
৪০০ বছরে পৌঁছনোর পর’ব্যাসিলিকা’-র সম্মান দিয়েছিল রোমের ভ্যাটিকান
একটি চার্চের জন্ম নিয়ে হাজারো গপ্পো! আর সেই সব গল্পের দর্শক একটি নদী বন্দর। বাংলার হুগলি নদীর বন্দর। চার্চের নাম, ব্যান্ডেল চার্চ। এই কাহিনির সঙ্গে আশ্চর্য যোগ ভিন্ন দেশ ও সভ্যতার। এদেশের নয় অথচ এই দেশকে বাদ দিয়েও নয় এই বন্দরের কাহিনি-কথা। সহজ করে বলাই যায়, বাংলার এক আগলি বন্দরের ধার্মিক কড়চা। কেন না, ধর্ম মানেই ধারণ। আর তার সূত্রে আসে ধারক মানুষের কথাও। সেই মুখগুলো অবশ্য হারিয়ে গেছে কালের নিয়মে,বাংলার লাইফ লাইন এই নদী সব সময়ই আমন্ত্রণ করে এসেছে যে বিদেশিদের। তারা কখনও এসেছিল ব্যবসার জন্য, তো কখনও বসতি স্থাপনের জন্য। পর্তুগিজদের বাংলায় আগমনও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
ভাস্কো-ডা-গামা ভারতের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছনোর প্রায় এক শতক পরে পর্তুগিজরা বাংলাতে প্রবেশ-পথ তৈরির পরিকল্পনা করে। পাঠান নবাব মহম্মদ শাহ-র সমর্থনে ১৫৩৭-এ পর্তুগিজ অ্যাডমিরাল সাম্পায়ো যুদ্ধ জাহাজ ও সেনা নিয়ে শের খাঁ-কে আক্রমণ করেন এবং পরাজিত করেন। সেই যুদ্ধ জয়ের দৌলতেই পর্তুগিজরা গঙ্গার পাশে বাণিজ্যকুঠি গড়ার অধিকার পায়। ক্যাপ্টেন পেড্রোকে পছন্দ করতেন মুঘল নবাব আকবর। তাই ১৫৭১ সালে সম্রাট আকবর হুগলিতে একটি শহর নির্মাণের অনুমতি দেন। সেই অনুসারে ১৫৭৯-এ তৈরি হল বাণিজ্যকুঠি। সেই কুঠি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তৈরি হল দুর্গ। দুর্গের প্রধান ক্যাপ্টেন পেড্রো তাভারেস বন-জঙ্গল সাফ করে নতুন নগর ও বন্দরের পত্তন করলেন। নাম রাখলেন ‘উগোলিম’ (ইংরাজিতে আগলি)। ঐতিহাসিক সেই নাম-শব্দেরই অপভ্রংশ ‘হুগলি’। আর পর্তুগিজ ‘ব্যান্ডেল’ শব্দের অর্থ হল বন্দর।
শহর তো হল, এবার চাই অন্য ধর্মের দেশে নিজের আচার-আচরণ পালনের সুবিধে। আকবরের কাছ থেকে তারও অনুমতি মিলল সহজেই। ১৫৯৯ সালে হুগলি নদীর পাশে তৈরি হল একটি কাঠের গির্জা — ‘নোসা সেনহোরা দো রোজারিও’। যার ইংরাজি অর্থ ‘আওয়ার লেডি অফ হ্যাপি ভয়েজ’। সেটিই এখনকার ব্যান্ডেল চার্চ। ভারতের এই প্রাচীনতম গির্জাটি আজ বাংলার পর্তুগিজ-জীবনের একটি স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ৪০০ বছরে পৌঁছনোর পর এটিকে’ব্যাসিলিকা’-র সম্মান দিয়েছিল রোমের ভ্যাটিকান। চার শতকের ইতিহাসে বহুবার বহু আঘাতও এসেছে এই চার্চের উপর। ভেঙে পড়েছে এটি মাঝে মাঝেই। ১৬৬০-এ ফাদার গোমেজ যেমন ইট ও কংক্রিটের দ্বারা একটি নতুন মার্জিত গির্জা তৈরি করতে বাধ্য হন। কিন্তু সেই ভবনটিও বেশিদিন নিরাপদ রইল কই!
