পান : বাঙালির জীবনে একটি সবুজ পাতার ইতিহাস

ভালোবাসার এমনি গুণ, পানের সঙ্গে যেমনি চুন;/ বেশি হলে পোড়ে গাল, কম হলে লাগে ঝাল।

গ্রাম বাংলার অতলে, খিন্ন বট শালিখ কৃষ্ণচূড়ার অন্দরে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে এই লাইনগুলো। উদাসী দুপুরে ভাত ঘুমের সঙ্গে, অচ্যুত মনমালিন্যের মধ্যিখানে, প্রেমের উড়োচিঠি হয়ে অথবা শাস্ত্র, পুজোপাঠের আসরে পান পাতা হয়ে হয়েছে এক অপুর দেশ। পান শব্দটির সঙ্গে বাঙালির জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাঙালিদের সমস্ত রকমের আচার-অনুষ্ঠান, পুজো-পার্বণ থেকে শুরু করে শান্তি স্বস্ত্যয়ন সবকিছুতেই পান অপরিহার্য, পান ছাড়া সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ। আগেকার দিনে বাড়িতে অতিথি এলে খাওয়াদাওয়ার পরে তাঁকে পান সাজিয়ে দেওয়ার একটা রীতি ছিল। পানের গতিবিধি যেমন জাতকের গল্পে দেখতে পাওয়া যায় ঠিক তেমনি বাৎসায়নের কামসূত্র থেকে চরক-সুশ্রুত-কাশ্যপের আয়ুর্বেদশাস্ত্রতেও পানের ব্যবহারিক উল্লেখ আছে।

কনের মুখ পানপাতায় ঢাকা, শুভদৃষ্টির আগে সেই পাতা সরানো এইসব রীতি পানকে নিছক খাদ্যসামগ্রী থেকে বিবাহের সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করে। অর্থাৎ পানের বিবাহে প্রবেশ কেবল ধর্মীয় বিধানের ফল নয়; সামাজিক আতিথেয়তা ও স্থানীয় লোকাচারের দীর্ঘ বিবর্তনের ফলও বটে।

লোকশ্রুতি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ পান খেতেন। আবার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় যে সম্রাজ্ঞী নুরজাহান পান খেতে খুব ভালবাসতেন, তিনি মুঘলদের অন্দরমহলে অন্যান্য নারীদের কাছে পান খাওয়াকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। পরিব্রাজক ইবন বতুতার লেখাতেও সেই সময় যে পানের ব্যবহার ছিল তার কথা জানতে পারা যায়। সৈয়দ মুর্তাজা আলী তাঁর প্রবন্ধ-বিচিত্রা গ্রন্থে লিখেছেন ‘মুঘল আমলে পান খাওয়ার খুব রেওয়াজ ছিল। পূর্ববঙ্গে সাচি ও অন্যান্য প্রকার পান ও সুপারি পর্যাপ্ত পাওয়া যেত। কিন্তু পানের মশলা আসত বিদেশ থেকে। বিহার থেকে আসত বিখ্যাত জনকপুরী। সাচি পানের এত চাহিদা ছিল যে, ঢাকায় সাচি পানের জন্য আলাদা বাজার বসেছিল। এই বাজারের নাম ছিল সাচিপান দরিয়া।’ অন্যদিকে জেমস টেলর-এর ‘কোম্পানী আমলে ঢাকা’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় তখন ঢাকায় ‘তাম্বলী সম্প্রদায়’ নামে এক পেশাজীবী শ্রেণির কথা; যাঁরা পান-সুপারি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আনুমানিক আড়াই-তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে সমগ্র বাংলা তথা ভারতবর্ষে পান খাওয়া এক প্রাত্যহিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল; যা আজও চলমান। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্যের ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ এবং অন্যান্য গ্রন্থ থেকে জানা যায় বৈদিকযুগ থেকে বঙ্গদেশে পান ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জাতকের গল্পে এবং একাধিক পালি গ্রন্থেও তাম্বুল বা পান ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। পণ্ডিত নারায়ণ শর্মা ‘হিতোপদেশ’-এও পানের উল্লেখ আছে। প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে রচিত আয়ুর্বেদ গ্রন্থকার সুশ্রুত রচিত ‘সুশ্রুত-সংহিতা’য় ভুক্তবস্তু পরিপাকের আলোচনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, গুরুভোজকারীরা যেন আহারান্তে কোন কোষ্ঠরোধক বা কটূস্বাদফল কিংবা সুপারি, কর্পূর, জায়ফল, লবঙ্গ প্রভৃতি সহযোগে তাম্বুল চর্বণ করেন। পানের উপকরণের এই তালিকা থেকে বোঝা যায় সুশ্রুতের কালেই পান খাওয়া বিলাসিতায় রূপান্তরিত হয়েছিল।

