মৃদু ঠেলাতেই কাজ হয়, সরকার মারছে ষাঁড়ের গুঁতো

নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ রিচার্ড থেলারের তত্ত্ব তাই বলছে

হরিণশাবকের যখন প্রথম শিং বের হয়, তখন সে চতুর্দিকে ক্রমাগত ঢুঁসিয়ে বেরায়। আর কীভাবেই বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে সে জানাবে যে তার কাছে নতুন এক অস্ত্র এসেছে!‌ ‌ভারত সরকারের আধার নিয়ে ঠিক একই অবস্থা। রান্নার গ্যাস, ইন্টারনেট বা মোবাইলের সংযোগ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে সর্বত্র আধার নম্বর যুক্ত করার জন্য আমরা সবাই অহরহ বার্তা পাচ্ছি।

বার্তার সুরটা এমন নয় যে আধার যুক্ত করলে আমার কোনও বাড়তি সুবিধা বা সুরক্ষা মিলবে, সুরটা স্পষ্টতই হুমকির:‌ আধার যুক্ত না করলে ‘ব্লক’ করে দেওয়া হবে আমাকে; নির্দিষ্ট কোনও সুবিধা থেকে আমাকে বঞ্চিত করে দেওয়া হবে। এভাবে কোনও নাগরিককে তার প্রাপ্য কিছু থেকে সরকার বা সরকারি সংস্থা (‌যেমন ইন্ডিয়ান অয়েল)‌ বা সরকারি নিয়ামক সংস্থার বিধিবদ্ধ আওতায় থাকা বেসরকারি সংস্থা (‌যেমন টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অব ইন্ডিয়া বা ট্রাই–এর আওতায় থাকা মোবাইল পরিষেবা কোম্পানিগুলি)‌ বঞ্চিত করতে পারে কিনা সেটা একটা গুরুতর প্রশ্ন। এই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আর একটি প্রশ্ন হল, দু পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই চলে আসা কোনও বাণিজ্যিক চুক্তির শর্ত একতরফাভাবে পরবর্তী কালে বদলে দেওয়া যায় কিনা। ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খোলার সময়ে আমার আধার কার্ড ছিল না; আধার কার্ডের জন্মই হয়নি তখনও। এতদিন আমাকে পরিষেবা দিয়ে এবং আমার গচ্ছিত টাকা দিয়ে ব্যবসা করে এখন ব্যাঙ্ক বলছে আধার না দিলে আগামীকাল থেকে থেকে তোমাকে চিনি না বাপু, তোমার সঙ্গে কারবার বন্ধ আমার। এটা বলা অনৈতিক তো বটেই, বেআইনিও কি? সেই প্রশ্নও আদালতে বিচারাধীন। বিষয়গুলির গুরুত্ব অনুধাবন করেই সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন করছে মামালার নিষ্পত্তির জন্য। তার আগেই গ্রাহকদের প্রতি ওই হুমকির সুর ত্যাগ করার নির্দেশে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

আধার বস্তুটা আসলে কার জন্য?
এই গোড়ার প্রশ্নটারই জবাব আমাদের সমাজের কাছে অস্পষ্ট। সরকারের তরফ থেকেও না এখন, না অতীতে ইউপিএ–র আমলে এর স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পশ্চিমী দুনিয়ার উন্নত অর্থনীতির দেশে সরকারের কাছে নাগরিকদের (‌এবং অনাগরিক কিন্তু দেশে বসবাসকারীদের অন্যদেরও)‌ একটা সম্পূর্ণ তথ্যভাণ্ডার থাকে। সেখানে প্রতিটি বাসিন্দার থাকে একটি অদ্বিতীয় বা ইউনিক নম্বর। নম্বর দিয়ে মানুষকে দেগে দেওয়া নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে লাভ নেই। যুক্তির বিচারে নম্বরই ঠিক, কারণ প্রতিটি নম্বর ইউনিক। নামের ক্ষেত্রে বাপের নাম, ঠিকানা ইত্যাদি কাছাকাছি বা এক হলে ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারকে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারী বলে ভেবে থানায় হাজিরা দিতে বলার ঘটনা অতি সম্প্রতিই ঘটেছে। ইউনিক নম্বর দিয়ে প্রতিটি বাসিন্দাকে চিহ্নিত করা হলে সেই ভুল হয় না। বরং নম্বরটা একবার জানা গেলে তার সম্পর্কে সব জানা হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের এই আধারের তুল্য সোশ্যাল সিকিওরিটি নম্বর বহু দিন ধরে চালু। ফলে সে দেশে বন্দুকবাজ আততায়ীর পরিচয় একবার জানা গেলে তার আজন্মকালের ঠিকুজি কুলুজি, ঠিকানা, লেখাপড়া, বিয়ে, চাকরি, অপরাধে জড়িত থাকার ইতিহাস ইত্যাদি সমস্ত তথ্য নিমেষে পুলিশের হাতের মুঠোয় চলে আসে।

