
তখন বিশ্বভারতীর ছাত্ররা রাত্রে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে ঘুমাতে যেত
১৯৩২ সাল। সাহেব যখন শান্তিনিকেতন পৌঁছলেন, তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। ছিপছিপে চেহারার বিদেশি মানুষটি জানেন, বাংলাদেশে এই সময়টাকে বলে গোধূলি। অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র মজুমদার এবং চারজন আদ্যবিভাগের ছাত্র তাঁকে নিতে এসেছিলেন। সবেমাত্র ইংল্যান্ড থেকে আসা বিদেশি মানুষটির জিনিসপত্র স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করা গরুর গাড়িতে নিয়ে তোলা হল। প্রাথমিক এই আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলেন উইলিয়ম পিয়ার্সন।
শান্তিনিকেতনের আদিযুগে রবীন্দ্রনাথ যে কয়জন বিদেশি শিক্ষাব্রতীকে পাশে পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে উইলিয়ম উইনস্ট্যানলি পিয়ার্সন অন্যতম। ১৮৮১ সালের ৭ মে পিয়ার্সনের জন্মতারিখ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়ে লন্ডন সোসাইটিতে যোগ দেন এবং মিশনের কলকাতা শাখার একটি বিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যা পড়ানোর কাজে যোগ দিয়েছিলেন। কলকাতায় এসে বাংলা ও বাঙালিকে ভালোবেসে ফেলেন পিয়ার্সন। তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ফলে তাঁর কাজ চলে যায়। আবার ইংলন্ডে ফিরে যান তিনি। এই ঘটনার কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ হয় পিয়ার্সনের। সেইসময় সঙ্গে ছিলেন পিয়ার্সনের বন্ধু এন্ড্রুজ। কবির আচরণ তাঁদের মুগ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথ দুজনকেই ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ১৯১২-তে সেই ডাকে সাড়া দিয়েই পিয়ার্সনের প্রথম ভারতে আসা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তখন বিদেশেই ছিলেন। পিয়ার্সন আবার ১৯১৩ সালে শান্তিনিকেতন আসেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন এন্ড্রুজ সাহেব। তাঁরা যাচ্ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার পর পিয়ার্সন বলেছিলেন ‘শান্তিনিকেতন আশ্রম থেকে যে শান্তি নিয়ে যাচ্ছি তা আমাদের দক্ষিণ আফ্রিকার কাজে সহায় হবে।’ এরপর ১৯১৪ সালে পিয়ারসন শান্তিনিকেতনের কাজে যোগ দেন। সে এক অন্য শান্তিনিকেতন! ১৯১৬ সালে জাপান প্রবাসের সময় পিয়ার্সন ‘শান্তিনিকেতন স্মৃতি’ বইটি লেখেন। এই বইয়ের প্রতিটি অক্ষরে রয়েছে পুরোনো শান্তিনিকেতনের সুবাস। বিশ্বভারতীর গড়ে ওঠার সোপান আবছা হয়ে আঁকা রয়েছে অক্ষরগুলিতে। আজ সেই স্মৃতিচারণার গল্প বলি।