আশীর্বাদের উপকরণে পান

পানকে ভারতীয়রা শুভ বলেই গণ্য করে থাকে। দক্ষিণ ভারতে কোনও শুভ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের পানপাতা, সুপারি এবং নারকেল দেওয়া একটি ঐতিহ্যের মধ্যে পড়ে। এ-ছাড়াও বাড়িতে বেড়াতে আসা অতিথিদেরও পান-সুপারি ও নারকেল দেওয়া হয়। এটিকে তাম্বলাম বলা হয়। অসমে বিয়ের অনুষ্ঠানে নেমন্তন্ন করার সময় অতিথিদের পান-সুপারি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভারতবর্ষ ছাড়াও ফিলিপাইন, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশেও পান তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ঐতিহ্য বহন করে। ‘পানের সজ্জা পানের ডাবর পান মশলার বাটি, কন্যারে পাঠালাম, আমি করি পরিপাট।’ এইরকম কত অজস্র লোকগীতি পল্লি বাংলার ঘরে ঘরে এখনও ছড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, পান কীভাবে ধীরে ধীরে বাঙালির জীবনের এত ঘনিষ্ঠ দোসর হয়ে উঠল? এর উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু পানের ইতিহাস নয়, বাংলার সামাজিক জীবনের বিবর্তনের দিকেও তাকাতে হয়। বাংলার উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু পানচাষের পক্ষে অনুকূল ছিল। বিশেষ করে নদীমাতৃক বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বরজ তৈরি করে পান চাষের একটি স্বতন্ত্র কৃষি-সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পানের সঙ্গে সুপারি, চুন এবং পরে নানা মশলার সহজলভ্যতা তাকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলে। বাংলার গ্রামাঞ্চলে পানবরজ শুধু কৃষির একটি ক্ষেত্র ছিল না; বহু জায়গায় তা হয়ে উঠেছিল পারিবারিক জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির অংশ।

মুখশুদ্ধি হিসেবে পান

বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে অতিথিকে শুধু খাওয়ানোই যথেষ্ট ছিল না; খাওয়ার শেষে তাঁর হাতে পান তুলে দেওয়া ছিল আপ্যায়নের পরিপূর্ণতা। একসময় চা বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছনোর আগেই পান ছিল দীর্ঘ আলাপের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। বৈঠকখানায় বসে গল্প, পাড়ার আড্ডা, জমিদারবাড়ির আসর কিংবা বাড়িতে আসা আত্মীয় পানের বাটা সামনে রাখা মানেই কথোপকথনের দরজা খুলে যাওয়া। ফলে পান ক্রমশ খাদ্য থেকে সামাজিক যোগাযোগের এক মাধ্যম হয়ে ওঠে। এই জায়গাতেই বাঙালির সঙ্গে পানের সম্পর্কটি অন্য মাত্রা পায়। পান একা খাওয়ার জিনিস নয়; পান সাজাতে হয়, অন্যকে দিতে হয়, অন্যের কাছ থেকে নিতে হয়। একটি পান এগিয়ে দেওয়া তাই নিছক একটি পাতা এগিয়ে দেওয়া ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত সৌজন্য, সম্মান এবং ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত। বাংলার সামাজিক জীবনে এই দেওয়া-নেওয়ার সংস্কৃতিই পানকে ক্রমশ একটি সম্পর্কের উপকরণে পরিণত করে।

বিয়ের ক্ষেত্রেও একই সামাজিক রীতি কাজ করেছে। বরযাত্রীকে পান-সুপারি দেওয়া, অতিথিকে পান খাওয়ানো, কনের বাড়িতে পান সাজানো এসবের মধ্য দিয়ে পান ঢুকে পড়ে বিবাহের সামাজিক পরিসরে। পরবর্তীকালে পানপাতা বাঙালি বিবাহের বিভিন্ন প্রতীকী আচারের সঙ্গেও যুক্ত হয়। কনের মুখ পানপাতায় ঢাকা, শুভদৃষ্টির আগে সেই পাতা সরানো এইসব রীতি পানকে নিছক খাদ্যসামগ্রী থেকে বিবাহের সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করে। অর্থাৎ পানের বিবাহে প্রবেশ কেবল ধর্মীয় বিধানের ফল নয়; সামাজিক আতিথেয়তা ও স্থানীয় লোকাচারের দীর্ঘ বিবর্তনের ফলও বটে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে তাম্বুলের ব্যবহার প্রাচীন; কিন্তু বাংলার নিজস্ব পূজা-পার্বণ ও গৃহস্থালি আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে পান-সুপারি ধীরে ধীরে মিশে যায়। দেবতার নিবেদন, পূজার সামগ্রী, মঙ্গলাচার, সংকল্প, অতিথি আপ্যায়ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে পান ব্যবহৃত হতে থাকে। এখানে পানের আর একটি বিশেষ সুবিধা ছিল একটি ছোট, সহজে বহনযোগ্য এবং দীর্ঘক্ষণ সতেজ থাকা পাতা। ফলে আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহারিকভাবেও এটি সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতীয় সমাজে তাম্বুলের ইতিবাচক ও মঙ্গলসূচক সাংস্কৃতিক অর্থ।

