
বাঙালির ঘর-সংস্কৃতি কেবল চার দেওয়াল আর আসবাবপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার রুচিবোধ, জীবনযাপন, সর্বোপরি ঐতিহ্যের একটা বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে তার ঘরের মেঝে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে অনেক কিছুই বদলে গেছে, হারিয়েও গেছে কত কী। কিন্তু আজও পুরোনো বাঙালি বাড়ির মেঝে সেই বৈচিত্র্যময় নকশা ও উপকরণের সাক্ষী। এক সময়কার নিপুণ কারুকাজ করা মেঝে কেবল বনেদি বাড়ির অন্দরমহলেই দেখা যেত তা নয়, বাঙালি উচ্চবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের অনেক বাড়ির সদস্যরাই মেঝে বানাত খুব শখ করে। বিবর্তনের ধুলো পড়ে নকশাকাটা কিংবা অতিসাধারণ সেসব মেঝে আজ মার্বেল ফ্লোরে মিশে চকচকে হয়েছে বটে! কিন্ত সেই সব হারিয়ে যাওয়া অতি পুরোনো মেঝেরও একরকম সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আছে।

লাল মেঝে
বাঙালি মধ্যবিত্তের নস্টালজিয়ায় যে মেঝের ছবি সবচেয়ে উজ্জ্বল, তা হলো লাল মেঝে বা রেড অক্সাইড ফ্লোর। একসময় বাঙালি বাড়ির পরিচিত এবং অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক প্রতীক ছিল সিমেন্ট, সূক্ষ্ম বালি ও লাল লৌহ-অক্সাইডের মিশ্রণে তৈরি চকচকে লাল মেঝে, যা গরমের দুপুরে খালি পায়ে ঠান্ডার আমেজ দিত আর সঠিক পরিচর্যায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকত, লাল রং একেবারেই ফ্যাকাসে হত না। আর লাল মেঝেতে ভেজা পায়ের চলাচল কিংবা পায়ের ছাপ বাঙালির চিরকালীন চলচ্ছবি। কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী লাল মেঝে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কেন? কারণ মূলত নির্মাণ প্রক্রিয়ার ধীর গতি ও দীর্ঘ সময়। এই মেঝে বসানো থেকে শুরু করে শুকানো ও মোমের পালিশ দিতে যথেষ্ট সময় ব্যয় হয়। এখনকার দ্রুতগতির নির্মাণব্যবস্থা, বহুতল আবাসন ও নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির যুগে যেখানে টাইলস বা মার্বেল দিয়ে কাজ অতি দ্রুত শেষ করা হয়, সেখানে এই সময়সাপেক্ষ পদ্ধতি বড়ো অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে এই কাজে দক্ষ কারিগরের অভাব। অর্থনৈতিক হিসাব ও রক্ষণাবেক্ষণের দিক থেকেও এটি এখন বেশ ব্যয়সাপেক্ষ কাজ। তা সত্ত্বেও, লাল মেঝে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। গরমের আবহাওয়ায় এর বিশেষ আরামদায়ক গুণ, অতুলনীয় দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং নান্দনিক ঐতিহ্যের টানে অনেক স্থপতি ও সচেতন নাগরিক মনের মতো বাড়ি তৈরি করার সময় লাল মেঝের এই সুন্দর ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনছেন।
বিবর্তনের ধুলো পড়ে নকশাকাটা কিংবা অতিসাধারণ সেসব মেঝে আজ মার্বেল ফ্লোরে মিশে চকচকে হয়েছে বটে! কিন্ত সেই সব হারিয়ে যাওয়া অতি পুরোনো মেঝেরও একরকম সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আছে।
মোজাইকের মেঝে
