উনিশ শতকের হাফবাবু আর ফুলবাবুদের শখের যৌনতা

“আজব সহর কল্‌কেতা।
রাঁড়ি বাড়ি জুড়ি গাড়ি মিছে কথার কি কেতা।
হেতা ঘুটে পোড়ে গোবর হাঁসে বলিহারি ঐক্যতা;
যত বক বিড়ালে ব্রহ্মজ্ঞানী, বদ্‌মাইসির ফাঁদ পাতা।
পুঁটে তেলির আশা ছড়ি, শুড়ি সোণার বেণের কড়ি,
খ্যামটা খান্‌কির খাসা বাড়ি, ভদ্রভাগ্যে গোল্‌পাতা।”

‘কলিকাতার বারোইয়ারি পূজা’ শীর্ষক নকশায় কতকটা এমনই এক গানের আভাস দিচ্ছেন হুতোম ওরফে কালীপ্রসন্ন সিংহ। কলের শহর কলকাতা। কলির শহর কলকাতা। সেকালের মূল্যে ১৩০০ টাকার বিনিময়ে তিনটি গ্রামের ইজারা থেকে আজকের মেট্রোপলিটন, বহু ভাঙা গড়ার ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে কলিকাতা – ক্যালকাটা – কলকাতা।

অষ্টাদশ শতক। শাসকের সেবা আর তাবেদারি করা এই শ্রেণি, আচমকা বড়োলোক হয়ে ওঠে রাতারাতি। এদের কেউ কেউ কোম্পানির মুন্সি, বেনিয়া ছিল। কেউ আবার চিরস্থায়ীর বশে হাঁকিয়ে বসে বিরাট জমিদারী। হঠাৎ লক্ষ্মী লাভ, খেতাব-খ্যাতি, চোখ ধাঁধিয়ে যায় বাবুদের। চুলে টেরি, গিলে করা ধুতি-পাঞ্জাবি আর গায়ে মখমলের চাদর জড়িয়ে দিনের পর দিন তারা কাটিয়ে দিত আমোদ প্রমোদে। কী নেই তাতে? শখের বেড়ালের বিয়ে থেকে বুলবুলির লড়াই, খিস্তি খেউড়, সুরাপান, খেমটা নাচ, বাঈজি নাচ। যৌনতার ক্ষেত্রেও ছিল হরেক প্রকরণ।

বাবু চরিত্রের আটটি বিশেষ লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন প্রিয়নাথ পালিত। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘টাইটেল দর্পণ’-এ বলা হয়:

“সুধু বাবু হয় নাই
আটটি লক্ষণ চাই
তবে নাম জানিবে সকলে।

বেশ্যাবাড়ী ছড়ি ঘড়ি
বিকেলে ফিটন গাড়ি
দিবানিশি ভাস লাল জলে। 

গান বাদ্য কর সার 

মাছ ধর রবিবার
চুল কাট অ্যালবার্ট ফ্যাসনে।

বড়লোক বলি তবে
ঘুষিবে সুখ্যাতি সবে
সার কথা দীনবন্ধু ভণে।”

এই ‘বাবু’ সকলে হতে পারতেন না। এর জন্য কিছু বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, “যাঁহার বাক্যে মনোমধ্যে এক, কথনে দশ, লিখনে শত, এবং কলহে সহস্র, তিনিই বাবু। যিনি নিজগৃহে শুধু জল খান, বন্ধুগৃহে মদ খান, বেশ্যাগৃহে গালি খান, এবং মুনিব সাহেবের গৃহে গলাধাক্কা খান, তিনিই বাবু। যাঁহার যত্ন কেবল পরিচ্ছদে, তৎপরতা কেবল উমেদারিতে, ভক্তি কেবল গৃহিণী বা উপগৃহিণীতে, এবং রাগ কেবল সদ্‌ গ্রন্থের উপর, নিঃসন্দেহে তিনিই বাবু।”

নিজেদের পছন্দের পতিতার ওপর অক্লেশেই টাকা ব্যয় করত বাবুরা। হীরা, জহরত, কোঠা-মাকান থেকে কানের দুল, খোঁপার ফুল সবটাই। এমনকি নামের উল্কি পর্যন্তও খোদাই করত হাতে।