১৬২২-এ সম্রাট জাহাঙ্গির-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন যুবরাজ হারুণ (পরবর্তীকালে শাহজাহান)। তৎকালীন পর্তুগিজের গভর্নর মাইকেল রডড্রিগস শাহজাহানকে সাহায্যের প্রস্তাবে রাজি হননি। সম্রাট হওয়ার পর তার বদলা নিতে ১৬২৮-এ মুঘল সুবেদারকে ব্যান্ডেল অভিযান করান সম্রাট। বিশাল বাহিনী পর্তুগিজ দুর্গ ঘিরে ফেলে। ভিতরে তখন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মাত্র ২০০ পর্তুগিজ সৈনিক। পর্তুগিজরা সেদিন জয়ী হয়নি নিজেদেরই একজনের বিশ্বাসঘাতকতায়। ১৬৩২-এর ২৪ জুন, সেন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্ট-এর উৎসব। সেই দিন বেইমানের বদান্যতায় মুঘল সেনারা পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে অস্ত্রভাণ্ডারের দখল নিয়ে বারুদখানায় আগুন লাগায়। গণনিধন হয় সাধারণ খ্রিস্টানদের। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় তৎকালীন পর্তুগিজ গভর্নরকে এবং নিহত হয় পাঁচ পাদ্রি। চার্চ সহ অন্যান্য ভবনগুলিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। চার্চের সবচেয়ে প্রবীণ পাদ্রি ফাদার জোয়াও দ্য ক্রজ-সহ ৪০০০-এর বেশি পর্তুগিজ নরনারীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মুঘল রাজধানী আগ্রার দুর্গে।
আরও পড়ুন
বাঁশবেড়িয়ার প্রাচীন হংসেশ্বরী মন্দির
পরে সম্রাট শাহজাহান গির্জা পুনর্গঠনের জন্য অর্থ প্রদান করেন। ১৬৩৩-এ ব্যান্ডেলের ৭৭৭ একর জমি নিষ্কর হিসাবে পর্তুগিজদের দান করার পাশাপাশি সেখানে কোনও বিষয়ে মুঘল হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং স্বাধীন ধর্মাচরণ-সহ আরও ১৫টি অধিকার পর্তুগিজদের দেন। তবে এই দানের পেছনে একটি নাটকীয় ঘটনা রয়েছে। কিংবদন্তি বলে, সেখানে দরবার হলে ফাদার ক্রজকে ফেলে দেওয়া হয় কয়েকটি ক্ষিপ্ত হাতির সামনে। এর মধ্যে যে হাতিটি সবচেয়ে বড়, সে এসে ফাদারকে শুঁড়ে জড়িয়ে শূন্যে তোলার পর নিজের পিঠে বসিয়ে সোজা সম্রাটের সামনে গিয়ে পা মুড়ে বসে শুঁড় তুলে স্যালুট দেয়। হাজির দর্শকরা মনে করেন, আল্লার নির্দেশেই হাতিটি ফাদার ক্রজকে মারেনি। তাঁরা সমস্বরে আওয়াজ তোলেন, ‘খ্রিস্টানরাও আল্লার প্রিয়, তাদের মুক্তি দাও’।
ব্যান্ডেল চার্চকে কেন্দ্র করে অনেক অলৌকিক ঘটনাও শোনা যায়। ১৬৩২-এ মুঘল আগ্রাসনের সময়ে তিয়াগো নামে এক পর্তুগিজ, মাদার মেরি-র মূর্তিটি নিয়ে গঙ্গা পার হচ্ছিলেন। সেই সময় তিনি মুঘল সেনাদের তিরে নিহত হন, মূর্তিটি ডুবে যায়। তাই, চার্চটি নতুন করে তৈরি হলেও মেরির কোনও মূর্তি ছিল না। এক রাতে ফাদার ক্রজ স্বপ্নে দেখেন, নদীর থেকে এক অদ্ভুত রশ্মি তাঁর দিকে আসছে, আর তিয়াগো চিৎকার করে বলছেন, ‘স্বাগত, স্বাগত, স্বাগত! আওয়ার লেডি অফ হ্যাপি ভয়েজ আমাদের জয়ী করেছেন। জাগুন, ফাদার জাগুন! আমাদের জন্য প্রার্থনা করুন’। পরদিন সকালে চার্চের বাইরে ‘গুরুমা ফিরে এসেছেন’ বলে জেলেদের চিৎকারে ফাদার এসে দেখেন, দরজার খানিকটা দূরে সেই ডুবে যাওয়া মূর্তিটি পড়ে আছে। ফাদার মূর্তিটি তুলে এনে মূল প্রার্থনা বেদিতে স্থাপন করেন। পরে ১৯১০-এ, সেই মূর্তিটি দোতলার ব্যালকনিতে স্থাপিত হয়।
ব্যান্ডেলের আশেপাশে খুব অল্প পর্তুগিজ বংশোদ্ভূতই এখন থাকেন। সেই ঐতিহাসিক ৭৭৭ একর জমিরও অনেকটাই বেদখল! তবু সাধারণ মানুষের উৎসাহে চিড় ধরেনি একটুকুও। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীর সফরের তালিকায় আছে ব্যান্ডেল চার্চ।
(ঋণ – ‘ডিঙ্গি’ ব্লগ)