বাঙালি বাড়ির অন্দরসজ্জার ইতিহাস আলোচনা করলে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মোজাইকের মেঝে। পুরোনো বনেদি বাড়ি থেকে শহরতলির সাধারণ বাড়ি—মোজাইক মানেই আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধন। মার্বেল বা টাইলসের জমানার বহু আগেই মোজাইকের মেঝে বাঙালি ঘরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। সিমেন্ট আর পাথর কুচির মিশ্রণে তৈরি এই মেঝেগুলোতে নিখুঁত পালিশের ছোঁয়া থাকত, যা পরিপূর্ণ ভাবে আশ্চর্য শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের দুপুরে এই ঠান্ডা মেঝেতে পা রাখা বা খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানোর সুখই আলাদা। সাদা মেঝের ওপর রঙিন পাথরের কুচি ছড়িয়ে কিংবা নানান জ্যামিতিক নকশায় এই মেঝেগুলো সাজানো হতো। বিশেষ করে সবুজ, গোলাপি বা ছাই রঙের মোজাইকের মার্জিত রূপ আজও অনেককে নস্ট্যালজিক করে তোলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মেঝেগুলোর বয়স বাড়লেও দীপ্তি কমে না, বরং যত দিন যায়, হাঁটার ছন্দে তার ঔজ্জ্বল্য আরও বেড়ে ওঠে। বাঙালি বাড়ির বৈঠকখানা থেকে বারান্দা—মোজাইকের মেঝে যেন বহু প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা পারিবারিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। শীতের রোদে মেঝেতে মাদুর পেতে বসা, ছোটোবেলার নানান স্মৃতি বা ফিনাইল দিয়ে মোজাইক মোছার চিরচেনা সুবাস— আজও আবেগ। আজ ইন্টেরিয়র ডিজাইনে ভিন্টেজ লুক ফিরিয়ে আনতে অনেকেই আবার মোজাইকের প্রতি ঝুঁকছেন। বেঁচে উঠছে এই চিরন্তন সৌন্দর্যের প্রতীকগুলো।

পোড়ামাটির মেঝে
বাংলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য সংস্কৃতির সঙ্গে পোড়ামাটি বা টেরাকোটার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। প্রাচীন বাংলার মন্দির শিল্প থেকে গ্রামীণ ও বনেদি বসতবাড়ি—সর্বত্রই পোড়ামাটির শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন দেখা যায়। অতীতে বাঙালি বাড়ির মেঝের অলংকরণে পোড়ামাটির ইট বা টেরাকোটা টাইলসের ব্যবহার ছিল বেশ জনপ্রিয়। বিশেষভাবে হেরিংবোন প্যাটার্ন কিংবা নানা রকম জ্যামিতিক নকশায় বিন্যস্ত এই মেঝেগুলো ঘরের অন্দরসজ্জায় এক প্রাচীন ও অভিজাত রূপ ফুটিয়ে তুলত। পোড়ামাটির মেঝের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ হলো এর প্রাকৃতিক ও মাটির কাছাকাছি অনুভূতি। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে এই মেঝে ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখে, আবার বর্ষার দিনে বৃষ্টির ছাঁটে ভেজা পোড়ামাটির সুবাস পুরো পরিবেশকে এক অপূর্ব আমেজে ভরিয়ে দেয়। ফুল-লতাপাতা কিংবা নিপুণ হাতে খোদাই করা বিভিন্ন মোটিফযুক্ত এই টাইলসগুলো কেবল নান্দনিকতাই বাড়াত না, এগুলো ছিল অত্যন্ত টেকসই ও আবহাওয়াবান্ধব। বাড়ির অন্দরমহল, উন্মুক্ত উঠোন কিংবা প্রশস্ত বারান্দায় পোড়ামাটির এই ব্যবহার ঘরের আবহে এক স্নিগ্ধ ও আদিম প্রাণের স্পন্দন জাগাত। এখন বাড়িতে বা ফ্ল্যাটে বড়ো পরিসরে না হলেও ছোটো ছোটো প্যানেল বা নির্দিষ্ট কোনো কর্নারে টেরাকোটার প্রয়োগ দেখা যায়।
