ম্যানগ্রোভ বিস্তারে ঘুরে দাঁড়াবে উপকূলের পরিস্থিতি, ইতিবাচক পদক্ষেপ রাজ্য বনবিভাগের

রাজ্য বনবিভাগের ম‍্যানগ্রোভ-বিপ্লব নিয়ে আশাবাদী সমুদ্র লাগোয়া গ্রামবাসীরাও

নিছক সৌন্দর্য নয়, সুন্দরবন সহ উপকূলবর্তী জেলাগুলির প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হল ম্যানগ্রোভ অরণ্য (Mangrove)। ২০২০ সালে আমফান, ২০২১ এর ইয়াসের মতো ঝড়ে বিপুল ক্ষতির হাত থেকে বাংলাকে বাঁচানোর পরই মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সিদ্ধান্ত নেন, বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ অঞ্চলকে আরও বৃদ্ধি করা হবে৷ সেই সময়েই তিনি ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রকৃতিই রক্ষক’ নামে একটি প্রকল্পের কথা বলেন, পাশাপাশি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জোরও দেন।

মুখ্যমন্ত্রীর এই ইচ্ছাকে পরিপূরণের লক্ষ্যে গত দু’বছর ধরে দুই ২৪ পরগণা ও পূর্ব মেদিনীপুরে এই ম‍্যানগ্রোভ লাগানোর কাজ চলছে জোরকদমে। রাজ্য বন বিভাগের (WestBengal Forest Department) তরফে জানানো হয়েছে, এই পর্যন্ত নতুন রোপণ করা ম্যানগ্রোভের সংখ্যাটা আনুমানিক প্রায় ২০ কোটিরও বেশি। রাজ্যের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জানিয়েছেন, “এই এতো ম্যানগ্রোভ আমরা কী ভাবে রোপণ করলাম সেই অভিযান দেশের বাকি রাজ্যগুলিকেও বাংলাই শেখাবে। অন্ধ্র, উড়িষ্যা, গোয়ার মতো উপকূলীয় রাজ্যগুলিকে শেখাবেন বাংলার বন দফতরের আধিকারিকরা।” পাশাপাশি থাকবেন বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিরাও।

মুখ্যমন্ত্রীর এই ইচ্ছাকে পরিপূরণের লক্ষ্যে গত দু’বছর ধরে দুই ২৪ পরগণা ও পূর্ব মেদিনীপুরে এই ম্যা নগ্রোভ লাগানোর কাজ চলছে জোরকদমে। রাজ্য বন বিভাগের তরফে জানানো হয়েছে, এই পর্যন্ত নতুন রোপণ করা ম্যানগ্রোভের সংখ্যাটা আনুমানিক প্রায় ২০ কোটিরও বেশি।

যেহেতু পশ্চিমবঙ্গের উপকূলের মানুষের প্রধান জীবিকা বলতে মাছচাষ, তাই এ যাবৎ বহুক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে বনভূমি ধ্বংস করে ভেড়ি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এ কাজ যে অচিরেই বিপদ দেকে আনছে তা ভুলে গিয়েছিলেন অনেকেই। বিগত কয়েক বছরের প্রতিকূল আবহাওয়ায় সিঁদুরে মেঘ ঘনাতেই নড়েচড়ে বসেছেন আধিকারিকরা। তৈরি হয়েছে নতুন অনেক আইনও। যার জেরে ভবিষ্যতে অরণ্য ধ্বংস করে ব্যাবসায়িক পদক্ষেপ নেওয়া হলে কড়া পদক্ষেপের দিকে এগোবে সরকার।

একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হয়। কমিটির কথা মতোই, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পেয়ারা বাইন, কালো বাইন, বকুল কাঁকড়া, গর্জন, হরগোজা, খলসি, কেওড়া প্রভৃতি জাতের ম‍্যানগ্রোভ লাগানোর দিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই প্রজাতির গাছগুলির লড়াইয়ের ক্ষমতা সবথেকে বেশি থাকে বলেই জানিয়েছেন তাঁরা।

পাশাপাশি আরও একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয় বনদপ্তর। ম‍্যানগ্রোভের অভাব মেটাতে ভাবা হয় নতুন উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির কথা। ঠিক হয়, কয়েকটি জেলার নির্দিষ্ট কেন্দ্রে তৈরি হবে ম‍্যানগ্রোভ চারা। সেইমতো কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে বর্তমানে। ইতিমধ‍্যেই যেসব ম‍্যানগ্রোভ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, তাদের মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য হল, উত্তর ২৪ পরগণায় ২০টি, দক্ষিণ ২৪ পরগণায় ৪০টি এবং পূর্ব মেদিনীপুর-এ ২০টি। যখন যেখানে চটজলদি গাছের চারা প্রয়োজন হবে, এইসব কেন্দ্রগুলি থেকে সেখানে তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে রাজ্য বনদপ্তর।

সম্প্রতি রাজ‍্যের বনমন্ত্রী জ‍্যোতিপ্রিয় মল্লিকও‍ অত‍্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, “এই ম‍্যানগ্রোভ বিপ্লব সুন্দরবনের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হবে, সুন্দরবনের সম্পদকে আরও সুরক্ষিত করা।” বনবিভাগের তৎপরতায় যেমন ইতিবাচক ইঙ্গিত রয়েছে তেমনই প্রশ্ন উঠছে, এতদিনের পরিস্থিতির বেহাল দশা নিয়েও। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ দিয়েই যে কেবল দায় মিটে যায় না, একথা বুঝে উঠতে কেন এতোটা সময় লেগে গেল সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। যদিও এসব সমালোচনায় কান না দিয়ে কাজেই গুরুত্ব দিচ্ছেন রাজ্য বন বিভাগ। উপকূলবর্তী এলাকায় বিভিন্ন ব্লকের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে এই ম্যানগ্রোভ রোপণের কাজ করছে তারা। শুধুমাত্র ম্যানগ্রোভ রোপণ করাই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতাও যাতে বৃদ্ধি পায়, সেদিকেও নজর দিচ্ছে পরিবেশ দফতর। এছাড়াও চারা পোঁতার পরে সারা বছর ধরেই ওই সব ম্যানগ্রোভ পর্যবেক্ষণ করছে তারা। এমনকি ম্যানগ্রোভ নিধন করে মেছো ভেড়ি বা বসতি যাতে কোনও ভাবেই গড়ে উঠতে না-পারে, সে-দিকেও কড়া নজর রাখা হবে বলে জানিয়েছে রাজ্য বন বিভাগ।

উল্লেখ্য, বকখালির হেনরি আইল‍্যান্ডে, চার হেক্টর জমিতে বিশাল চত্বরে বেড়ে উঠেছে প্রায় চার লক্ষ ম‍্যানগ্রোভ চারাগাছ। দুজন বনকর্মী দিনরাত ব‍্যস্ত আছেন রক্ষণাবেক্ষণের কাজে। গত কয়েক বছরের আচমকা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে বকখালির বেশকিছু অঞ্চল, কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের মানুষও। তাই ম্যানগ্রোভ বিপ্লব যে আগামীতে যে কোনও বিপর্যয় মোকাবিলা করতে চমকপ্রদ পদক্ষেপ নেবে সে বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি নিশ্চিত এই অঞ্চলের বাসিন্দারাও। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলেও মনে করছেন উপকূলবাসীরা।

সূত্র – বন দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

Developed by DXDasia