শঙ্খ ঘোষ (৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ – ২১ এপ্রিল ২০২১) ছিলেন বাংলা তথা ভারতের একজন শক্তিমান কবি, চিন্তক, অধ্যাপক ও সাহিত্য-সমালোচক। বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন শঙ্খবাবু। ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য পান দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য অকাদেমি। গদ্যগ্রন্থ ‘বটপাকুড়ের ফেনা’-র জন্য ২০১৬ সালে পান ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। পি অ্যান্ড এম রেকর্ডস আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে রেকর্ড করেছিল শঙ্খ ঘোষের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা। মহান কবিরা নিজের শরীর ত্যাগ করলেও আমাদের ছেড়ে যান না। লেখাই তাঁকে জীবিত করে রাখে। ধরুন শঙ্খ ঘোষ তাঁর কবিতা পড়ছেন আবার। আবার তাঁর গমগমে কণ্ঠ আমাদের ফিরিয়ে দেবে বহু স্মৃতি। শঙ্খ ঘোষের অসংখ্য কবিতা শোনানো হচ্ছে বঙ্গদর্শন.কম-এ। প্রতি সোমবার প্রকাশিত হচ্ছে দুটি করে কবিতা। আজ তৃতীয় পর্বে কবিকণ্ঠে শুনুন ‘ভাষা’ এবং ‘রেড রোড’।
ভাষা
এই তো, রাত্রি এল। বলো, এখন তোমার কথা বলো।
কিন্তু বলবে কোন্ ভাষায়? না, এই পুরোনো ক্ষয়ে-যাওয়া কথা তোমার ঠোটে ধোরো না—সেই তোমার ঠোঁটে, যাকে দেখেছিলুম মলিন মেঘের মতো ঝিমিয়ে থাকতে, কিংবা উথলে উঠতে ঝোড়ো রাতে পদ্মার মত্ত ভালোবাসায়, না—তোমার সেই ঠোঁটে তুলে নিয়ো না কত জন্মের এই ব্যবহৃত ভাষা, জীর্ণ, উচ্ছিষ্ট।
বলবে কোন্ ভাষায়? যে ভাষায় বাচাল প্রকৃতি চিৎকার করতে থাকে আমার চোখের সামনে, তার সব রং একত্রে এসে ঘুলিয়ে দেয় আমার আনন্দের স্বাদ, ‘সরে যাও’ ‘সরে যাও’ বলে দৌড়ে বেড়ায় আন্তরাত্মা, না, সেই দারুণ প্রকৃতির রহস্য তুমি তুলো না তোমার ঠোঁটে।
এই পৃথিবী না থাকলে থাকত শুধু অন্ধকার। কিছুই থাকত না এই সৌরলোক না থাকলে। কিন্তু কোথায় থাকত সেই না-থাকা, কোন্ পাত্রে? অন্তহীন এই নাস্তি যখন হা হা করে এগিয়ে আসে চোখের উপর, দুলে ওঠে রক্ত— তখন তুমি কথা বলো মহাশূন্যে অন্ধকারের ফুটে ওঠার মতন, সেই তোমার ভাষা হোক প্রথম আবির্ভাবের মতো শুচি, কুমারী —শষ্পের মতো গহন, গম্ভীর
এই তো, এই তো রাত্রি হলো। বলো, এখন তুমি কথা বলো।
রেড রোড
খোলা আকাশের নীচে শুয়ে আছি ময়দানের গভীর তলদেশে
যেন নক্ষত্র তুলে নেয় আমার নিভৃত নিশ্বাস
এই অন্ধকার মণ্ডলের গহন থেকে আমার শব্দহীন স্তব
যেন পুঞ্জে পুঞ্জে উঠে যায় স্বর্গীয় ঈথারে
আমাকে ভুল বুঝো না বলে দু-হাত ছড়িয়ে দিতে টের পাই
চোখের ঢালু বেয়ে নম্র ঘাসের মতো ক্ষীণ জলরেখা
অল্পে অল্পে প্রাণ পেয়ে কেঁপে ওঠে হাওয়ায়
জানি না বুকের কত নীচে নেমে যায় এর সর্বপায়ী শেকড়
কপালে হালকা পালক ছুঁয়ে বলে যায় রাত্রি :
এই মাটি তোমার শরীর, একে স্পর্শ করো, জানো–
আর অমনি দশ দিগন্ত ভেসে যায় উপচে পড়ে দু-চোখ
স্ফুরিত আনন্দে না কি দিশাহীন জলে
তারই পাশে রুল হাতে এগিয়ে আসে পুলিশ, বলে : ওঠো
অবৈধ তোমার এই একলা অসামাজিক শুয়ে থাকা–
আবার আমি নিচু হয়ে পায়ে পায়ে চলতে থাকি শহরের দিকে
সামনেই ঝকঝকে রেড রোড।
_________________
প্রতি সোমবার ৩টেয়, বঙ্গদর্শনের পডকাস্টে ‘স্বকণ্ঠে শঙ্খ ঘোষ’ শোনার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল। ক্লিক করুন এখানে।
