পাল্টেছে অনেক কিছুই, পাল্টায়নি মহালয়া নিয়ে বাঙালির আবেগ

সময়টা তিনের দশকের গোড়ার দিক। কলকাতা বেতারের সূতিকাগার ১ নম্বর গারস্টিন প্লেসের ভাড়া করা বাড়িটায় তখন চলছে নিদারুণ কর্মযজ্ঞ। বেতারের সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিরা সর্বদাই চেষ্টা করতেন কীভাবে সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই মাধ্যমকে মানুষের কাছে আরও বেশি করে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। সেই চিন্তাধারার ফলশ্রুতিতে একদিন প্রস্তাব উঠলো ভোরবেলা বেতারের নিয়মিত অধিবেশন শুরুর আরও আগে এমন একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার, যা শ্রোতাদের বাধ্য করবে ঘুম থেকে উঠে রেডিওর সামনে বসতে। ঘটনাক্রমে প্রবল বর্ষার এক দিনে বেতারকেন্দ্রের মধ্যে এই অনুষ্ঠানের ভাবনাচিন্তা চলছে তখন দুর্গোৎসবের আর বেশি দেরি নেই। ঠিক হয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকে সামনে রেখেই এই নতুন সংগীতালেখ্যটির পরিকল্পনা করা হবে। এই সংগীতালেখ্যটি রচনার ভার বেতারের ভারতীয় প্রোগ্রামের ডাইরেক্টর, নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার তৎক্ষণাৎ অর্পণ করলেন কয়েকমাস আগেই বাসন্তী পুজোর সময়ে বসন্তেশ্বরী নামক চম্পূটির রচয়িতা বাণীকুমারকে। রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজ কুমার মল্লিক ও হরিশচন্দ্র বালীকে দেওয়া হল সুর সংযোজনার দায়িত্ব। আর গ্রন্থিক হিসেবে বেছে নেওয়া হল বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে।

প্রথম বছর ষষ্ঠীর ভোর, পরের বছর মহালয়া – এরকম ভাবে দুটি ভিন্ন ভিন্ন দিনে, ভিন্ন ভিন্ন নামে অনুষ্ঠান চলার পর অবশেষে ১৯৩৭ সালে এসে মহালয়ার দিনটিকেই পাকাপাকি ভাবে সম্প্রচারের দিন হিসেবে ধার্য করা হয়।

১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের দুর্গাষষ্ঠীর ভোর নির্ধারিত হল ‘শারদীয়া বন্দনা’ শীর্ষক সংগীতালেখ্য সম্প্রচারের জন্য। সেই শুরু, আর কখনোই পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রথম দিকে অনুষ্ঠানটির দৈর্ঘ্য, নাম, সম্প্রচারের জন্য নির্ধারিত দিন – সব কিছুই ছিল আজকের থেকে অন্যরকম। প্রথম বছর ষষ্ঠীর ভোর, পরের বছর মহালয়া – এরকম ভাবে দুটি ভিন্ন ভিন্ন দিনে, ভিন্ন ভিন্ন নামে অনুষ্ঠান চলার পর অবশেষে ১৯৩৭ সালে এসে মহালয়ার দিনটিকেই পাকাপাকি ভাবে সম্প্রচারের দিন হিসেবে ধার্য করা হয়। অনুষ্ঠানটির নামও ওই বছরই প্রথম ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ রাখা হয়। সেই ১৯৩২ সাল থেকে শুরু করে আজকে যেই বহুল প্রচলিত সংকলন সারা বছরই বিভিন্ন সময়ে বাজতে থাকে, তার মাঝে প্রায় প্রতি বছরই পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে এই অনুষ্ঠানটিকে। পাণ্ডুলিপি, গানের সুরের সঙ্গে বদল ঘটতো শিল্পী তালিকায়ও। তবে প্রতি বছর নানান পরিবর্তন শ্রোতারা মেনে নিলেও, এই তিন মহারথীকে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করে ফেলেছিলেন শ্রোতারা। তাইতো কোনও বছর তাঁদের মধ্যে একজনের অনুপস্থিতিও তাঁরা কখনোই মেনে নেননি। চারের দশকে কয়েকবার পঙ্কজ কুমার মল্লিক বেতারের কিছু অভ্যন্তরীণ কারণে এই অনুষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থাকেননি। সেই সময় একবার বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার ও শচীন দাশ মতিলালের যৌথ সংগীত পরিচালনায় মহিষাসুরমর্দ্দিনীর পরিবর্তে ‘নবারুণ রাগে’ নামে মহালয়ার ভোরে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়। আরও একবার সেই কুখ্যাত কলকাতা দাঙ্গার বছরে অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত সর্জনে ‘জাগো আলোক লগ্নে’ শীর্ষক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। সেই বছর অবশ্য শিল্পীদের নিরাপত্তাজনিত কারণে অনুষ্ঠানটির সরাসরি সম্প্রচার করা সম্ভব হয়নি। আগের দিন বিকেলে স্টুডিও রেকর্ডে ধারণ করে রাখা অনুষ্ঠানই সম্প্রচার করা হয় মহালয়ার ভোরে। অনুন্নত মানের রেকর্ডিংয়ের কারনে সেই রেকর্ড ওই বছরই নষ্ট হয়ে যায়। তবে মহালয়ার ভোরে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের অনুপস্থিতি শ্রোতাদের পছন্দ হয়নি।

