মুর্শিদাবাদের ছেলে ভাষা শহীদ আবুল বরকত

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেন তিনি

গোটা ভারতবর্ষ যখন সাইমন কমিশনের বিরোধিতায় মত্ত ছিল সেই সময় মুর্শিদাবাদ জেলায়  ১৯২৭ সালের ১৩ জুন (মতান্তরে ১৬ জুন)  ভরতপুর থানার সালারের পাশে বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভাষা শহিদ আবুল বরকত। পাল-সেনযুগের দুটি সমৃদ্ধ গ্রাম সালার বা সাল্য গ্রাম এবং কঙ্কগ্রাম বা কাগ্রামের পাশে একটি চিরসবুজ গ্রাম বাবলা, তার কিছুদূরেই কুলকুল করে বয়ে চলেছে বাবলা নদী। বাবলায় বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত, অধিকাংশ জনই কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। 

তাঁর পিতার নাম ছিল সামসুজ্জোহা এবং মা হাসিনা বিবি। পারিবারিক দিক থেকে সামসুজ্জোহার পরিবার ছিল লম্বা চওড়া চেহারায় উন্নত স্বাস্থ্যের অধিকারী। জানা যায়, সামসুজ্জোহা সাহেবের উচ্চতা ছিল আফগান পাঠানদের মতো, তাই বেশিরভাগ বাড়িতে তাঁকে ঢুকতে হলে মাথা নিচু করে প্রবেশ করতে হত। সেদিক থেকে আবুলও ছিল বেশ লম্বাচওড়া। ছেলেবেলায় তাঁর ডাক নাম ছিল আবাই। শিশু বয়স থেকেই মেধাবী আবুল বরকতের পড়াশোনা শুরু হয় বাবলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আনুমানিকভাবে তিনি ১৯৩৭-৩৮ সালে তালিবপুর হাইস্কুলে ভরতি হন এবং ১৯৪৫ সালে তালিবপুর স্কুল থেকে সসম্মানে মাট্রিক পাশ করেন। স্কুলের পাঠ শেষ করলে তাঁকে ১৯৪৫ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি করা হয় এবং সেখান থেকেই তিনি ১৯৪৭ সালে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন।

এদিকে সারা ভারতীয় উপমহাদেশ তখন ব্যস্ত ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ নিয়ে। র্যা ডক্লিফ লাইনের কাঁটাতার লাগিয়ে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে সীমানা – এই দেশটা আমার, ওই দেশটা তোমার। ১৯৪৭, ১৪ আগস্টের সন্ধ্যার পর রেডিওতে ঘোষণা হচ্ছে মুর্শিদাবাদকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আবার মধ্যরাতে বলা হল মুর্শিদাবাদ ভারতের সাথেই থাকবে। এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে কিশোর আবুল বরকতও। তাঁকে ভারত বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় চলে আসতে হয়। মেধাবী আবুল ঢাকা এসে শুরু করলেন জোরকদমে পড়াশোনা, তার ফলস্বরূপ ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে চতুর্থ স্থান অধিকার করে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর মন উচ্চশিক্ষার দিকে তাঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাই তিনি এম.এ ক্লাসে ভরতি হলেন স্নাতক হওয়ায় পরই।

স্বাধীনতার ও দেশভাগের আগে থেকেই একটা বিষয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অভ্যন্তরে লুকিয়ে ছিল। দেশ স্বাধীন হলে কোন ভাষাটি হবে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা? কংগ্রেসের তরফে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষার করার প্রচেষ্টা জারি রাখা হয়, অন্যদিকে মুসলিম লিগ সওয়াল করে উর্দু ভাষার প্রতি, কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের এই মতের সাথে গান্ধিজি বা জিন্না সাহেব একমত ছিলেন না, তাঁদের দুজনেরই মতামত ছিল প্রতিটি প্রদেশের প্রাদেশিক ভাষার প্রতি, কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ায় পর আর এই মতামত টিকল না। ভারতে যেমন হিন্দিকে নিয়ে রাষ্ট্রভাষা তৈরির খেলা শুরু হল, তাতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি অসন্তোষ উগড়ে দিল তেমনই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্থানের মানুষের বাংলা ভাষার বদলে উর্দু ভাষার ভার চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। তাতে তৎকালীন বুদ্ধিজীবীমহল তাঁদের মাতৃভাষার দাবি নিয়ে পথে নামতে বাধ্য হল, কারণ উর্দুকে জাতীয় ভাষা করলে বাংলাকে অবহেলিত করে রাখা হবে, তাতে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ চাকরির ক্ষেত্রে ও ভাষাগতভাবে এগিয়ে যাবে আর পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ১৯৪৮ সালে গণপরিষদের ভাষাতালিকা থেকে বাংলা গেলে ঢাকাতে বিরাট বিক্ষোভ দেখা যায়। এসময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা চাই – বলে বিক্ষোভ মিছিল করলে মুজিবর রহমান, সওকত আলি প্রমুখদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই বিক্ষোভের রেশ চলতে চলতে ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের ডাক দেয় ছাত্ররা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সরকার ১৪৪ ধারা বহাল রাখলে মানুষ তার বিরুদ্ধে হরতালের ডাক দেয়। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রফিক, সালাম, বরকত প্রমুখরা মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণ পর্যন্ত আর সেখানেই পুলিশের সাথে খণ্ডযুদ্ধ বাঁধে। পুলিশ প্রথমে বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার উপর কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে কিন্তু ব্যারাকের মতো তৈরি মেডিকেল কলেজের ভেতরে পুলিশ ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসের সেল নিয়ে পুলিশের দিকেই ছুঁড়তে থাকে বিক্ষোভরত ছাত্র জনতা, তাতে পুলিশ সাময়িকভাবে পিছিয়ে গেলেও হঠাৎ শুরু করে গুলিবর্ষণ। লম্বা আবুল বরকত, যে এতক্ষণ পুলিশের দিকে বিক্ষোভরত ছিল, পুলিশের দিকে পালটা ইট, কাঁদানেগ্যাস ছোঁড়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢলে পড়লেন। তারপর তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে রাত আটটায় হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয় একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও আত্মীয়পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে। পরেরদিন সন্ধ্যাতে বাবলাতে খবর আসে। পিতা সামসুজ্জোহা এবং মা হাসিনা বিবি প্রচণ্ডভাবে ভেঙে পড়েন।  পিতা সামসুজ্জোহা বারবার বলতে থাকেন – তাহলে পাকিস্তান কি মুসলিমদের জন্য নিরাপদ নয়?

বাবলার মানুষ সেদিন তাদের আবাইকে খুঁজছিল খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, সেই ছোট্টো আবাই যে গ্রামের স্কুলে পড়ার সময় সবাই মন জিতেছিল, সেই আবাই আবাই আজ আকাশের তারা হয়ে গেছে। 

ভাষা আন্দোলনে আত্মদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আবুল বরকতকে ২০০০ সালে একুশে পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়। ঢাকাতে আবুল বরকত সংগ্রহশালা তৈরি করা হয়। মুর্শিদাবাদের বাবলাতেও তৈরি হয় ভাষা দিবস উদযাপনকারী কমিটি, সেখানে প্রতিবছরের মতো এবছরেও ভাষা দিবস উদযাপন হয়ে আসছে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২ টায় মশাল মিছিল করে যার সূচনা হয় বাবলা গ্রামে।

Developed by DXDasia