যোগ্যতা অনুসারে বাবুদের দুটো ভাগ ছিল। যথা – হাফ বাবু ও ফুল বাবু। যাদের চারটে ‘প’ হতো (পাশা, পায়রা, পরদার, পোশাক) তারা ছিল হাফ। অন্যদিকে চারটে ‘প’ আর চারটে ‘খ’ (খুশি, খানকি, খানা, খয়রাত) হলে মিলত ‘ফুল’-এর খেতাব। এছাড়াও ছিল ফোতো বাবু, হঠাৎ বাবু, ফুল বাবু, প্রগ্রেসিভ বাবু, কাপ্তেন বাবু ইত্যাদি। ভোগবিলাসের ইঙ্গিতটা লক্ষ্য করার মতো। বেশ্যা, খানকি, উপগৃহিনী – সবেতেই যৌনতার ছাপ যেন প্রকট।

বাবু সংস্কৃতিতে বেশ্যাগমন ছিল অতি স্বাভাবিক একটা বিষয়। ‘সেকাল ও একাল’ গ্রন্থে রাজনারায়ণ বসু লিখছেন, “সেকালে লোকে প্রকাশ্যে বেশ্যা রাখিত। বেশ্যা রাখা বাবুগিরির অঙ্গ বলিয়া পরিগণিত হইত।” কলকাতার রাস্তাঘাট তখন গমগম করত রাত হলেই। বিশেষত সোনাগাছি, রামবাগান, তালতলা, কলুটলা, নাথের বাগান, জোড়াবাগান ও জোড়াসাঁকো। হুতোম লিখছেন, “কলকেতা শহর এই মহাপুরুষদের জন্য বেশ্যা শহর হয়ে পড়েছে, এমন পাড়া নেই যেখানে অন্তত দশঘর বেশ্যা নাই; হেতায় প্রতি বৎসর বেশ্যার সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে বই কমছে না। এমনকি একজন বড়মানুষের বাড়ির পাশে একটি গৃহস্থের সুন্দরী বউ কি মেয়ে নিয়ে বাস করার যো নাই, তাহলে দশ দিনেই সেই সুন্দরী টাকা ও সুখের লোভে কুলে জলাঞ্জলি দেবে- যতদিন সুন্দরী বাবুর মনস্কামনা পূর্ণ না করবে ততদিন দেখতে পাবেন বাবু অষ্টপ্রহর বাড়ির ছাদের উপর কি বারান্দাতেই আছেন, কখনও হাসছেন, কখনও টাকার তোড়া নিয়ে ইশারা করে দ্যাখাচ্ছেন, এ ভিন্ন মোসাহেবদেরও নিস্তার নাই, তারা যতদিন তাকে বাবুর কাছে না আনতে পারবেন ততদিন মহাদায়গ্রস্ত হয়ে থাকতে হবে।” বাবুদের ডেডিকেশন ও ডেসপারেশন দুটোই দেখার মতো।

বিকারগ্রস্থ যৌনতায় বহু বাবুই গা ভাসাত। মৈথুনকালে অত্যাচার, নিপীড়ন অনেকে পছন্দ করলেও, মাত্রাতিরিক্ত কোনোকিছুই বিপদ। বলপূর্বক সঙ্গম বা ধর্ষণের পাশাপাশি, নেশায় আসক্ত বাবুরা আঁচড়ে, কামড়ে, প্রহার করে ক্ষতবিক্ষত করত সেই পতিতা নারীর দেহ।

নিজেদের পছন্দের পতিতার ওপর অক্লেশেই টাকা ব্যয় করত বাবুরা। হীরা, জহরত, কোঠা-মাকান থেকে কানের দুল, খোঁপার ফুল সবটাই। এমনকি নামের উল্কি পর্যন্তও খোদাই করত হাতে। তবে সেই বারাঙ্গনা যদি অন্য পুরুষের সঙ্গে সহবাস করত, তার ফল হত ভয়ানক। ঈর্ষাপরায়ণতার বশে পতিতা-খুন তখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

