
নদী কি নিজের নাম নিজে রাখে?
শিশুর মতন পাহাড়ের বুকে ফেটে পড়া ঝর্ণা থেকে শুরু, মাটির গন্ধ শুঁকে শুঁকে এগোয়, বৃষ্টির জলে ভিজে মোচড় খায়, কাদা টানে, মাছ জন্মায়, আবার মানুষ ডাকে— সেই নদী নিজের নাম বেছে নেয় না। নাম দেয় মানুষ। আর যে নাম দেয়, সে একপ্রকার নদীটাকে নিজেরই করে ফেলে।
সোমেশ্বরী নদী-র কথা বলছি, ক্ষমতার চিহ্নকে সঙ্গে করে নিয়ে বয়ে চলেছে। মেঘালয়ের পাহাড় বেয়ে নামা অজস্র স্রোত একত্রে এসে একটি নদীতে পরিণত হল, তারপরে ৬৮৬ বঙ্গাব্দে এলেন এক ‘সিদ্ধপুরুষ’— সোমেশ্বর পাঠক। তিনি এলেন, দেখলেন, জয় করলেন, আর নদীর গায়ে সেঁটে দিলেন নিজের নাম। নদী হয়ে গেল ‘সোমেশ্বরী’। কে ছিল এই পাঠক? তিনি নদীকে কি মুক্ত করলেন, না বন্দি করলেন নিজের নামে?
একসময়ের সিমসাং নদী, এখন নাম নিয়েছে সোমেশ্বরীতে। নামে সোমেশ্বরী হলেও, ফাঁকতালে ব্যথার রেখাই যে বয়ে চলছে চিরকাল ধরে এ কথা গিয়েই বুঝলাম, বুঝলাম এই যে দেশভাগ নদীগুলোকে ছুঁতে পারেনি, ছুঁতে পারেনি নদীর একটি পাথরকেও। সোমেশ্বরীর একটা ব্যথা আছে।
একটি নাম মানে তো একটি ইতিহাস, কেননা ভেঙে-ভেঙে চলা সকল কিছু এলিয়ে দিয়ে যেতে চায় পথকে। আর এই ইতিহাস মানে ক্ষমতা। পাহাড় থেকে নামা ঝর্ণার যদি নাম বিঞ্চুরীছড়া হয়, তবে তা আঞ্চলিক নাম, মাটি-জল-ভাষার নাম। কিন্তু সেই সব আঞ্চলিকতা ছাপিয়ে এসে যখন কেউ নিজের নাম বসিয়ে দেয়—তখন সেই নাম হয়ে ওঠে একধরনের উপনিবেশিক চিহ্ন। নদী যেন নিজের শরীর হারিয়ে ফেলে। তার ভাষা বদলে যায়।
এই নামকরণের রাজনীতি কেবল নদী নিয়ে নয়। শহরের নাম, গ্রামের নাম, রাস্তার নাম, এমনকী মানুষদের নাম—সব জায়গাতেই চলে নামের দখলদারি। কার নাম থাকবে, কার ইতিহাস লেখা হবে, কার নাম মুছে যাবে—এই সবই ক্ষমতার খেলা।
একসময়ের সিমসাং নদী, এখন নাম নিয়েছে সোমেশ্বরীতে। নামে সোমেশ্বরী হলেও, ফাঁকতালে ব্যথার রেখাই যে বয়ে চলছে চিরকাল ধরে এ কথা গিয়েই বুঝলাম, বুঝলাম এই যে দেশভাগ নদীগুলোকে ছুঁতে পারেনি, ছুঁতে পারেনি নদীর একটি পাথরকেও। সোমেশ্বরীর একটা ব্যথা আছে। শুদ্ধ সারংয়ের ব্যথা, দু-পাশে পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদী, সবাই বালু উত্তোলনে ব্যস্ত। ঠিক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে মায়েদের যেমন ভূমিকা, সবাই মায়ের থেকে কেবল নিতে থাকে, কেউ মা এর দিকে নজর অবধি দেয় না।
দুর্গাপুরেরই স্থানীয় কবি লোকান্ত শাওন জানান, ভারতের নক্রেক ও সিজোক পাহাড়ের থেকে উদ্ভুত এই নদী। গভীরতায় ক্ষীণ, স্রোতে অবশ্য ভেসে যেতে পারে যা কিছু। পরে জানা গেল, মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে বৃষ্টি পড়লেই ঝর্ণাগুলো লাফিয়ে পড়ে নামে—বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া, রমফা—সবার আলাদা আলাদা ভাষা, আলাদা চঞ্চলতা। তারপর সবাই মিলে নামে একটা নামধারী স্রোত হয়ে—সোমেশ্বরী, নয়া নামে পুরোনো জলই বয়ে চলে।
ওদিকে মেঘালয়ের বাঘমারা বাজার, যার প্রাক্তন নাম ছিল ‘বঙ বাজার’—সেখান থেকে বাংলাদেশে ঢোকে এই সোমেশ্বরী। ঢোকে রাণীখং পাহাড়ের গা বেয়ে। কেমন যেন নাচতে-নাচতে আসে— কখনও শিবগঞ্জ, কখনও কুমুদগঞ্জ, আবার কোনাপাড়া, সিধলি, কলমাকান্দা হয়ে একেবারে মধ্যনগর পর্যন্ত। শেষমেশ ধনু নদীতে গিয়ে বলে, “এই নাও, আমি তোমাদের সঙ্গে মিশে গেলাম।”