পিয়ার্সন যখন প্রথম শান্তিনিকেতনে আসেন তখন আশ্রম চারখণ্ড উঁচু জমির উপর ছিল। দূর থেকে আশ্রমের আলো দেখা যেত। বিদ্যালয়ের চারিদিকে ছিল সারি সারি গাছ। চাঁদনি রাতে ওইসব বৃক্ষছায়ায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ একলা এসে দাঁড়াতেন। পিয়ার্সনের প্রথম মনে হয়েছিল তিনি কোনো সাধকের পুণ্যভূমিতে তীর্থযাত্রায় এসেছেন। তখন ছাত্রাবাসের ছাত্ররা রাতের বেলাও রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে ঘুমাতে যেত। পিয়ার্সন স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘প্রত্যেক রাত্রিতে শুতে যাবার আগে তারা কবির রচিত একটি গান গায়। আমরা যে বাড়িতে বসে ছিলাম গানের দল ধীরে ধীরে সে বাড়ির দিকে এগিয়ে এল। তারপর আবার তারা ফিরে গেল। গানের সুর ক্রমশ অস্পষ্ট হতে হতে শেষে একেবারে মিলিয়ে গেল। তারার আলোতে পাহাড়ের উপর যেমন করে ছায়া নামে তেমন করে চারিদিকে নীরবতা নেমে এল। আর সেই নিস্তব্ধতায় আমি যেন উপলব্ধি করলাম, এই জায়গাটির নাম ‘শান্তিনিকেতন’ রাখা হয়েছে কেন।’
সেইসময় শান্তিনিকেতনের ছাত্ররা সাঁওতাল গ্রামে নৈশ বিদ্যালয় তৈরি করেছিল। প্রার্থনা মন্দিরে আলো হাওয়া প্রবেশের কোনো জায়গা ছিল না। ছাত্ররা রঙিন শাল গায়ে জড়িয়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে সহজভাবে বসে প্রার্থনা করত। বোলপুরের ছাত্রদের কণ্ঠে আবৃত্তি কখনও ভোলেননি পিয়ার্সন। রবি ঠাকুরের গানগুলি ছাত্রদের শেখাতেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। একবার শুক্লপক্ষের রাতে ছাত্র ও শিক্ষকরা বিদ্যালয় থেকে একটু দূরে জমায়েত করে অনুষ্ঠান করেছিলেন। পিয়ার্সন সেই আসরে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লন্ডনে তাঁর দেখা হওয়ার গল্প। প্রথমবার শান্তিনিকেতনে আসার পর যখন তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁকে মালা পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ধান, দুর্বা আর একমুঠো গোলাপের পাপড়ি তাঁকে উৎসর্গ করা হয়। এক অধ্যাপক পিয়ার্সনের উদ্দেশ্যে মন্ত্রপাঠ করেছিলেন। এইসব মুহূর্ত বুকের ভিতরে নিয়ে তিনি যখন ফিরছিলেন তিনি তখন বুঝতে পারছিলেন, এই আশ্রমে থেকেই তিনি বাংলাদেশের হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারবেন। তাই বার বার পিয়ার্সনকে ফিরে ফিরে আসতেই হবে শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীর সঙ্গে তাঁর যেন অন্তরের আশ্চর্য টান!
পিয়ার্সনের সময় থেকেই শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের পরীক্ষা পাসের ভয় ছিল না। শিশুর প্রবণতা অনুযায়ী তাকে বিকশিত হবার সুযোগ দেওয়া হত। ছেলেরা নিজেদের বিচার নিজেরাই করবে। তাই ছাত্রদের একটি নিজস্ব বিচারসভা বসত। একবার ছাত্র আর অধ্যাপকরা মিলিতভাবে ভৃত্যদের সাহায্য ছাড়াই আশ্রমের সব কাজ নিজেরাই করেছিল। প্রতিমাসে নানা পত্রিকা প্রকাশিত হত। লেখা ও আঁকা দুইই ছাত্রদের নিজস্ব। মাঝে মাঝে সকলে বেরিয়ে পড়ত দল বেঁধে। সে এক অন্য আনন্দ। পিয়ার্সন যে সময়কার কথা বলেছেন, তখন ছাত্রসংখ্যা ছিল ১৫০ আর শিক্ষক সংখ্যা ২০। ছয় থেকে আঠারো বছরের ছাত্রদের দায়িত্ব ভাগ করা ছিল অধ্যাপকদের মধ্যে। যেকোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের ছাত্রের জন্য ছিল অবারিত দ্বার। বিনা বেতনেও অনেকে লেখাপড়া করত। রবীন্দ্রনাথ নিজে অনেক ব্যয়ভার বহন করতেন। পিয়ার্সন লিখেছেন ছাত্র ও শিক্ষকের অনাড়ম্বর জীবন যাপনের কথা। পিয়ার্সনের উদ্যোগে একটি হসপিটল তৈরি হয়েছিল সেখানে। পড়ে পিয়ার্সনের নামেই তার নামকরণ হয়।
