সন্তোষকুমার ঘোষ : আড্ডাবাজ সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও সমরেশ মজুমদারের ‘জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া’

তিনি লিখেছিলেন, ‘ভোরবেলা কোনও সময় নয়। একটি ঘটনা। টুপ করে আসে, টুপ করে মিলিয়ে যায়।’ তাঁর মতো সফল সাংবাদিক-সাহিত্যিক এই বাংলার বুকে বিরল। সংবাদ পরিবেশনকে সাহিত্যের আঙিনায় এনে ফেলে, বাংলা সাংবাদিকতার গোড়া ধরে টেনে যাকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করেছিলেন, তিনি হলেন সন্তোষকুমার ঘোষ (Santosh Kumar Ghosh)। প্রেমেন্দ্র মিত্রর কথায় তিনি ছিলেন ‘পার্সোনিফায়েড টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি’। ১৯৪৯ সালে সাগরময় ঘোষের ডাকে তিনি দেশ পত্রিকায় ‘কিনু গোয়ালার গলি’ ধারাবাহিক ভাবে লিখতে শুরু করেন। এই উপন্যাস তাঁকে বাংলা সাহিত্যে পাকা আসনে বসিয়ে দিয়েছিল। যদিও সাংবাদিক সন্তোষকুমারের উপর অভিমান করে সাহিত্যিক সন্তোষ কুমার দীর্ঘদিন কিছু লেখেননি। আবার যখন লিখলেন, তখন ‘শেষ নমস্কার’-এর মতো উপন্যাস তাঁর হাত থেকে বের হয়েছে। যে উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি। তবে তিনি নিজেই সমরেশ মজুমদারকে একটি চিরকুটে লিখে গিয়েছেন, দ্বিতীয়বার সাহিত্য আকাদেমি পাওয়ার কথা। তাও আবার কালবেলা উপন্যাসের জন্য!

সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে সন্তোষ কুমার ঘোষের সম্পর্ক ছিল অনেকটা মেঘ বৃষ্টির মতো। সন্তোষকুমারের প্রভাব বারবার সমরেশ মজুমদারের লেখায় ফুটে উঠেছে। তখন সমরেশ মজুমদার, দেশ-এ ‘উত্তরাধিকার’ লিখছেন। একদিন হঠাৎ তাঁর কাছে একটি চিঠি এলো। সন্তোষ কুমার চিঠি লিখেছেন। ‘এযাবৎ যা পড়েছি তাতে মনে হয়েছিল আপনি বাংলা সাহিত্যের ঘোড়দৌড়ে অলসো র্যান ঘোড়া। তবে এই লেখা পড়ে চমকে উঠলাম। দয়া করে দর্শন দেবেন?’ এই চিঠি দেখে চমকে উঠলেন সমরেশ। তখন সন্তোষ কুমারের সঙ্গে আলাপ হয়নি তাঁর। যদিও সমরেশ তখন আনন্দবাজার পত্রিকার দপ্তরে আসা যাওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু তখন সন্তোষ কুমারের ঘরে তাঁর যাওয়া হয়নি। আনন্দবাজারের চারতলায় বসতেন সন্তোষ কুমার। সমরেশ জানতেন সন্তোষকুমার একজন কড়া মানুষ, সেইসঙ্গে উন্নাসিকও। তাই একটু ভয়ে ভয়ে একদিন গেলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।

তাঁর মতো সফল সাংবাদিক-সাহিত্যিক এই বাংলার বুকে বিরল। সংবাদ পরিবেশনকে সাহিত্যের আঙিনায় এনে ফেলে, বাংলা সাংবাদিকতার গোড়া ধরে টেনে যাকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করেছিলেন, তিনি হলেন সন্তোষকুমার ঘোষ।

উনি তখন ডিকটেশন দিচ্ছিলেন। সমরেশের পরিচয় শুনে হাত নেড়ে বসতে বললেন। কাজ শেষ হলে বললেন, ‘চলো’। ওঁর গাড়িতে রবীন্দ্রসদনে পৌঁছলেন সমরেশ। পথে একটাও কথা বললেন না। সেই সন্ধ্যায় ছিল সুচিত্রা মিত্র এবং কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠান শেষে দুজনে গেলেন রাতদিন হোটেলে। সমরেশের অনুমতি না নিয়েই রঙিন পানয়ীর হুকুম দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সমরেশকে বললেন যে উনি তাঁর প্রায় সব লেখা পড়েছেন। যা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু সেসব লেখাকে কচুকাটা করে তিনি উত্তরাধিকার নিয়ে কথা শুরু করলেন। সেই রাতে বাড়ি ফিরে খুব উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন সমরেশ। একজন অচেনা মানুষকে এইভাবে আপন করে নেওয়া যায়? এত খোলামেলা আড্ডা দেওয়া যায় অতি সহজেই? সমরেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় ওঁর সঙ্গে দেখা হতে লাগল সমরেশ মজুমদারের। ওর কথা গিলে খেতেন তিনি। সমরেশ মজুমদার তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘একটি মানুষ। শুধু কথা বলে যাচ্ছেন আর আমি সেইসব কথায় একটার পর একটা গল্প পেয়ে যাচ্ছি। সেই সব গল্প লিখছি দেশ পত্রিকায়।’

