শীতের শহরে ৩৬ জন আলোকচিত্রীর ফ্রেমে ‘জিন্দেগি কি তাসভির’

‘জিন্দেগি কি তাসভির’ অর্থাৎ জীবনের প্রতিচ্ছবি – শনিবারের ছবিমহল

‘জিন্দেগি কি তাসভির’ অর্থাৎ জীবনের প্রতিচ্ছবি। ছবি মনের সেই আয়না। আর প্রতিচ্ছবি হল যা প্রকাশিত, যা ছবির প্রতি উত্তর অর্থাৎ প্রত্যুত্তর। ছবি বা আলোকচিত্র নিয়ে শিল্পীরা নিজেরাই নিজেদের প্রশ্ন করেছেন, তাঁদের নিজেদের ছবি জীবনের কতখানি কাছের! আর কতই বা দূরের! বর্ণময়তার ছাপ সেখানে স্পষ্ট। জ্বলজ্বল করে ওঠে আবহে বাজতে থাকা চরম দারিদ্র্য অথবা নিজস্ব যৌনতা। গ্যালারি গোল্ডে ১৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘জিন্দেগি কি তাসভির’-এর পঞ্চম অধ্যায়। যে প্রদর্শনী বলে উঠল জীবনের কথা, মানুষের কথা।

এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন ৩৬ জন আলোকচিত্রী। এর মধ্যে ২২ জনের কাজ সিঙ্গেল শটের এবং ১৪ জনের কাজ সিরিজ বা গবেষণাধর্মী। অনেকদিন ধরে বিভিন্নরকম গবেষণার মাধ্যমে শিল্পীরা খুঁজে নিয়েছেন মানুষের প্রাত্যহিক বুনে যাওয়ার ছবি। যা অমলিন, যা এই শীতের কুয়াশাতেও অমোঘ। ফটোগ্রাফির ধারা ক্রমশ পাল্টেছে। পাল্টেছে গল্প বলার মাধ্যম। আর শুধুমাত্র ক্যামেরাতেই বন্দি নেই আলোকচিত্র শিল্প। কেন এবং কীভাবে, তা জানার জন্য এই প্রদর্শনীতে ঢুঁ মারতে হবে। যেমন নৈঋতা পাঁজার কাজগুলির নাম ‘ইন সার্চ অফ পিস’। পাশাপাশি কোলাজের মাধ্যমে তিনি আবিষ্কার করতে চেয়েছেন শান্তির পথ। যেমন একটি লাল মাটির সরু রাস্তায় পড়ে আছে শিমুল। তাঁর চোখে এই পথ হয়ে উঠেছে মহিলার সিঁথির সিঁদুর। পাশাপাশি দুটি ছবির মধ্যে তিনি সম্পর্ক বুনে চলেছেন এই চোখের আরামের। 

শুভজিৎ নস্কর তাঁর কাজের নাম দিয়েছেন ‘হোয়্যার দ্য পিকক্‌স ক্যান ডান্স ফ্রি’। এই সমাজের প্রায় আড়ালে থাকা কয়েকটি মানুষের বেঁচে থাকা এবং সংগ্রামের কথা তিনি বলতে চেয়েছেন ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মাধ্যমে। কয়েকজন প্রান্তিক মানুষের লড়াই তাঁর ছবিতে জায়গা করে নিয়েছে। মুক্ত বিহঙ্গের মতোই তারা সব্বাই স্বাধীন। কিন্তু এই একবিংশ শতকের সমাজে সত্যিই কি তারা স্বাধীন? তাদের নিয়ে লোকে মশকরা করে লেখে, “হিজড়া শালা টিক টকের হিজড়া”। শুভজিতের ছবি আর ‘ফটোগ্রাফি’র মধ্যে আবদ্ধ থাকল না, তা হয়ে উঠল ‘ভিস্যুয়াল আর্ট’। 

জিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ছবিতে আবার আন্দোলনের নিঃশব্দ মাত্রা উঠে এল। তিনি তাঁর ছবির নাম দিলেন ‘সাইলেন্ট প্রোটেস্ট’। একটি চরিত্র শুয়ে রয়েছে নিশ্চিন্তে। তার মুখ ঢেকে রয়েছে রাজনৈতিক পতাকায়। তিনি তাই নিঃশব্দেই বলে ওঠেন তার শরীর এবং সেই শরীরের ঘুম সবটাই রাজনৈতিক। আর পৃথিবীতে কোনোকিছুই অরাজনৈতিক নয়। 

ঋতম নন্দীর সিরিজের নাম ‘কালার ব্লাইন্ড রেইনবো’। সেই ছবিগুলিও চরম রাজনৈতিক। শরীর ও মনের ভিতর চলতে থাকা রাজনীতির কোলাজ উঠে এল তাঁর শিল্পকর্মে। বাংলা সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে ‘অন্তর্লীন রাজনীতি’। 

এছাড়াও সত্যজিৎ ভট্টাচার্যের ফটোগ্রাফি ‘প্রাইড’, দীপায়ন বসুর ‘বিসর্জন’, অভিরূপ দাস ও রুদ্র ব্যানার্জির সিরিজ ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’, সন্দীপন মুখার্জির সিরিজ ‘দ্য অর্থজেনেসিস অফ সোওল’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

ছবি হবে একটি গল্প – আবার উপন্যাস বা কবিতাও হতে পারে। এই প্রদর্শনীর কয়েকজনের ছবি সেই ছাপ স্পষ্টভাবে ফেলতে পারেনি। যার ফলে মানুষের জীবনের অফুরন্ত এই যাত্রাপথ হয়ে উঠেছে আরোপিত। জোর করে পাশাপাশি দুটি ছবি বসিয়ে দেওয়ার কোলাজ শুধুমাত্র ‘দেখা’ হয়ে থেকে গেছে। বাড়তি পাওনা সেখানে নেই। পাশাপাশি কয়েকজন আলোকচিত্রীর সংক্ষিপ্তসারের হাতের লেখা বোধগম্য হয়নি। প্রথমত, যেকোনো শিল্পমাধ্যমে সংক্ষিপ্তসারের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা যায়। দর্শক নিজের মতো ছবি দেখবেন-ভাববেন নাকি সংক্ষিপ্তসার পড়ে সবটা বুঝতে পারবেন কিংবা প্রভাবিত হবেন – তাও আলোচনা সাপেক্ষ। যদি সংক্ষিপ্তসারের প্রয়োগ এতখানি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে তা পরিষ্কার হাতের লেখায় লেখাই ভালো। 

সিএসএফকে আয়োজিত এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলবে ২২ ডিসেম্বর রোববার অবধি। কলকাতার গ্যালারি গোল্ডে। জীবনের প্রতিচ্ছবির এই রেশ লেগে থাকবে আগামী বেশ কয়েকদিন।

Developed by DXDasia