বিদ্যালয়ের তখনকার কার্যসূচির কথাও লিখেছিলেন পিয়ার্সন। সকালে বৈতালিকের দল রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে সকলের ঘুম ভাঙাত। তারপর স্নান, প্রার্থনা, মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস শুরু হত। খোলা মাঠে, দালানের খোলা বারান্দায় পড়া চলত। তারপর খাওয়ার শেষে যে যার ঘরে বসে লেখাপড়া করে বিকেলের রোদ পড়লে খেলা!সন্ধ্যাবেলা আশ্রমের ভৃত্য ও গ্রামবাসীদের জন্য নৈশ বিদ্যায় চালাত ছাত্ররা। রাতে খাবার আগে একঘণ্টা ছিল বিনোদন পর্ব। তারপর সাড়ে নটার মধ্যে ঘুম আর নৈঃশব্দ্য। কখনও কখনও আসর বসলে নৈশ রাত পর্যন্ত ভেসে আসত গান। বিদ্যালয়ে কোনো প্রধানশিক্ষক ছিল না। একটি কর্মসমিতি ছিল। পড়ার বিষয়ে অভিনয় গুরুত্ব পেত। ছাত্রদের উপরে ছিল অগাধ বিশ্বাস। পরীক্ষার সময় কোনো পরিদর্শক থাকত না। পিয়ার্সন লিখেছেন, ‘পরীক্ষার সময় ছাত্রদের সততার উপর আস্থা রেখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। নানা অবস্থায় বসে ছাত্রদের পরীক্ষার উত্তর লিখতে দেখা যায়। কেউ আবার উঁচু গাছের সংযোগস্থলের মতো অগম্য স্থানও বেছে নেয়।’ ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুন্দর। বিদ্যালয়ের সব স্তরেই মাতৃভাষায় শিক্ষাদান করা হত। সহযোগী ভাষা হিসেবে ইংরেজিও গুরুত্ব পেত খুব। হাতে কলমে শিক্ষার পাশাপাশি ম্যাজিক লন্ঠনের সাহায্যে স্লাইড দেখিয়ে পড়ানোর আধুনিক পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হত। গল্প বলার মাধ্যমে পড়ানো গুরুত্ব পেত। নাটক, নাটকের মহড়া, রাত জেগে অসুস্থদের সেবা, কর্মতৎপরতা — সবদিকেই ছাত্রদের তুলনা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আশ্রমের বটবৃক্ষ। তাঁর ছায়ায় একটু একটু করে গড়ে উঠছিল বিশ্বভারতী। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রে ছিল আধ্যাত্মিকতা। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন এমন একটি বিদ্যালয় স্থাপন করতে যা একাধারে হবে বাসগৃহ এবং দেবমন্দির, যেখানে অধ্যাপনা পূজারত জীবনযাত্রারই অঙ্গ।
পিয়ার্সন এমন অধ্যাপনাই করেছিলেন রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে। যখন যখন দূরে থেকেছেন আশ্রম থেকে, তখনও তাঁর মন চলে যেত বোলপুরের সেই উদার প্রান্তরে।
পিয়ার্সনের কথাতেই —
“সেই উদার নক্ষত্রখচিত আকাশের নীচে, সেই দিগন্তপ্রসার উন্মুক্ত প্রান্তরের মধ্যে, যেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন পৃথিবীর শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানেই মানুষের অশান্ত আত্মার নীড় রচিত হয়ে আছে।”
সহায়ক গ্রন্থঃ
শান্তিনিকেতন স্মৃতি, উইলিয়ম পিয়ার্সন