হারিয়ে যাওয়া মেঝের নকশা কেবল কিছু ইট, সিমেন্ট বা পাথরের গল্প বলে না; বলে বাঙালির রুচি, সামাজিক অবস্থান ও জীবনধারার বিবরণ। দুঃখের বিষয়, চটজলদি নির্মাণশৈলী, ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ ও ধৈর্য্যহীনতায় হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি বাড়ির এই নকশা।

দাবা ছকের মেঝে
পুরোনো বনেদি বাড়ি কিংবা জমিদার বাড়ির বিশাল বৈঠকখানা বা রাজকীয় হলরুমে এই দাবাঘরের নকশাকাটা মেঝে ছিল একরকম অপরিহার্য বিষয়। সাদাকালো মার্বেলের বড়ো বড়ো টাইলস দিয়ে চমৎকারভাবে তৈরি এই বিশেষ নকশা ঘরের সামগ্রিক অন্দরসজ্জাতে স্বতন্ত্র ও অভিজাত মাত্রা আনত। বাঙালি বাড়ির আভিজাত্য, রুচি আর বনেদিয়ানার সাক্ষ্য বহন করত দাবা ছকের মেঝে। এই জাঁকজমকপূর্ণ মার্বেল মেঝের রক্ষণাবেক্ষণ করা বেশ কঠিন, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। নিখুঁত যত্ন ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমেই কেবল এর উজ্জ্বলতা ও আভিজাত্য বজায় রাখা সম্ভব। এখন এই ধরনের মার্বেল দিয়ে তৈরি দাবা ছকের মেঝে খুব একটা দেখতে পাওয়া না গেলেও, বাংলার বিভিন্ন হেরিটেজ ভবন, ঐতিহাসিক রাজবাড়ি কিংবা সংগ্রহশালা বা মিউজিয়ামে এই মেঝের উপস্থিতি দেখা যায়।

অন্যান্য নকশাকাটা ফিউশন
বাঙালি বাড়ির মেঝের অলংকরণে উল্লিখিত প্রধান ধরনগুলো ছাড়াও নানান বৈচিত্র্যপূর্ণ নকশার প্রচলন ছিল। সাধারণ সিমেন্টের মেঝেতেও বিশেষ শিল্পরীতি দেখা যেত, যেখানে রঙের ব্যবহার করে বর্ডার টেনে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানো হতো। এছাড়া ঘরবাড়ি ও বারান্দায় বিভিন্ন ধরনের টালির ব্যবহার ছিল বেশ ব্যাপক ও বহুল প্রচলিত। এই সাধারণ অথচ অত্যন্ত কার্যকরী টালির মেঝেতে রোদ-ছায়ার খেলা অন্যরকম মনোমুগ্ধকর আমেজ তৈরি করত। সময়ের বিবর্তনে অন্দরসজ্জার এই ধারাগুলোতেও এসেছে অভিনব পরিবর্তন। অ্যাপার্টমেন্ট বা দু-কামড়ার ফ্ল্যাটে মেঝের নকশায় ভিন্নরকম ও আকর্ষণীয় ফিউশন বা সংমিশ্রণের প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। অনেক ফ্ল্যাটে সাদা মার্বেল বা পালিশ করা পাথরের চকচকে মেঝের ঠিক মাঝখানে যেন কোনো দামি কার্পেটের মতো করে পুরোনো ধাঁচের রঙিন মোজাইকের প্যানেল বসিয়ে দেওয়া হয়। এই ধরনের ফিউশন স্টাইল একদিকে যেমন অন্দরসজ্জায় শৈল্পিক আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলে, অন্যদিকে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী নকশাকে নতুনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়।
হারিয়ে যাওয়া মেঝের নকশা কেবল কিছু ইট, সিমেন্ট বা পাথরের গল্প বলে না; বলে বাঙালির রুচি, সামাজিক অবস্থান ও জীবনধারার বিবরণ। দুঃখের বিষয়, চটজলদি নির্মাণশৈলী, ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ ও ধৈর্য্যহীনতায় হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি বাড়ির এই নকশা। ঘরগুলো হারিয়ে ফেলছে তার নিজস্ব চরিত্র। যদিও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের যুগে সম্পূর্ণ ভাবে বিলীন হয়ে যায়নি বাঙালির চিরচেনা মেঝেগুলো। পুরোনো ও নতুনের মেলবন্ধনে নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসছে। মেঝের এই নকশাগুলো ফিরে আসা মানে বাঙালির নিজস্বতা ও তার ঐতিহ্যের ফিরে আসা। ভরসা এটুকুই।

