বেলঘরিয়ার ইতিহাসে যা লেখা নেই – ৪

দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন মানত করতে হাজির হতেন পঞ্চাননতলায়

সময়টা ২০১৬ সালের মার্চ-এপ্রিল। তদ্দিনে বই লেখার কাজ শেষ। পাণ্ডুলিপিও জমা পড়ে গেছে প্রকাশকের কাছে, প্রকাশিত হবে দু-এক মাসের মধ্যেই। সেই সময়টায়, যখন ভোরবেলা রাস্তায় বেরোলে শীত করত অল্প-অল্প, আর বেলা বাড়লেই রোদের আনাগোনা – ঠিক করেছিলাম, বেলঘরিয়ার ইতিহাস নিয়ে একটা ভিডিও বানাব। সাধারণ ডকুমেন্টরি নয়। চাইলে ডকুমেন্টরি বানানো যেত যে-কোনো সময়েই, কারণ আমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন তথ্য-ভিডিও ক্লিপিংস-ছবি সংগ্রহ করে রাখছিলাম – যদি হঠাৎ কাজে লাগে কখনও। কিন্তু আমি চাইছিলাম এমন একটা ভিডিও হবে – যা গতানুগতিক বর্ণনার থেকে আলাদা। কবিতা দিয়ে ইতিহাসকে উপস্থাপিত করা। এমনিতেই আঞ্চলিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে, বাংলায় ডকুমেন্টরির সংখ্যা নগণ্য। আর এভাবে কবিতা ও ইতিহাস মিলিয়ে কোনো জনপদকে তুলে ধরা – অন্যান্য জায়গার কথা জানি না, তবে বাংলায় এমন আগে হয়নি, নিশ্চিত। তার ওপর, ভেবেছিলাম ‘বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে’ বইয়ের ট্রেলারও হবে ওই ভিডিও। এর আগে, বাংলাভাষার কোনো বই নিয়েও কি ভিডিও ট্রেলার তৈরি করেছে কেউ?

সেইমতো, মার্চ-এপ্রিলে ভোর হলেই বেরিয়ে পড়তাম আমরা তিন-চারজন বন্ধু। সঙ্গে হ্যান্ডিক্যাম, ট্রাইপড। ঘুরে-ঘুরে বিভিন্ন জায়গা, বিভিন্ন দৃশ্য শ্যুট করা। অবশ্যই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে। তার কিছুদিন পর, এডিটিং। তৈরি হল ভিডিও। নিচে রইল তার ইউটিউব ভিডিও – 

যাইহোক, ইতিহাসের কথায় ফিরি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে ছড়া বা প্রবাদ শুনতে পাওয়া যায় প্রায়ই। ইতিহাস ঘাঁটতে বসলে সহজেই খুঁজে পাব সেসব ছড়া। সাধারণত কোনো অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য বা মানুষজনের স্বভাব ফুটিয়ে তোলা হত ওই ছড়াগুলির মাধ্যমে। বাইরের লোকেরাই সাধারণত মুখে-মুখে তৈরি করতেন সেসব ছড়া। বেলঘরিয়া বা ‘বেলঘর’ যে তত পুরনো জনপদ নয়, তা আগের পর্বেই লিখেছি। তবু, এই বেলঘর নিয়েও প্রচলিত ছিল একটি ছড়া – 

‘বাগান পুকুর বাবাঠাকুরের বর
এই তিন নিয়ে বেলঘর।’