গল্প, উপন্যাস, প্ৰবন্ধ এবং সমালোচনা কোনটাতেই তাঁর জড়তা ছিল না। তিনি লিখছেন না বলে নিয়মিত সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হত। সেসব ঝগড়ার পর এক রাতে অনবদ্য ছোটগল্প লিখে ফেলে শিশুর মত হাসতেন। হেসে বলতেন ‘তুমিই লেখালে’। আবার সমরেশের পুজোসংখ্যায় বেরনো উপন্যাস এক রাতেই শেষ করে ভোরবেলায় চলে এসেছেন তাঁর বাড়িতে। ওনাকে ঘুম থেকে তুলে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, ‘কী লিখেছিস রে! তোর মতো গবেটও এমন লিখতে পারে! দাবা বের কর।’ সেই ভোর থেকে টানা দাবা খেলে গেলেন দুপুর পর্যন্ত। স্নান খাওয়া নেই। খেতে বললে নামমাত্র খেলেন। তারপর সমরেশকে নিয়ে বের হলেন। সোজা মিনার্ভা বারে। সেখানে বসে কী কী লেখার পরিকল্পনা মাথায় ঢুকেছে সেগুলো জানালেন। তারপর বললেন, ‘চল’। ওনারা গেলেন হাজরা রোডের একজন মহিলা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীর বাড়িতে। সেখানে তাস খেলা হচ্ছিল। সন্তোষকুমারকে পেলেই যে কোনও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী উচ্ছসিত হয়ে ওঠেন। গোটা গীতবিতান যার মুখস্থ, স্বরবিতানের কোন পাতায় কোন স্বরিলিপি আছে যিনি বলে দিতে পারেন, সুরের সামান্য বিচ্যুতি যাকে ক্ষিপ্ত করে তোলে তাকে আপনজন ভাবা স্বাভাবিক। সন্তোষ কুমার তাসে জমে গেলেন। এই সময় এক মধ্যবয়সী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ঘরে ঢুকে বললেন, ‘ছি ছি সন্তোষদা, আপনি এটা কি করেছেন? আপনি লিখেছেন, একটা জাহাজ যখন ভোঁ বাজিয়ে জাহাজঘাটা ছেড়ে চলে গেল ঠিক তখনই একটা মেল ট্রেন সদৰ্পে হুইস্ল দিয়ে পাশের স্টেশনে ঢুকল? আপনি কিছুতেই ওঁকে এভাবে অপমান করতে পারেন না।’ সন্তোষ বলেছিলেন, ‘তুমি বয়সে অনেক ছোটো, বড়দের বিষয়ে কথা বলো না।’ ‘আলবৎ বলব।’ চেঁচিয়ে উঠেছিলেন সেই গায়ক। সন্তোষ কুমার তবু উপেক্ষা করে তাস খেলতে শুরু করলেন। এই সময় সেই প্ৰবীণা শিল্পী ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে গায়ককে সমর্থন করে গালাগালি দিতে শুরু করলেন। যাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্ৰনাথ জেগে ওঠেন তাঁকে ওই ভাষায় কথা বলতে শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সমরেশ মজুমদার। তারপর গম্ভীর মুখে উনি তাস রেখে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

কোনও এক পানশালায় অনেকটা পান করার পর তিনি বলেছিলেন, ‘ওইসব শব্দ আমি কয়েকযুগ ধরে ওঁর মুখে শুনে আসছি। একবার পাক-পাড়ায় বাড়ির বসার ঘরে সবাই আড্ডা মারছি। পর্দার নিচ দিয়ে দেখলাম লুঙ্গি পরে কেউ যাচ্ছে। উনিও দেখেছিলেন। কিন্তু লুঙ্গিকে শাড়ি ভেবে নিয়ে আমাকে তোমার বউদির সামনেই গালাগাল করেছিলেন। ভেবেছিলেন আমি রাস্তার মহিলাকে দেখছি।’ পাল্টা প্রশ্ন করায় উনি জানিয়েছিলেন ‘ভালোবাসা বন্যার মতো। যতক্ষণ নদীতে তীব্র স্রোত থাকে, সব ভাসায় কিন্তু নদী নিজে ভাসে না। যেই বন্যার জল নেমে যায়, নদী থাকে তারই মতো। শুধু দুপাশের চরাচর ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে থাকে। পলি জমে জমে নিষ্ফলা হয়। ভালবাসলে ওই ক্ষতচিহ্নগুলো তোমাকে বইতেই হবে। আর কে বলতে পারে, হয়তো ওই ক্ষতচিহ্নগুলো আছে বলে ভালোবাসা মনে থাকে।’