১৯৪৭ থেকে যদিও আবার পঙ্কজবাবু এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হন। মহিষাসুরমর্দ্দিনী নামটিকেও আবার ফিরিয়ে আনা হয়। নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারের কথা অনুযায়ী বলতে গেলে সত্যিই হয়তো দেবী দুর্গার আশীর্বাদ এই অনুষ্ঠানের উপর ছিল। তাই শত বাধাও এই অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। যেমন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্বয়ং দিল্লিতে বারংবার আবেদন নিবেদন করেন অনুষ্ঠানটি বন্ধ করাতে পারেননি তেমনই অনুষ্ঠানটির আজকের এই জনপ্রিয় রূপের অনেকটাই শুরু কতকটা আকস্মিকভাবে। যেমন আদিযুগে এই অনুষ্ঠানে গদ্যাংশ পাঠ হত স্বাভাবিক স্বরে, থাকতো না কোন সুর। সেরকমই এক সময়ে অনুষ্ঠানটির মহড়ার দিনের মাঝে বিরতিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁর পাণ্ডুলিপির অংশটুকু নিজের মত করে সুরারোপ করে গুনগুন করছিলেন আপনমনেই , “….. দেবী প্রসন্না হলেন”। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই উদ্ভাবন লক্ষ্য করলেন বাণীকুমার। তিনি কাছে গিয়ে উৎসাহ দিয়ে এইভাবেই চালিয়ে যেতে বললেন। শুরুতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হলেও বাণীকুমারের কথায় সুর করে ফের কিছুটা গদ্য উচ্চারণ করলেন। অনুষ্ঠানের রিহার্সালে সৃষ্টি হল ইতিহাস। বাণীকুমার স্থির করলেন এবার থেকে বাংলা গদ্যাংশতেও থাকবে সুর। ঘটনাচক্র দেখে মনে হতে বাধ্য যেন মহাদেবীর অদৃশ্য নির্দেশনাতেই এই সংগীতালেখ্য সজ্জিত হচ্ছে নব কলেবরে। আর এই কলেবর নিয়ে নিরীক্ষারই ফসল আজকের এই বহুল প্রচলিত সংকলন। কালক্রমে ‘এসো তুমি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী’ পরিণত হয়েছে আমাদের সুপরিচিত ‘জাগো দুর্গা’য়, শৈল দেবীর কণ্ঠের ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ গীত হয়েছে সুপ্রীতি ঘোষের কণ্ঠে।

যেমন আদিযুগে এই অনুষ্ঠানে গদ্যাংশ পাঠ হত স্বাভাবিক স্বরে, থাকতো না কোন সুর। সেরকমই এক সময়ে অনুষ্ঠানটির মহড়ার দিনের মাঝে বিরতিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁর পাণ্ডুলিপির অংশটুকু নিজের মত করে সুরারোপ করে গুনগুন করছিলেন আপনমনেই , “….. দেবী প্রসন্না হলেন”।

এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণেই সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা নানান বছরে অংশগ্রহণ করেছেন এই অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন বছরে এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন সুমিত্রা সেন, অপরেশ লাহিড়ী, জগন্ময় মিত্র, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল ভট্টাচার্য, বনশ্রী সেনগুপ্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীরা। তবে যিনিই অংশগ্রহণ করুন না কেন, অনুষ্ঠানের একমাস আগে থেকে মহড়ায় অংশগ্রহণ করতে হত প্রত্যেককেই। ঠিক সেজন্যই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজের শিল্পী জীবনের ব্যস্ততার কারণে এত দীর্ঘ মহড়ায় অংশগ্রহণ করতে অপারগ হলে, পঙ্কজ কুমার মল্লিক তাঁর জায়গায় তরুণ শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে ‘জাগো দুর্গা’র মত জনপ্রিয় একক গানের দায়িত্ব অর্পণ করতে দ্বিধা করেননি। অনুষ্ঠানটি যত বছর ধরে সরাসরি সম্প্রচার হয়ে এসেছিল তার সিংহভাগই হয়েছিল ১ নম্বর গারস্টিন প্লেসে। ১৯৫৮ সালে ১ নম্বর গারস্টিন প্লেস থেকে বর্তমান ইডেন গার্ডেন্সের নিকটে আকাশবাণী ভবন স্থানান্তরিত হবার পরেও ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এই বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। ওই বছরই চীন কর্তৃক ভারত আক্রমণের পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আর এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হবে না। ছয়ের দশকের শুরু থেকেই লাইভ সম্প্রচার চলাকালীন মহিষাসুরমর্দ্দিনী টেপ-রেকর্ড করে নেওয়া হত। ১৯৬৩ সালে মহালয়ার ভোররাতে শ্রোতারা শুনতে পেলেন গত কয়েক বছর ধরে রেকর্ড করে রাখা ‘লাইভ’ মহিষাসুরমর্দ্দিনীরই একটি সম্পাদিত সংকলন।