কেন এমন ছড়া? কৌতূহলী হয়ে ডুব দিয়েছিলাম খোঁজে। আসলে, আঠেরো-উনিশ শতকে বেলঘরিয়ায় ছিল প্রচুর বাগানবাড়ি। আশেপাশের বিভিন্ন বড়লোকেরা আমোদ-ফুর্তির জন্য এখানে নিজেদের বাগানবাড়ি তৈরি করেছিল। আর, গ্রামে পুকুরও ছিল প্রচুর। এখন না-হয় সেসবের বেশিরভাগই বুজিয়ে বাড়ি উঠে গেছে, কিন্তু আজ থেকে এক-দেড়শো বছর আগে জলাজমি আর পুকুরের অভাব ছিল না। আর, ‘বাবাঠাকুর’ হলেন পঞ্চাননতলার শিব, বাবা পঞ্চানন। ‘বড়ঠাকুর’ নামেও পরিচিত তিনি। বেলঘরিয়ার সবচেয়ে পুরনো মন্দির এই পঞ্চাননতলাতেই। এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসতেন এখানে পুজো দিতে, মানত করতে। এমনকি, আগেকার দিনে উড়িষ্যার কেওনঝড়ের রাজা, নাটোরের রাজাও এখানে মানত করেছিলেন। এখনও, অশ্বত্থগাছের ডালে দেখতে পাওয়া যায় অনেক মাটির ঘোড়া, ঢিল বাঁধা। এভাবেই, লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতির এক ঐতিহ্য প্রাচীনকাল থেকেই নিজের বুকে পুষে রেখেছে বেলঘরিয়া। প্রবাদও অস্বীকার করতে পারেনি তা।

লোকবিশ্বাসের আরেক ঐতিহাসিক তথ্য পেয়েছিলাম জোড়া শিবমন্দিরের ক্ষেত্রেও। রূপমন্দির সিনেমা হলের(কয়েক মাস আগে, পুরনো এই হল ভেঙে চালু করা হয়েছে শপিং মল। যেমন বছর তিনেক আগে ভাঙা পড়েছে বিভা-ও। নগরায়ণ কীভাবে ঐতিহ্যকে গ্রাস করে, তার সার্থক উদাহরণ হতে পারে এগুলো) ঠিক পিছনে যে দুটি শিবমন্দির, রায়চৌধুরীদের, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আঠেরো শতকেই। বয়স প্রায় আড়াইশো হতে চলল। রেলপথ চালু হওয়ার পর, লোকজন ট্রেনে চেপে ওই মন্দিরে পুজো দিতে আসত। তখন রেললাইন ঘেঁষে, মন্দিরের সামনে ছিল তিনটে পুকুর। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ওই তিনটে পুকুরে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে তবেই শিবমন্দিরে পুজো দিতে যেতে হত। এখন অবশ্য দুটো পুকুর বুজিয়ে বাড়ি উঠে গেছে। যেটা অবশিষ্ট আছে এখনও, অপরিষ্কার। শুনেছি, সেটাও বুজিয়ে ফেলার কথা উঠেছিল একসময়। স্থানীয় এক বৃদ্ধা প্রতিবাদ করে, জনমত জোগাড় করে কোনোমতে বাঁচিয়েছেন সেটি।

মাঝেমধ্যে চিন্তা হয় – এই যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে চারপাশ, পুরনো কোনো চিহ্নই কি ধরে রাখতে পারবে বেলঘরিয়া? চব্বিশ বছর বয়সে, ছোটবেলার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে নিজেই খেই হারিয়ে ফেলি একেকসময়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে, কোনো তরুণ অথবা তরুণী যদি কৌতূহলবশতও জানতে চায় বেলঘরিয়ার পুরনো দিনগুলোর গল্প, তাদের জন্যেই বইটা লেখা। ভিডিও তৈরি করা। যেন সেদিনের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে, উন্নয়ন আর আভিজাত্যের ঝলকানি সত্ত্বেও তারা বুঝতে পারে, নেহাত কলকাতার সম্প্রসারণ ছিল না এই জনপদ। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও ছিল কখনও।

পঞ্চাশ বছর পরের সেই তরুণ-তরুণী যদি বেলঘরিয়ার ইতিহাস নিয়ে লিখতে চায়, আজকের দিনগুলোর কথাও লেখে যেন। সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আর কিছু নয়…

(ক্রমশ)

Developed by DXDasia