
তাঁর জীবনে একটাই স্লোগান ‘বন্দে মানব’। একথা উপলব্ধির জন্য তিনি রেখে গেছেন তাঁর যাপন ও যাবতীয় প্রকাশিত লেখালিখি। তিনি সাংবাদিক, লেখক, মানবতাবাদী গৌরকিশোর ঘোষ। হাফ পাঞ্জাবি বা ফতুয়ার মতো জামা, ধুতির কোঁচা মাটিতে ঠেকে না। ভারী ফ্রেমের চশমার আড়ালে উজ্জ্বল দৃষ্টি, আর অবিন্যস্ত গোঁফের ফাঁকে একটু হাসি। এই হল তাঁর চেনা রূপ। মতি নন্দী মনে করতেন, দরিদ্র দেশের লেখকদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা জরুরি। শুধু মতি নন্দী নন, এ কথার প্রতি আজীবন দায়বদ্ধ ছিলেন গৌরকিশোর। এই প্রজন্ম যদি এক কথায় জানতে চায় গৌরকিশোর ঘোষ কে? উত্তর হবে, এক সত্যান্বেষী। একজন আপাদমস্তক সৎ, নির্ভীক সাংবাদিক, যিনি কখনও নিজের কলম বিক্রি করেননি।
গৌরকিশোর তাঁর উপন্যাসে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ধারাবাহিকতার উপর যে নির্মোহ আলো ফেলেছেন, বাংলা উপন্যাসে সে দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে। এমনকী ভারতীয় উপন্যাস সাহিত্যেও। ‘দেশমাটি ও মানুষ’ নামের এপিক ট্রিলজিতে ধরতে চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলমানের ক্রমবিচ্ছিন্নতার ইতিবৃত্ত। এক সময় নিজের সাহিত্য দর্শন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “জীবন ও সাহিত্যের সঙ্গে সত্যের সম্পর্ক যে নিবিড়, এই কথাটা শুনি অন্নদাশঙ্কর রায়ের মুখে ৩৬-৩৭ বছর আগে। তরুণ বয়সে কথাটা শুনেছিলাম বলেই হোক কিংবা অন্নদাশঙ্কর কথাটা খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন বলেই হোক, আমার কাছে ওটা লেখক জীবনের মন্ত্র হয়েই রয়ে গেল।” (‘জীবন, সত্য, সাহিত্য’, জিজ্ঞাসা, শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৯০)।

এই সত্য-মিথ্যার স্বরূপ নিয়ে সত্যান্বেষী গৌরকিশোরের ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর ‘জবানবন্দী’ গল্পে। আবার মধ্যবিত্ত জীবনের অবক্ষয়-অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব-স্বার্থ সঙ্কীর্ণতাও তাঁর ‘অন্ধকূপ’-এর মতো গল্পে বর্ণিত হয়েছে। যুদ্ধ আবহে গৌরকিশোর লক্ষ করেছিলেন তীব্র খিদের দূষিত গন্ধে ভরে ওঠা শহরকে। হয়তো সেই কারণে যুদ্ধোত্তর কলকাতার রেখাচিত্রও ‘গল্প’ হয়ে ধরা পড়েছে তাঁর কলমে, “ভাঙা একটা টিনের সুটকেস সম্বল করে একদিন কলকাতায় এসেছিলুম। আর এই কলকাতা ছাড়লুম এক ভাঙা মনের তোরঙ্গ ঘাড়ে করে।” (‘এই কলকাতায়’)। গৌরকিশোর ঘোষ নিজে এক সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র শাখার কর্মী হিসেবে রিলিফ কমিটিতে কাজ করেছিলেন, লঙ্গরখানা চালিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনৈতিক কার্যকলাপের সঙ্গে তিনি যুক্তও ছিলেন এক সময়ে। দলের পক্ষ থেকে লালমণিরহাটে রেলকর্মী ইউনিয়ন পরিচালনা করেছিলেন। কাজেই যুদ্ধ-দাঙ্গা-মন্বন্তর, দেশভাগ ও রাজনৈতিক পটভূমিতে ১৯৬৯ সালে, প্রকাশিত হয় উপন্যাস ‘সাগিনা মাহাতো’। চা বাগানের শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন। তাঁদের নেতা সাগিনা। যা পরে চলচ্চিত্রে আরও পরিচিতি পায়। কেন্দ্রীয় চরিত্রে দিলীপকুমার। ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদতরণী, হা হা’-র মতো গল্প বা ‘প্রেম নেই’, ‘মনের বাঘ’-এর মতো উপন্যাস ছাড়াও তিনি লিখেছিলেন ‘ম্যানেজার’, ‘একটি হত্যা, একটি লাশ, একটি আততায়ী’-র মতো গল্প। গৌরকিশোরের সৃষ্ট ব্রজদার ‘গুল্প’ আসলে ‘গুল’ আর ‘গল্প’ মিলিয়ে। পরে তা থেকে নির্মিত হয় বিখ্যাত বাংলা চলচ্চিত্র ‘ব্রজবুলি’।