আসলে বাঙালির সঙ্গে পানের সম্পর্ক কোনও একটি সময়ের তৈরি নয়। কৃষি, অর্থনীতি, আতিথেয়তা, বিবাহ, ধর্মীয় আচার, প্রেম, লোকসংস্কৃতি এবং আড্ডা বাঙালির সামাজিক জীবনের একাধিক স্তর পেরিয়ে পান ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

বিবাহের উপকরণে পান

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবে পান পাতার ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য রয়েছে। বিভিন্ন শাস্ত্র, পুরাণ সে কথা বারবার ফিরেফিরে এসেছে। দেবী দুর্গাকে কন্যা ও ঘরের অতিথি হিসেবে বরণ করার রীতিতে পান-সুপারি নিবেদনের প্রচলন রয়েছে। পুজোর নৈবেদ্য সাজানো, ঘটস্থাপনা, বিশেষ অর্ঘ্য নিবেদনের ক্ষেত্রেও পানপাতা ব্যবহৃত হয়। দেবীকে পান পাতা নিবেদন করা শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং তাঁর সুরক্ষা ও আশীর্বাদ প্রার্থনার প্রতীক। পান পাতার উজ্জ্বল সবুজ রং জীবন, সতেজতা এবং সমৃদ্ধির প্রতীক, যা দুর্গাপূজার মূল ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ধর্মীয় ঐতিহ্যে পান পাতাকে পবিত্র বলে মনে করা হয় এবং এটি মানব ও দেবলোকের মধ্যে সংযোগকারী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বিশ্বাস করা হয় যে এটি ঐশ্বরিক শক্তি বহন করে এবং পূজাস্থলে ইতিবাচক স্পন্দন নিয়ে আসে। ভক্তরা প্রায়শই দেবী দুর্গাকে পান পাতা অর্পণ করার আগে তাতে তাদের ইচ্ছা বা মন্ত্র লেখেন, যা স্বাস্থ্য, সম্পদ এবং সুরক্ষার জন্য তাদের প্রার্থনার প্রতীক। বিজয়া দশমীর বরণে এই পানপাতাই যেন পুজোর আরাধনা থেকে বিদায়ের আবেগের সেতু হয়ে ওঠে। দেবীকে কন্যারূপে বরণ করে নেওয়ার পর, বিদায়ের মুহূর্তে পান-সুপারি নিবেদনের মধ্য দিয়ে তাঁকে সম্মান ও স্নেহ জানানো হয়। লোকবিশ্বাসে পানপাতা তাই শুধু একটি পুজোর উপকরণ নয়, দেবীর মঙ্গলময় উপস্থিতিকে ধারণ করে রাখার প্রতীকও। বিসর্জনের আগে পানপাতা দিয়ে দেবীকে বরণ করার এই রীতির মধ্যে মিশে থাকে একদিকে শাস্ত্রীয় তাম্বূল নিবেদনের ঐতিহ্য, অন্যদিকে বাঙালির ঘরের মেয়েকে আপন করে নেওয়া ও আবার ফিরে আসার বার্তা।

দুর্গার বিদায় বরণে পান

আসলে বাঙালির সঙ্গে পানের সম্পর্ক কোনও একটি সময়ের তৈরি নয়। কৃষি, অর্থনীতি, আতিথেয়তা, বিবাহ, ধর্মীয় আচার, প্রেম, লোকসংস্কৃতি এবং আড্ডা বাঙালির সামাজিক জীবনের একাধিক স্তর পেরিয়ে পান ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। তাই পানকে শুধু একটি খাদ্যদ্রব্য হিসেবে দেখলে তার সাংস্কৃতিক গুরুত্বের অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। একটি পানপাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বরজের মাটি, গৃহস্থের পানদান, অতিথির আপ্যায়ন, বিয়ের শুভদৃষ্টি, পুজোর নিবেদন আর গ্রামবাংলার অসংখ্য লোকস্মৃতি। সময় বদলেছে, চা-কফি এসেছে, আড্ডার ধরন বদলেছে, শহুরে জীবনে পান খাওয়ার অভ্যাসও অনেকটাই কমেছে। তবু বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পান এখনও অমলিন। কারণ পান শেষ পর্যন্ত শুধু মুখশুদ্ধি নয়, এটি বাঙালির দেওয়া-নেওয়া, আপ্যায়ন ও সম্পর্কের এক পুরোনো ভাষা।

Written by
Developed by DXDasia