এই ধরনের ব্যবস্থার উদ্দেশ্য দ্বিমুখী। আমার সব কিছু যেমন আমি রাষ্ট্রকে জানিয়ে দিচ্ছি বা জানিয়ে দিতে হচ্ছে, তেমনই আমার প্রতিটি সহনাগরিককেও তা করতে হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি পরিসরের অধিকারের একাংশ রাষ্ট্রের কাছে আমি সমর্পণ করলাম বটে, বিনিময়ে পেলাম এই ভরসা যে রাষ্ট্র তার কাছে থাকা ওই তথ্য আমার সুরক্ষার জন্যও ব্যবহার করবে। ওই বন্দুকবাজ সন্ত্রাসবাদীর হাত থেকে আমাকে নিরাপত্তা দেবে, আমার কাজ না থাকলে বা আমি অভুক্ত ভবঘুরে হলে আমাকে আশ্রয় দেবে, ফুড স্ট্যাম্প (‌যার বিনিময়ে হতদরিদ্রের খাদ্য মেলে)‌ দেবে।

আমাদের এখানে কখনও কি সরকার বলেছে আধার কার্ড থাকলে আমি কি সুবিধা পাব? কেন আমাকে এটা করাতে হবে? সাত আট বছর ধরে বলা হচ্ছে আমাকে এটা করতেই হবে এটা আমার অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু কোথাও কি বলা হচ্ছে এই কর্তব্য পালনের বিনিময়ে কোন অধিকার আমি ভোগ করব? আধার না থাকলে কী কী ব্লক হয়ে যাবে তার তালিকা দীর্ঘ এবং দিনে কতবার আপনি পরিষেবা বন্ধের হুমকি পাচ্ছেন তার ইয়ত্তা নেই। একটাও কি বার্তা পেয়েছেন যে আধার থাকলে কোন কোন সম্ভাবনা আপনার সামনে খুলে যাবে? আমি তো পাইনি। 

সাদর মৃদু ঠেলা বনাম ষাঁড়ের গুঁতো
এমন কিন্তু নয় যে, আধারের কোনও সুবিধা নাগরিকের নেই বা থাকতে পারে না। তবু অধিকারের কথা না বলে, সুবিধার কথা না বলে বারবার হুমকির সুরে কর্তব্য পালনের কথা বলার একটাই ব্যাখ্যা থাকতে পারে:‌ অভিভাবকসুলভ মৃদু ঠেলা যে পাগলা ষাঁড়ের গুঁতোর চেয়ে বেশি কার্যকর সেই সত্যটা সরকারের কর্তাদের জানা নেই। আসলে লেখাপড়া করে জানা ব্যাপারটা সম্বন্ধে সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের কিঞ্চিৎ যেন অবজ্ঞাই প্রকাশ পায় যখন তাঁরা বলেন, হার্ভার্ড নয় হার্ড ওয়ার্ক (‌কঠোর পরিশ্রম)‌ তাঁদের কাছে বেশি বরণীয়। যেন কঠোর পরিশ্রম মানে শুধু গোপালন এবং কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কেউ বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পান। ঘটনাচক্রে ওই হার্ভার্ডেরই এক অর্থনীতিবিদ সরকারের সঙ্গে নাগরিকের (‌বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার আওতায় থাকা সাধারণ মানুষের)‌ সম্পর্কে মৃদু ঠেলা বনাম ষাঁড়ের গুঁতো নিয়ে বহু দিন ধরে চর্চা করছেন; ২০০৮ সালেই Nudge ‌বা মৃদু ঠেলা নামে এই বিষয়ে লেখা তাঁর বইও বেরিয়ে গিয়েছে। রিচার্ড থেলার নামে ওই অধ্যাপক এই বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ফলে নানা কাজে ব্যস্ত যে রাজনীতিকরে খবরের কাগজ ছাড়া আর কিছু পড়ার সময় পান না, তাঁদেরও বিষয়টা না জানার কথা নয়। থেলার এবং তাঁর সহযোগীদের ৩০ বছরের গবেষণার ফল হল, কোনও মানুষকে দিয়ে কোনও কাজ করাতে হলে সস্নেহ মৃদু ঠেলাই শ্রেষ্ঠ পথ। নির্বিকল্পভাবে মানুষের সামনে বিভিন্ন চয়নের (‌পছন্দের)‌ সুযোগ করে দিলেই সে যে নিজের পক্ষে সেরা বিকল্পটা বেছে নেবে বা নিতে পারবে এমন নয়। আবার ধমক চমক দিয়ে হুমকি দিয়েও যে কাজ হয়, তাও নয়।