সন্তোষকুমার মজে থাকতেন রবীন্দ্রনাথে। তিনি যে রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন, তা অনেকেই জানতেন। বলতেন, “তিনি আছেন, রয়েই গেছেন। আমার বর্ষপঞ্জীতে তাই পঁচিশে বৈশাখটাই সত্য। আর বাইশে শ্রাবণের মত মিথ্যে আর কিছু নেই। …রবীন্দ্রনাথের সব লেখাই যদি কোনও দিন হারিয়ে যায়, তা হলেও চিন্তা নেই, আমার সব মুখস্থ আছে।” সারা জীবনে সন্তোষকুমার ঘোষের প্রকাশিত উপন্যাস এগারোটি, ছোটগল্পের সংকলন তেরোটি, দিনলিপি একটি ও নাটক দু’টি। এ ছাড়া অপ্রকাশিত উপন্যাস একটি (নিশীথ রাতে) ও অসমাপ্ত উপন্যাস একটি (করকমলেষু)। অগ্রন্থিত ছোটো গল্পের সংখ্যা পঁচিশ, অগ্রন্থিত প্রবন্ধ কুড়িটি। নিজের সম্পর্কে প্রচন্ড আস্থা তাকে ক্রমশ অভিমানী করেছিল।

সমরেশ মজুমদার লিখেছেন, ‘আমি ওঁকে দেখেই শিখেছিলাম, ক্ৰোধ যতটা অভিমান তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।’ কালবেলা উপন্যাসটি সন্তোষকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। সেটা দেখে তিনি আঁতকে উঠেছিলেন, ‘ইস্। করেছ কি? যার লেখা বই একদম বিক্রি হয় না। তাকে উৎসর্গ করেছ? এই বই-এর বারোটা বেজে গেল।’

সমরেশ মজুমদার তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘একটি মানুষ। শুধু কথা বলে যাচ্ছেন আর আমি সেইসব কথায় একটার পর একটা গল্প পেয়ে যাচ্ছি। সেই সব গল্প লিখছি দেশ পত্রিকায়।’

সমরেশ মজুমদার তাঁর স্মৃতি কথার এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, ‘কখনও কখনও রাতে লিখতাম। লিখতে গিয়ে মনে পড়ছিল না উত্তরবঙ্গের ময়নাগুড়ি থেকে বাঁ দিকে যে রাস্তা চলে গিয়েছে তার প্রথম গঞ্জটার নাম কি? সেই গভীর রাতে ফোনে প্রশ্নটা করেছি, তিনি এক মুহূৰ্ত সময় না নিয়ে বলেছেন, লাটাগুড়ি। বলে নামিয়ে রেখেছেন ফোন। এরকম অজস্র প্রশ্ন যা হাতের কাছে কোনও প্রমাণ না পেয়ে তার দারস্থ হয়েছি। আর সঙ্গে সঙ্গে সঠিক জবাব পেয়েছি। এখনও পর্যন্ত এইরকম জ্ঞানভান্ডার আমি কোনও বাঙালির দেখিনি।’ ১৯৮৪ সালে সন্তোষকুমার সপরিবার বেড়াতে গিয়েছিলেন উত্তর ভারত। সেখানেই একদিন তিনি অনুভব করেন গলায় মাছের কাঁটার মতো কিছু ফুটেছে। ক্রমে সেই অনুভূতি ব্যথায় পরিণত হয়ে দিন দিন বাড়তে থাকে। ডাক্তারের পরামর্শ মতো বায়োপসি করানো হয়। তখনই বোঝা যায় তিনি কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রায় এক বছর ধরে মুম্বই, কলকাতায় চিকিৎসা চলল। শেষ দিকে তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি লিখে লিখে যোগাযোগ করতেন।

সেই সময় কালবেলা উপন্যাসটি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেল। সেই খবর পেয়ে ভোরবেলায় নার্সিংহোমে ছুটে গিয়েছিলেন সমরেশ। উনি বসেছিলেন সাদা বিছানায়। ক্যান্সার শরীরটাকে ছোটো করে দিয়েছে। সমরেশকে দেখে হাসলেন। কথা বলতে চাইলেন, শব্দ বের হল না। তাড়াতাড়ি কাগজ-কলম নিয়ে লিখলেন, ‘এক জীবনে দ্বিতীয়বার আমি আকাদেমি পেলাম।’ কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে সন্তোষকুমার ঘোষ ডায়েরি লিখতেন। লিখতেন নানা রকম কথা, যা পরে ‘চলার পথে’ নামে বই হয়ে বেরোয়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন এমনই কিছু লাইন, ‘ক্ষুধা আহারের ইচ্ছা লোপ পাচ্ছে। চিত হয়ে শুতেও পারছি না। এটা অবশ্যি পারবই একদিন না একদিন, অন্তত হরিবোলের রাজপথে। শেষমেশ অন্তত চিতায়।’ আর এক পাতায়, ‘জন্মান্তরেও বিশ্বাস জন্মাচ্ছে। সমুদ্রকে দেখে দেখে। ওই দূরের অয়শ্চক্রকেই মনে হয় দুনিয়ার সীমা। অথচ অপারের পার আছে, দুঃসাহসী মানুষ একদিন ভেসে ডুবে ফের ভেসে আবিষ্কার করেছিল’।

তথ্যসূত্র: কইতে কথা বাঁধে/সমরেশ মজুমদার এবং আনন্দবাজার পত্রিকা

Written by
Developed by DXDasia