
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হলে এমনটাই নাকি বলতেন দাদাঠাকুর
(১)
এক সেরেস্তাদারের সঙ্গে দেখা করতে দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্ৰ পণ্ডিত একবার আদালতে গেছেন। তাঁকে আদালতে আসতে দেখেই উকিল, মুহুরি, মোক্তাররা এগিয়ে এসে বললেন, ঠাকুরমশাই, আপনার কেস আমি এক্ষুনি করে দিচ্ছি, আসুন। ভিড়ের চাপে দাদাঠাকুর এগোতেই পারেন না। তখন বুদ্ধি খাটিয়ে বলেন, আমি কন্যাদায়গ্ৰস্ত গরীব ব্রাহ্মণ। কিছু সাহায্যের জন্য এসেছি আপনাদের কাছে।
এ কথা শুনে ভিড় ফাঁকা। রাস্তা পরিষ্কার। দাদাঠাকুর সোজা চলে গেলেন সেরেস্তাদারের কাছে।
(২)
প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বিমলভূষণের সঙ্গে দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্ৰ পণ্ডিতের দেখা হতে বিমলভূষণ জিগ্যেস করলেন, দাদাঠাকুর, বলুন কেমন আছেন? চলেছেন কোথায়?
দাদাঠাকুর রসিকতা করে বলেন, ভায়া, ঠাকুরের একটা কু। আর কুকুরের দুটো কু। মনে রাখবেন দুটোই কিন্তু পথে পথে ঘোরে। এবার বুঝুন কেমন আছি।
একথা শুনে বিমলভূষণ হেসে ফেললেন।
(৩)
এম এল এ এক বন্ধু দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্ৰ পণ্ডিতকে জিগ্যেস করেন, এম এল এ-দের সম্পর্কে আপনার কী অভিমত? উত্তরে দাদাঠাকুর বলেন, পরের কাছ থেকে ভাতা-ভাড়া মেলে। এ মেলে ও মেলে বলেই তো উনারা দেশের নেতা, অর্থাৎ দোতা নেহি। দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্ৰ পণ্ডিতের রঙ্গ রসিকতা একথা শুনে প্রশ্নকর্তা বন্ধুটি না হেসে পারলেন না।
(৪)
সাহিত্যিক দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্ৰ পণ্ডিত একদিন হাতিবাগান মোড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত পত্রিকা বিদূষক বিক্রি করছেন। এমন সময় তাঁর সঙ্গে দেখা এক পরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনি একজন নাট্যপ্রেমী। ভদ্রলোক দাদাঠাকুরকে নিয়ে গেলেন আর্ট থিয়েটারের ম্যানেজার অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের ঘরে। সেই ঘরে অপরেশীবাবু সঙ্গে তখন আড্ডা দিচ্ছেন জীবনবাবু, দীনুবাবু, প্ৰবোধ গুহ ও তিনকড়ি চক্রবর্তী। দীনুবাবু দাদাঠাকুরকে আসতে দেখে হাত তুলে নমস্কার করে বললেন, আজকাল চোখে ভাল দেখছি না। আপনি আমার প্রণাম গ্ৰহণ করুন।
প্রতি নমস্কার জানিয়ে দাদাঠাকুর হাসতে হাসতে দীনুবাবুর পাশে গিয়ে বসলেও ও গল্প জুড়ে দিলেন। তাই দেখে তিনকড়ি চক্রবর্তী হাসতে হাসতে বললেন, ও পণ্ডিতমশাই, আমাদের দিকেও এখটু কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করুন।
দাদাঠাকুর হাসতে হাসতে বললেন, গরীব ব্ৰহ্মাণে দানী দেখলেই তার কাছে যাই। আপনার তিনটে কড়ি একমাত্র বামুনের হ্রকোয় লাগানো ছাড়া আর কোনো কাজে লাগত না।
দাদাঠাকুরের কথা শুনে আড্ডার আসরের সকলেই হো হো হেসে উঠলেন।
(৪)
এক পরিচিত ভদ্রলোক একদিন দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্ৰ পণ্ডিতকে জিগ্যেস করলেন, মশাই, আপনি রবি ঠাকুরকে দেখেছেন?
প্রশ্নের উত্তরে হাসতে হাসতে দাদাঠাকুর বললেন, না দেখিনি, তবে দেখা হলে আমি বলতুম, আপনি যেমন ঠাকুর, আমিও তেমন পণ্ডিত।
এ কথা শুনে সেই ভদ্রলোক হেসে উঠলেন।
(৫)
একদিন সকালে দাদাঠাকুর নলিনীকান্ত সরকারের বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, বুঝলে হে নলিনী, তোমাদের এই কলকাতা এক অদ্ভুত শহর।
নলিনী বললেন, কেন, আমন কথা বলছেন কেন? এই শহরের আবার কী হল?
দাদাঠাকুর বললেন, কী আবার হবে? পাঁজিতে লেখা আছে। বছরে একদিন ঝুলন, একদিন রাস। কিন্তু তোমাদের এই কলকাতা শহরে দেখছি নিত্য ঝুলন, নিত্য রাস!
নলিনী শুনে বললেন, সে কী! কোথায় দেখলেন নিত্য ঝুলন, নিত্য রাস?
দাদাঠাকুর তখন বললেন, কেন হে, তোমাদের বাসে-ট্রামেই তো নিত্য ঝুলন, নিত্য রাস! একথা শুনে নলিনী হেসে উঠলেন।