সরকারের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক কেমন হবে তার দুটি পরস্পর বিরোধী ভাবনা হল:‌‌ (‌১)‌ সরকারই আদর্শ নাগরিকের জীবনের এবং দেশের অর্থনীতির সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে এবং (‌২)‌ সরকারের ভূমিকা হবে ন্যূনতম, নাগরিককে যে কোনও কিছু বেছে নেওয়ার সর্বোচ্চ স্বাধীনতাই শেষ কথা। কেন্দ্রের বর্তমান সরকার অর্থনীতির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পথের অনুসারী। কিন্তু আধারের ক্ষেত্রে বা নাগরিকের জীবনের উপরের হস্তক্ষেপের প্রশ্নে প্রথম পথের অনুসারী। এই দুইয়ের মধ্যে যে মৌলিক অসঙ্গতি আছে তার প্রতিই বিজ্ঞজনেরা বারবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। নাগরিককে এবং মোটের উপর অর্থনীতিতে চয়নের স্বাধীনতা দিয়েও যে নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাসস্থান, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে সরকারের প্রচুর কর্তব্য আছে, সেই মধ্যপন্থার কথা অমর্ত্য সেনরা দীর্ঘ দিন ধরে বলে আসছেন। সেই বিষয়ে বর্তমান সরকার যথেষ্ট যত্নশীল নয় এমন মন্তব্য করার পর থেকেই তাঁরা সরকারের উপহাসের পাত্র এবং হার্ভার্ড বনাম হার্ড ওয়ার্ক তত্ত্বের জন্ম!‌

যাই হোক ওই হার্ভার্ডের রিচার্ড থেলারের তিন দশকের হার্ড ওয়ার্কের ফল হল Libertarian Paternalism তত্ত্ব, ‌বাংলায় বলা যেতে পারে উদারপন্থী অভিভাবকত্ব। এর মোদ্দা কথা, শিক্ষিত, পরিণত, অভিজ্ঞ মানুষও সব সময়ে অনেক চয়নের সুযোগ থাকলেই যে নিজের পক্ষে সেরাটা বেছে নিতে পারবে এমন নয়। রাষ্ট্রের কর্তব্য হল এমনভাবে চয়নগুলো সাজিয়ে দেওয়া যাতে নাগরিক তার পক্ষে সেরাটা বেছে নিতে প্রণোদিত হয়। ঠিক যেমন প্রাইমারি স্কুলের টিফিন বিক্রির দোকানে সবচেয়ে হাতের সামনে কলা আর ডিমটা রেখে একটু ভেতরে চিপস আর চানাচুর রাখলে দেখা যায় বাচ্চারা একই পয়সা দিয়ে স্বাস্থ্যকর কলা–ডিমই বেশি খাচ্ছে (‌আগে সামনে থাকা চিপস–চানাচুর বেশি খেত)‌। আধার কার্ড নিয়েও আমাদের সরকার যদি এর সুফল আর সুবিধার দিকটা নাগরিকের সামনে তুলে ধরত, তবে এত বিরোধিতা হত না, লোকে আপনা থেকেই স্বেচ্ছায় এটাকে অনেক সহজে বেছে নিত— এটাই হল থেলারের তত্ত্বমাফিক সিদ্ধান্ত। আমাদের সরল বুদ্ধিও একই কথা বলে। কিন্তু আমাদের সরকার যে পাগলা ষাঁড়ের মতো গুঁতিয়ে বেড়াতে বেশি স্বচ্ছন্দ!‌‌

Developed by DXDasia