গুরুত্বপূর্ণ একজন সাহিত্যিক হলেও তাঁর সাংবাদিক পরিচয়ই জনপ্রিয় হয়েছে। সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন ‘সত্যযুগ’ কাগজে, তারপর আনন্দবাজারে চাকরি করেছেন, দেশ পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। আনন্দবাজারের চাকরি ছেড়ে কয়েকজনের সহযোগীতায় শুরু করেন ‘আজকাল’ সংবাদপত্র। তিনিই ছিলেন প্রথম সম্পাদক।
সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিন্তু, তাঁর শাণিত কলমে নকশালদের হঠকারিতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল তীক্ষ্ণ আক্রমণ। নকশালরা ডাক দিয়েছিলেন, ‘গৌরকিশোর ঘোষের মুন্ডু চাই’। পরিচিত শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেই তখন ‘রূপদর্শী’-কে বরানগরের মতো ‘উপদ্রুত’ এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নাছোড়। এমন পরামর্শে কর্ণপাত করেননি, তাঁর কলমও থামেনি। রাতবিরেতে কাজকর্ম সেরে একাই হেঁটে ঢুকতেন পাড়ার রাস্তায়। এই মানুষটিই আবার নকশালদের বিরুদ্ধে যখন পুলিশ নির্বিচারে অত্যাচার চালিয়েছিল, সেই দমননীতির প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন। ‘রূপদর্শী’ ছদ্মনামে বার বার লিখেছিলেন, পুলিশ যে ভাবে নকশাল-নিধন চালাচ্ছে তা অমানবিক।

রাজনৈতিক ইশতেহারের মধ্যে প্রকাশ পেত তাঁর ব্যঙ্গাত্মক, সরস লেখনি-প্রতিভা ও তারিফ যোগ্য মেধা। নিজেকে “মালেতাজিপন্থী” বলেছেন। কী এই ‘মালেতাজি’?
১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের দেশ পত্রিকায়, রূপদর্শী’র সংবাদ ভাষ্য-শিরোনামের চাঁচাছোলা ভাষায় লেখা প্রতিবাদ পত্রে গৌরকিশোর লেখেন, “কমরেডগন আশা করি আপনারা ব্যাপারটা তলিয়ে বোঝার চেষ্টা করবেন। আমরা ফরওয়ার্ড ব্লকবাদী মার্কসিস্টরা বা মালতাজিপন্থীরা (মার্ক্স+লেনিন+নেতাজি) যেন কখনোই সুভাষ বোস আর নেতাজিকে এক করে গুলিয়ে না ফেলি। মার্কসিস্ট ফরওয়ার্ডব্লকবাদীরা যেমন ফরোয়ার্ড ব্লকবাদী মার্কসিস্ট নয় তেমনি সুভাষ বোসও নেতাজি নন আপাতদৃষ্টিতে দেখলে প্রভেদটা সূক্ষ্ম বলে ভ্রম হতে পারে বটে কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই ধরা পড়বে তফাতটা একেবারে ফান্ডামেন্টাল।”
মেধা পাটকরের সঙ্গে
গৌরকিশোরের জন্ম ১৯২৩ সালের ২০ জুন, বাংলাদেশ-এর বর্তমান ঝিনাইদহ জেলায় হাট গোপালপুর গ্রামে। প্রাথমিক পড়াশোনা করেন শ্রীহট্ট জেলার এক চা-বাগানে। ১৯৪৫ সালে আইএস-সি পাশ করেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত গৌরকিশোর ক্রমাগত পেশা বদলে গেছেন। প্রাইভেট টিউটর, ইলেকট্রিক মিস্ত্রী, খালাসি, রেস্তরাঁর বয়, ট্রেড ইউনিয়ন অর্গানাইজার, স্কুল শিক্ষক থেকে ভ্রাম্যমাণ নৃত্য-সম্প্রদায়ের ম্যানেজার, ল্যান্ডকাস্টমস ক্লিয়ারিং কেরানি, প্রুফ রিডার ইত্যাদি অসংখ্য কাজ করেছেন সাংবাদিক জীবনে প্রবেশের আগে পর্যন্ত। লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পূর্বে, বিশেষত ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৫১সাল পর্যন্ত তিনি বার বার পেশা বদল করেন।
সাংবাদিকদের অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বহু নির্যাতন সহ্য করেও নিরন্তর সংগ্রামের ব্রতী ছিলেন। মুক্তচিন্তা ও গণতান্ত্রিক চেতনার জন্যে বুদ্ধিজীবী মহলে জনপ্রিয় হন। সাংবাদিক গৌরকিশোর ১৯৭৫ সালের ‘মিসা’ (MISA) অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ জন-নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন। প্রেসিডেন্সি জেলে তাঁকে বন্দী রাখা হয়। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাংবাদিকতার জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