বিকারগ্রস্থ যৌনতায় বহু বাবুই গা ভাসাত। মৈথুনকালে অত্যাচার, নিপীড়ন অনেকে পছন্দ করলেও, মাত্রাতিরিক্ত কোনোকিছুই বিপদ। বলপূর্বক সঙ্গম বা ধর্ষণের পাশাপাশি, নেশায় আসক্ত বাবুরা আঁচড়ে, কামড়ে, প্রহার করে ক্ষতবিক্ষত করত সেই পতিতা নারীর দেহ। চিকিৎসক গিরীন্দ্রশেখর বসুর মতে, “এই উভয় প্রকৃতি সাধারণ কঠোরতা হইতে অমানুষিক নিষ্ঠুরতা পর্যন্ত গড়াইতে পারে। কেহ নারীকে বেত্রাঘাত করিয়া আনন্দ পায়…। পক্ষান্তরে কেহ প্রণয়ী বা প্রণয়ণীকে নিজের শরীরে নানাবিধ অত্যাচার করিতে প্ররোচিত করে। রমণকালে প্রেমাস্পদকে চাপন, দংশন ও তাহার পর বেত্রাঘাত, প্রহার এমন কি হত্যা করিয়াও অনেকে যৌনতৃপ্তি লাভ করে।” অনালোচিত হলেও, স্যাডিজাম, প্যারাফিলিয়া তখন সমাজের রন্ধ্রে।

শুধু পতিতা নয়, একাধিক রক্ষিতাও রাখতেন এই কলির বাহকরা। সে এক অন্ধকার যুগ। পারিপার্শ্বিক অনাচার, অবিচার মিলিয়ে সমাজের অভিমুখ তখন নিম্নগামী। আজকের ম্যরালিটি দিয়ে তার বিচার সম্ভব নয়। বর্তমানের নিরিখে কিছুটা অস্বস্তি বোধ হলেও, সেকালে এটাই যেন দস্তুর। পুরুষ মানুষ এটুকু করবে না? একটি নারীতেই জীবন খালাস, এটা যেন বাবুদের বিবিরাও মেনে নিতে পারত না। কার ক-জন রক্ষিতা কিংবা কারা রাতে দেরি করে ফেরে, এই নিয়ে রীতিমতো একটা চাপা দ্বন্দ্বও দেখা যেত। বাবু সংস্কৃতির এই বিচিত্র দিকটির কথা তুলে ধরেছেন মদন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ‘এন্টনী ফিরিঙ্গি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ব্যাটা ছেলে যদি রাঁড়ই না করে দু-চারটে তাহলে কি আর ব্যাটা ছেলে বলে! কলকাতায়, ফরেসডাঙ্গায় যেখানেই যাবি সেখানেই দেখবি-বাবু বল, জমিদার বল, ভদ্দর নোক বল- রাঁড় না করলে লোক বলেই গন্নি হয় না।”

ঘরের দাসীদেরও অবাধে ভোগ করত বাবুরা। যখন তখন ডেকে পাঠিয়ে, যা খুশি করে বেড়াত। এমনকী নিজেদের পরিবারের মেয়েদেরও রক্ষা ছিল না। হুতোম লিখেছেন, “শহরের বড় মানুষরা অনেকে এমনি লম্পট যে, স্ত্রী ও রক্ষিতা মেয়েমানুষ ভোগেও সন্তুষ্ট নন, তাতেও সেই নরাধম রাক্ষসদের কামক্ষুধার নিবৃত্তি হয় না, শেষে ভগ্নি-ভাগ্নি- বউ ও বাড়ির যুবতী মাত্রেই তাঁর ভোগে লাগে- এতে কত সতী আত্মহত্যা করে বিষ খেয়ে এই মহাপাপীদের এড়িয়েচে।” সেযুগে শ্বশুর-পুত্রবধু, শাশুড়ি-জামাই, দেওর-ভাতৃবধু এমনকি ভাই-বোনের কেচ্ছাও দেখা যেত।