কিন্তু গল্প এখানেই থামে না। বর্ষা বাদে বাকি সময় সোমেশ্বরী নিঃশব্দ সাধিকা। জল থাকে না, থাকে কেবল স্মৃতি। ১৯৬২ সালে এক পাহাড়িয়া ঢল এসে বলল, এই পথে যাওয়া বারণ, নতুন রাস্তা খুঁজবার পালা। আর সেই ঢল সোমেশ্বরীকে নিয়ে চলে গেল দক্ষিণ দিকে, বানিয়ে ফেলল এক আলাদা খাত—যার নাম পড়ল শিবগঞ্জ ঢালা। এখন এটিই মূল স্রোতধারা। নদীর আবার কত শাখা! কেউ চৈতালি হাওরের বুক চিরে যায়, কেউ আবার কংস নদীতে গিয়ে বিলীন হয়।
আত্রাখালি নদীও জন্মাল একদিন, ১৯৮৮-র সেই ভয়ানক পাহাড়িয়া ঢলের রাতে। এমনকি ২০১৪-র বন্যার পর এক নয়া গাঙ-ও উঠে এল আত্রাখালির বুক থেকে, উত্তরের দিকে। আবার কিছু ভাটিতে নতুন জন্ম নেয় গুনাই, বালিয়া, খারপাই—নামগুলো শুনলেই মনে হয় যেন নদীর ছেলে-মেয়ে।
আর এই নদীতেই এক কালে বাস করত এক আশ্চর্য মাছ— মহাশোল। সে মাছ এখন প্রায় উপাখ্যান। সোনালি ঝকমকে গায়ের সেই মাছ দুর্গাপুরে অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহার হত। মানে সত্যিকারের ‘মাছের রাজা’। এখন কোথায়? নদী শুকিয়ে বালির ট্রাক উঠে গেছে নদীর ছিদ্রে ছিদ্রে। মহাশোলেরা উঠে পড়েছে লোককথায়। কেবল মহাশোল নয়, কবি লোকান্ত শাওন জানালেন, নানিদ মাছ, রানি মাছ, লাচু মাছ, গনিয়া মাছের কথা। মহাশোল এবং নানীদ মাছ নাকি এতই সুস্বাদু ছিল যে দুর্গাপুরে জামাই বরণ হত না এই মাছ ছাড়া, দশটা মহাশোল দিয়ে জামিনও পেয়ে যেতো তৎকালীন আসামি।
এই নদীতেই এক কালে বাস করত এক আশ্চর্য মাছ— মহাশোল। সে মাছ এখন প্রায় উপাখ্যান। সোনালি ঝকমকে গায়ের সেই মাছ দুর্গাপুরে অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহার হত। মানে সত্যিকারের ‘মাছের রাজা’। এখন কোথায়? নদী শুকিয়ে বালির ট্রাক উঠে গেছে নদীর ছিদ্রে ছিদ্রে।
বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া, রমফা-এগুলোর সবকটাই স্থানীয় নাম, গারো ভাষায় যার মানে পাহাড়ের কোল বেয়ে বয়ে আসা সরু জলের ধারা। গারো জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার উপাদান এই নদীগুলো, যেখানে মাছ ধরা, পাহাড় ধুয়ে আনা শস্য ধোয়া, বাচ্চাদের জলকেলি—সবকিছুই এই স্রোতের সঙ্গে যুক্ত। গারো, হাজং, কোচ, বর্মন—এই জনগোষ্ঠীগুলোর নদী নিয়ে নিজস্ব কল্পনা, রীতিনীতি, লোককথা ছিল। তাদের কাছে নদী কেবল জল নয়— নদী ছিল মা, আশ্রয়, উৎসব, পুরাণ। গারো পুরাণে নদী কখনও দেবীরূপে, কখনও যুদ্ধের সাক্ষী। নদী কিন্তু একধরনের জীবন্ত আর্কাইভ। এর ধারে যেসব জাতিগোষ্ঠী বাস করে, তাদের গান, পূজা, বিবাহরীতিতে এই নদীর জল মিশে থাকে। গারোদের Wangala উৎসবে নদীর জল দিয়ে স্নান করে ফসলের দেবতাকে আহ্বান করা হয়। হাজংদের কাহিনিতে নদী হল বিচ্ছেদের সীমানা—যেখানে উপনিবেশের সময় পাহাড় থেকে নামতে বাধ্য করা হয়েছিল বহু পরিবারকে। তারা নদী পার হয়ে এসেছিল, নাম হারিয়েছিল, নতুন নাম পেয়েছিল।
এই নদীগুলো আমাদের পরিচয় বহন করে। কিন্তু সেইসব কাহিনি আমাদের ইতিহাসের বইয়ে থাকে না। কারণ বইয়ে যেটা ঢোকে, সেটা হল দখলদারদের লেখা ইতিহাস। নদীর উপর নাম চাপিয়ে দেওয়া মানে তার উৎসের ভাষাটিকে অস্বীকার করা, তেমনই সোমেশ্বরী নামটিও একধরনের ‘কলোনাইজড লেবেল’…
এ নদী আর কেবল জলের নয়—এটা ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, শ্রেণিচিহ্ন, আধ্যাত্ম আর অবক্ষয়ের দাগ নিয়ে বয়ে চলেছে। একেক ঢেউ যেন একেক মিথ, আর একেক মোড়ে লুকিয়ে আছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মানুষের লোভ, আর নদীর আত্মরক্ষা। এই নদীর বুকে যারা মাছ ধরে তারা জানে, নদীর জল নাকি নদীর দেহ—কোনটা বেশি দামী? নদী হল তার গতি, তার প্রতিবাদ, তার অন্তঃসলিলা গল্প—যেটা আমরা অনেককাল আগেই শুনতে ভুলে গেছি।

