে। মেয়েদের বিশেষত আবার সংসার সামলে, শ্বশুরবাড়ির মন বুঝে, স্বামীর চা-জলখাবার বানিয়ে তবে নাচে আসতে হয়। অবিবাহিতদের নাচের এমএ পরীক্ষার মাঝেই মা-বাবা বিয়ের তারিখ ফেলে দেন। আর এগুলো যে গরীব, নিচু শ্রেণির মানুষদের মধ্যে হয় একদমই তা ভাবার অবকাশ নেই। সব থেকে বেশি হয় ‘বনেদি’, ‘সম্ভ্রান্ত’ পরিবারগুলোর মাঝে।

বহু যুগ আগে সাদা-কালো টিভির যুগে আমরা রাতের দূরদর্শনে দেখতে পেতাম ‘প্রোগ্রাম ফর ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’। তাতে বিভিন্ন প্রদেশের শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রদর্শন হত। ওখান থেকেই শিখেছিলাম কোনটা কোন নাচ। ছোটোবেলায় ক্যুইজে লাগত। কিন্তু সামনে থেকে অনেক নৃত্যই আমি অন্তত এখন থেকে মাত্র দশ বছর আগে পর্যন্ত কলকাতায় দেখিনি। যেমন, মোহিনীআট্যম। ২০১৬-১৭ সালে আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন শ্রীমতী মোম গাঙ্গুলী চ্যাটার্জি। আরেকটু পর অনুষ্ঠান শুরু হবে। আমার হাতে মাইক। আমি সেদিনের ঘোষক। কিন্তু তখনও মোমদিকে নিষ্পলক দেখেই যাচ্ছি। মোমদি এমনিতে অপূর্ব সুন্দরী। সুন্দরী বলতে কাটা কাটা চোখ-মুখ-নাক তো আছেই, সাধারণ বাঙালি মেয়ের তুলনায় বেশ খানিকটা লম্বা এবং মডার্ন হাইস্কুলে-পড়া একটা ঝকঝকে উপস্থিতি, সুব্যবহার। তবে ওঁর নাচ যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন শিল্পের কোন পর্যায়ে তা উন্নীত। মোহিনীআট্যম আসলে দেবদাসীদের নৃত্য। শ্রীবিষ্ণু নারীবেশে মোহিনী হয়ে অসুরদের যে নৃত্যে মনোরঞ্জন করেছিলেন এবং অমৃতভান্ড তাদের থেকে ছল করে ছিনিয়ে এনেছিলেন, মোহিনীআট্যম আসলে সেই নৃত্য। অতএব, লাস্য এ নৃত্যের স্থাপনা। মেয়েরাই বেশিরভাগ এ নৃত্য করতে পারেন।
মোমদিও নৃত্যের মাধুর্যে যে ব্রীড়ার ভঙ্গি শরীরে ফুটিয়ে তুলতে পারেন তা অনন্যসাধারণ। মোমদি কলকাতার তথাকথিত উচ্চশ্রেণির মেয়ে এবং কলকাতার বিখ্যাত এক পরিবারের পুত্রবধূ। শ্রীমতি থাঙ্কমণি কুট্টির যে সময়ে ভারতজোড়া নাম এবং ছাত্রছাত্রী বলতে কলামণ্ডলম ভেঙ্কিট, উমা ভেঙ্কিট, অনিতা মল্লিক, অভয় পাল, সংযুক্তা ব্যানার্জি কিংবা অনুসূয়া ঘোষ – এমন সব দিগ্বিজয়ী শিল্পীরা সব ক্লাসরুম আলো করে আছেন, সেই সময় মোম চ্যাটার্জিও একটি বিশেষ নাম। ছোট্টবেলা থেকে তাঁর প্রিয় আন্টি-র কাছে ভরতনাট্যমে তালিম পেলেও, ভারতবর্ষের বিভিন্ন নামিদামি জায়গায় নৃত্য প্রদর্শন করলেও মোহিনীআট্যমে যখন এলেন এই থাঙ্কমণি কুট্টির শিক্ষকতায়, তখন তাঁর মধ্যে বহু প্রশ্ন জাগল। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের এক সময়ের প্রকরণ ছিল প্রশ্নহীন আনুগত্য। এই নৃত্যের সমস্ত ধারা আসলে গুরুমুখী বিদ্যা। কিন্তু তরুণী মোমের গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও জ্ঞান আহরণে তিনি ছোটো থেকেই নিরলস। তাঁকে বুঝতে হত, তাঁকে জানতে হত গভীরে গিয়ে। সেই টানেই মাত্র পনেরো-ষোলো বছর বয়সে তিনি জীবনের সবরকম ঝুঁকি নিয়ে রাজধানী এক্সপ্রেসে চেপে বসেছিলেন। গন্তব্য দিল্লির এশিয়াড ভিলেজ। একা, সম্পূর্ণ একাকী পৌঁছে গিয়েছিলেন ভারতবর্ষের মোহিনীআট্যম নৃত্যের অবিসংবাদী শীর্ষ গুরু শ্রীমতি ভারতী শিবাজির চরণে। সেখানে গুরু ভারতী শিবাজির শিক্ষা ও স্নেহ তো পেলেনই সঙ্গে জুটল বিজয়লক্ষ্মী, বাণী ভাল্লাদের বন্ধুত্ব। পরবর্তীকালে সমগ্র ভারতবর্ষের দিকপাল ‘মোহিনী’রা তখন তৈরি হচ্ছিলেন ভারতী শিবাজির হাতে। এরপর মোমদি কলকাতায় ফিরলেন। গাঙ্গুলি পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক গাঁটছড়া হল এবং তারপর কোল আলো করে এল ফুটফুটে কন্যাসন্তান। যে কোনও পরিবারেই হোক, মেয়েদের নাচ চালিয়ে যাওয়া খুব সহজ না। আর যে মেয়েটি মনে প্রাণে শিল্পী সংসারে তার সহাবস্থান ভালোরকম কঠিন। মোমদি, বাঙালি মেয়ে মোম, অন্য একটি প্রদেশের নৃত্য আপন করেছেন শুধু নয়, আইসিসিআর থেকে শুরু করে সংগীত নাটক আকাদেমির সব পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। খুব কম বাঙালির এইসব রেকর্ড আছে। ভারতবর্ষের হেন কোনও বিখ্যাত মঞ্চ নেই যেখানে মোম গাঙ্গুলি চ্যাটার্জি তাঁর মোহিনীআট্যম নৃত্য পরিবেশন করেননি। একক নৃত্য করেছেন। কখনও গুরুর সঙ্গী হয়েছেন আবার নিজের দল নিয়েও গেছেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ মোহিনীআট্যমে তেমন কোনও মুখই নেই কলকাতায় এই মোমদি আর প্রিয়দর্শিনী ঘোষ ছাড়া। উমা ভেঙ্কিট অকালপ্রয়াত আর সংযুক্তা ব্যানার্জি বহু বছর বিদেশে। এর বাইরে এত বছরে কলকাতা থেকে সর্ব ভারতীয় মোহিনীআট্যমে আর একজন শিল্পীও তৈরি হল না কেন? মোমদিরাই পারতেন অনেক ছাত্রী তৈরি করে বাঙালি মেয়ের ‘চাঁদ বদনী ধনি নাচো তো দেখি’-র অভিশাপ চূর্ণ করতে।
ছবি: সংগৃহীত
(চলবে…)
______________________
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।
