প্রেসিডেন্সির জন্য গান গাইলেন বিবেক কুমার

তাঁর মাতৃভাষা নয়। তবু গানে গানে বাংলাভাষাকে শ্রদ্ধা

আইএএসদের অনেকেরই কিছু বাড়তি দক্ষতা থাকে। থাকে বলেই দেখা যায়, আজ যিনি বিদ্যুৎ দফতর সামলাচ্ছেন, কাল তিনি দেখভাল করছেন নদীবাঁধ। পরশু হয়তো তাঁকেই দেখা যাবে কৃষি দফতরে বা পশুপালন দফতরে বদলি হয়ে যেতে। সে কথাটাই নতুন করে মনে পড়িয়ে দিলেন উচ্চশিক্ষা দফতরের সচিব বিবেক কুমার। দফতর বদল দিয়ে নয়, বিবেক কথাটা মনে করিয়ে দিলেন গান গেয়ে।

প্রেসিডেন্সির দ্বিশতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে বিবেক কুমারের গাওয়া থিম সং

আমরা এর আগে অনিতা অগ্নিহোত্রীর মতো লেখক, প্রসাদরঞ্জন রায়ের মতো প্রাবন্ধিক আইএএস দেখেছি। সুখবিলাস বর্মার মতো গায়ক দেখেছি। তরুণ দত্তের মতো বইপোকা দেখেছি, কবি দেখেছি, বিদ্রোহী-পণ্ডিত অর্কপ্রভ দেবকেও দেখেছি। 

গুণী আইএএসদের যে কয়েক জনের নাম করা হল, তার বাইরে, মানে নাম করা হল না, তাঁদের সংখ্যাই অবশ্য বহুগুণ বেশি। আর এটাও ঠিক, এঁরা সবাই বাঙালি। এই খানেই বিবেক আলাদা। ঠিক যখন বাইরের ছাত্রছাত্রীদের বাংলা পড়া নিয়ে রাজ্যে বিতর্ক চলছে, তখন রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতরের সচিব বিবেক কুমারের এই বাংলা গান গাওয়া, এক অন্য ভাষা-ভালোবাসার কথা বলে। ইতিহাসটা এরকম। ২০১৭-য় ২০০ বছর পূর্তি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের। ফলে দরকার হয়ে পড়ল প্রেসিডেন্সি নিয়ে একটা গান লেখার। যাকে বলা হয় থিম সং। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশিষ্ট প্রাক্তনী, লেখক ও ইংরাজির শিক্ষক ডঃ শীর্ষেন্দু চক্রবর্তী-কে বাংলা ও ইংরাজি উভয় ভাষাতেই এই গান লেখার দায়িত্ব দেয়। গান লেখা সম্পূর্ণ হওয়ার পর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা ছিল বিশিষ্ট কোনও গায়ক এই গানের সুর তৈরি করবেন, এবং গাইবেন।

কিন্তু দুটি সমস্যা দেখা দিল। যে সুরকারকে বাছা হল, তিনি বললেন, তাঁকে লিরিক পরিবর্তনের স্বাধীনতা দিতে হবে এবং, তিনি যে অর্থ  চাইলেন সেটাও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই কাজের জন্য বরাদ্দ অর্থের তুলনায় অনেক বেশি।

অনুষ্ঠানসূচি আগেই ঘোষিত হয়ে যাওয়ায়, গানটি প্রকাশের নির্দিষ্ট দিন ক্রমশ এগিয়ে আসছিল। অথচ কোনও সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি বিবেক কুমারের কানে ঘটনাটি যায়। তিনি একবার লিরিকটি দেখতে চান। তাঁর কাছে ই-মেল মারফত লিরিক পৌঁছোয়। বাকিটা ইতিহাস।

তিরিশ মিনিটের মধ্যেই, বিবেক গানটিতে প্রাথমিক সুরারোপ করেন এবং গেয়ে সেটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ-কে ই-মেল মারফত পাঠান। এটাও জানান যে, এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি অন্য কোনও পেশাদার সুরকার না পাওয়া যায়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসাবশত তিনি নিজেই গানটির সম্পূর্ণভাবে তৈরি করে দিতে প্রস্তুত।

পরবর্তী দু’সপ্তাহের মধ্যেই, গাঁটছড়া বাঁধে বিবেক কুমার ও নীলাঞ্জন নন্দীর। নীলাঞ্জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল গানটির যন্ত্রানুষঙ্গের দায়িত্ব নিতে। ২০১৭ জানুয়ারির এক শনিবারের বিকেলে গানটি রেকর্ড করা হয় কলকাতায়।

গানটির সম্পর্কে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বিবেক বললেন, “আমি গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানতাম। প্রত্যেকের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে যাওয়ার জন্য গানটা সহজ হওয়ার দরকার ছিল; এমন সহজ, যাতে গানটির মাঝামাঝি এসে যিনি শুনবেন তিনিও একসঙ্গে গলা মেলাতে পারবেন। এই কারণেই, আমি খুব সহজ অথচ আকর্ষণীয় সুরের কথা ভেবেছিলাম।  যা পুরো গানে বারবার ফিরে ফিরে ফিরে এসেছে। এটাও আমার মাথায় ছিল, গানটিকে সব অনুষ্ঠানের উপযোগী হতে হবে; মানে সমাবর্তনের শোভাযাত্রার সময়ও গাওয়া যাবে আবার ছাত্রদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও তা বেমানান লাগবে না। প্রেসিডেন্সির ২০০ বছর উপলক্ষে এই সুযোগ পাওয়া আমার কাছে একটা বিরল সম্মান। নিজে প্রেসিডেন্সিতে না পড়লেও, গানটাকে নিজের গান হিসেবেই দেখি। এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটির কাছে এটাই আমার বিনীত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।”

Developed by DXDasia