সাংবাদিকতার জন্যে তিনি ১৯৭৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কো জয় উক’ স্মৃতি পুরস্কার এবং ১৯৮১ সালে ম্যাগসাসে পুরস্কারে সম্মানিত হন। একই বছর মহারাষ্ট্র সরকারের পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে হরদয়াল হারমোনি পুরস্কার, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ পুরস্কার পান। তিনি ১৯৭০ খ্রীষ্টাব্দে আনন্দ পুরস্কার ও ১৯৮২ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান। কলকাতা মেট্রো রেলের নতুন প্রস্তাবিত চিংড়িহাটা স্টেশনটি গৌরকিশোর ঘোষের স্মৃতিতে রাখা হয়েছে।
তিনি ছিলেন উদারপন্থী, ছুঁতমার্গহীন ভাবধারার মানুষ। ধর্ম, সম্প্রদায় প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কোনও দিনই তাঁর কোনও রকম গোঁড়ামি ছিল না। প্রচলিত রীতি-নিয়মকে তিনি নিজের জীবনেও অবজ্ঞা করেছেন। এর অন্যতম উদাহরণ তাঁর বিবাহ। বাড়ির অমতে বিয়ে করেছিলেন। রেজিস্ট্রি সেরে কলেজ স্ট্রিটে বন্ধু অরুণ সরকারের বাড়িতে ফুলশয্যা হয়েছিল। পরে এক দিন আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে অনুষ্ঠান। সেখানে প্রবেশমূল্য ধার্য ছিল পাঁচ টাকা! টিকিট না কেটে প্রবেশ নিষেধ। গৌরকিশোরের বাবাকে পর্যন্ত ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে টিকিট কাটতে হয়েছিল। তাঁর সম্পর্কে এই সব ঘটনা কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে।

বিয়ের দিন

দাম্পত্য
‘গৌরকিশোর ঘোষ জন্ম শতবর্ষ উদ্যাপন কমিটি’ এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ‘রূপদর্শী গৌরকিশোর’ নামে যে সঙ্কলনগ্রন্থটি নির্মাণ করেছে, সেটিও এক অত্যন্ত মূল্যবান উদ্যোগ। গ্রন্থটির ‘কথামুখ’-এ সম্পাদক সোহিনী ঘোষ গৌরকিশোরের জীবন-বৈচিত্রের এমন কিছু নিদর্শন তুলে ধরেছেন, যা মূল গ্রন্থে যাওয়ার আগে ওই মানুষটি ও তাঁর কাজকে চিনতে শেখায়। সোহিনী লিখছেন, “ইলেকট্রিক মিস্ত্রির ফিটার, রোড সরকার, রেস্তোরাঁর বয়, ভ্রাম্যমাণ নাচের দলের ম্যানেজার, রেসকিউ পার্টির ঠিকা শ্রমিক, আবার তার সঙ্গে সঙ্গেই গৃহশিক্ষক, প্রুফ রিডার— কিন্তু আশ্চর্য, কোনো কাজই বেশিদিন টিকতো না তাঁর। অজস্র ধরনের কাজ তাঁকে এনে ফেলেছিল অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে। তখন থেকেই শুরু হয়েছিল মানুষের প্রতি তাঁর টান। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে টান তাঁর কমেনি।” এই সোহিনী ঘোষই ২০০১-এর ২০ জানুয়ারি ‘লোকটা’ শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন গৌরকিশোরের একটি কথা, ‘‘I believe in love, for love and only love makes a man human”।
______________________________
তথ্যঋণ:
দেশ পত্রিকা, ১৯৭০, ফেব্রুয়ারি সংখ্যা
মনোজিৎকুমার দাস, মাগুরা বাংলাদেশ
আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিসূত্র: https://gourkishoreghosh.co.in/gallery-3/