এমন বহু কেচ্ছাকাহিনির সংবাদ ছেপে বেড়াত সাময়িকপত্র-পত্রিকার পাতায়। ১৮৩৯-এ প্রতিষ্ঠিত ‘সম্বাদ রসরাজ’ এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখ্য। প্রতি শনি ও মঙ্গলে প্রকাশিত এই কাগজের গ্রাহক সংখ্যা ছিল বিপুল। এছাড়া কালীঘাট পট, বটতলা তো আছেই। সস্তার কাগজ কালিতে ছাপা এই পুস্তিকাগুলি ছিল সমাজের একেকটা দলিল। গবেষক মানস ভাণ্ডারী তাঁর ‘সেকালের কলিকাতার যৌনাচার’ গ্রন্থে একটি তালিকা পেশ করেছেন। ‘আমি তোমারই’, ‘গুণের শ্বশুর’, ‘মক্কেল মামা’, ‘মামাভাগ্নির নাটক’, ‘বেশ্যানুরক্তি বিষম বিপত্তি’ ছিল সে যুগের হিট বই।

শুধু পতিতা নয়, একাধিক রক্ষিতাও রাখতেন এই কলির বাহকরা। সে এক অন্ধকার যুগ। পারিপার্শ্বিক অনাচার, অবিচার মিলিয়ে সমাজের অভিমুখ তখন নিম্নগামী। আজকের ম্যরালিটি দিয়ে তার বিচার সম্ভব নয়।

সেকালে অনেক বাবুই উভকামী হত। সমকাম প্রেম বা পায়ুকামে তাদের আপত্তি ছিল না। সুদর্শন সুপুরষ থেকে স্বাস্থ্যবান কিশোর, সবাইকেই সাদরে গ্রহণ করত তারা। উনিশ শতকের ‘পুরুষ বেশ্যা’ ও ‘বালক বেশ্যা’-র কথা উল্লেখ করেছেন মানস ভাণ্ডারী। এছাড়া শ্রীপঞ্চানন ঘোষালের ভাষায়, “সাধারণত এরা ১২ হতে ১৮ বৎসরের গৃহহীন বালক মাত্র। বাবরিকাটা চুলওয়ালা, লম্বা চুড়িদার পাঞ্জাবি পরা এইসব বালক ঠোঁটে রং মেখে, কালি দিয়ে ভ্রু এঁকে কলিকাতার ময়দান এবং অপরাপর নির্জন স্থানে ঘুরা ফিরা করে।”

অনেকটা এমনই ছিল উনিশ শতকের শহর। দিনভর নেশায় আসক্ত বাবুরা দেশ, কাল, পাত্রের কোনো হিসেবই রাখত না। সারাদিন শুধু ঢালাও মদ আর অবাধ যৌনতা। বহু সংসার এভাবেই ভেসে যায়। শখের বেশ্যার কাছেও জুটত মুড়োঝাঁটার বাড়ি। এছাড়া রোগ ভোগ তো ছিলই। সিফিলিস, এইডস, পিলেজ্বরে আক্রান্ত নরদেহের শেষমেশ ঠাঁই হত এলাকার কোনো এক আস্তাকুঁড়ে।

সেই শতক আজ আর নেই। কালের গ্রাসে হারিয়ে গেছে বাবুরা। সেসব নাচঘর, জলসা, আতরের খুশবু, কিংবা গররা সবই হারিয়েছে। তবে সত্যিই কি হারিয়ে গেছে সব? উনিশ শতকের যৌনতা বিবর্তিত হয়েছে। একটু লক্ষ্য করলে এখনও চোখে পড়বে বাবুসুলভ প্রবৃত্তি। তথাকথিত ‘ভদ্রতা’-র মুখোশে বুক ফুলিয়ে যা আজও টিকে রয়েছে একবিংশ শতকে – সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্র, প্রতিটি স্তরে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:
১। সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা – সম্পাদনা অরুণ নাগ
২। সাহেবী কলকাতা ও তৎকালীন ছড়া – কৌশিক চক্রবর্তী
৩। সেকালের কলিকাতার যৌনাচার- মানস ভাণ্ডারী
৪। বাবু বিবি সম্বাদ – অর্ণব সাহা
৫। ঠিকানা বটতলা – অর্ণব সাহা
৬। কলকাতা – অতুল সুর

Written by