১৯৬৬ সালে নতুন করে রেকর্ড করা হয় এই অনুষ্ঠানটি। বেশ কয়েকদিন ধরে কয়েক দিন ধরে রেকর্ডিংয়ের পর সম্পাদিত অনুষ্ঠানটি প্রচার করা হয় ১৯৬৬ সালের ১৩ অক্টোবর, মহালয়ার ভোর রাতে। ১৯৬৬ থেকে মহিষাসুরমর্দ্দিনীর সর্বশেষ সংকলন তৈরির আগে অবধি অন্ততপক্ষে চারবার এই অনুষ্ঠানটি নতুন করে রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭২ ও সর্বশেষ ১৯৭৪ সালে শ্রোতারা শুনতে পেয়েছিলেন ‘নতুন’ মহিষাসুরমর্দ্দিনী। বাণীকুমারের মৃত্যুর পরে আকাশবাণীর সংগ্রহে মহিষাসুরমর্দ্দিনীর যতগুলি পুরনো টেপ সংরক্ষিত ছিল তা থেকে অংশবিশেষ নিয়ে তৈরি করা হয় মহিষাসুরমর্দ্দিনীর একটি সংকলন। এটিই পরবর্তীতে গ্রামোফোন কোম্পানির হাত ধরে পৌঁছে যায় বাঙালির ঘরে ঘরে। আজও এই বহুল প্রচলিত সংকলনটিই সব জায়গায় শুনতে পাওয়া যায়।

রেকর্ডিংয়ের যুগে সম্পাদনার মত দুরূহ কাজটি প্রতিবারই নিখুঁত ভাবে পালন করতেন আকাশবাণীর সংগীত বিভাগের সুধীর মুখোপাধ্যায়। তৈরি হত চিরচেনা অনুষ্ঠানের নিত্যনতুন সংকলন। কোন বছর হয়তো মহালয়ার ভোর রাতে চিরচেনা ‘শুভ্র শঙ্খ রবে’র বদলে উদ্গীত হয়েছে বিকল্প গান ‘পুনিহী তামস-হারিণী’। আবার শোনা গেছে ‘জয় জয় পরমা শঙ্করী গো নমি নমি’ বা দরশন দাও মাগো’র মত অনেক গান।

‘নিখিল আজি সকল ভোলে’র পরিবর্তে কয়েকবছর ‘আকাশ যে মধুময় ছন্দে’ নামক একটি গানও কয়েকবছর গাওয়া হয়েছিল। বহুল প্রচলিত সংকলনে অবশ্য এই দুটি গানকেই বাদ দেওয়া হয়। বাণীকুমার,পঙ্কজ কুমার মল্লিক ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র সহ অনুষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তির নিষ্ঠার পরিমাপ করা আজকের যুগে হয়তো আর সম্ভব নয়। তাই তো সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্টুডিওয় আসতে দেরি হওয়ায় নাজির আহমেদের এই অনুষ্ঠানে চন্ডীপাঠ করার মত ভিত্তিহীন গুজব। অথচ সরাসরি সম্প্রচারের প্রায় দীর্ঘ ৩০ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনার লেশমাত্র কোনওদিন ঘটেনি। প্রতি বছরই মহালয়ার ভোর হবার বহু আগে, রাত দেড়টা নাগাদই বেতার কেন্দ্র থেকে একের পর এক গাড়ি সারা কলকাতা শহর ঘুরে অনুষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের নিয়ে সোয়া তিনটের মধ্যেই ফিরে আসতো রেডিও অফিসে। ব্যতিক্রম ঘটেছিল একবারই। সেবার রাতে রেডিও অফিসের গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার পরই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। তিনটি গাড়ি শিল্পীদের নিয়ে ফিরে এলেও আসছিল না একটি গাড়ি। তৎক্ষণাৎ পরপর আরও দুটি গাড়ি রেডিও অফিস থেকে ওই অভিমুখে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। অনুষ্ঠান সম্প্রচারের দু-এক মিনিট আগে শিল্পীদের নিয়ে হাজির হয় গাড়ি। জানা যায় গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়ায়, গাড়িতে থাকা সমস্ত পুরুষ ও মহিলা শিল্পী বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই রেডিও অফিসের দিকে দৌড়ে আসছিলেন। এমনই ছিল সকলের নিষ্ঠা। তাইতো এতগুলো বছর পর আজও একটি বেতার অনুষ্ঠান বছরের একটি দিনে গৃহস্থ বাড়ির অচল বেতার যন্ত্রগুলিকেও করে তোলে জীবন্ত। ইথার তরঙ্গে ধ্বনিত হয় আলোর বেণু।

Written by
Developed by DXDasia