রূপে মুগ্ধ হয়ে ‘কাঞ্জনজঙ্ঘা’ আঁকলেন উপেন্দ্রকিশোর, যে ছবি পরে অনুপ্রাণিত করবে সত্যজিৎকে

ছবিটি বর্তমানে রায় পরিবারেই সংরক্ষিত আছে

উপেন্দ্রকিশোরের আঁকা মূল রঙিন ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র সাদা-কালো রূপান্তরিত ছবি

ভোরে আর সন্ধ্যায় যখন ঘন গন রোদের রঙ বদলাতে থাকে, তখন হিমালয়ের চেহারাও পলে পলে নূতন হতে থাকে। এই মিছরির কুঁদোর মতো এই আগুনের মতো, এই মুক্তোর মতো, এই গরদের উপর চাঁদির কাজের মতো, এই খড়ির মতো যেন জাদুকরের ভেল্কি। এমনি করে দিনটি কেটে গিয়ে বিকালে আবার সোনার মতো, আগুনের মতো, মানিকের মতো হয়ে পালা শেষ করে। বেগুনি রঙের পাহাড়ের মাথায় সেই মানিকের মতো বরফ। সে যে কি সুন্দর, তার তুলনা কোথাও নাই। রাজরানীর বহুমূল্য পোশাক আর মুকুট তার কাছে লাজে মাথা হেঁট করে।”

দার্জিলিং (Darjeeling) থেকে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ এভাবেই উপেন্দ্রকিশোরকে বিহ্বল করেছিল। শুধু এমন বর্ণনা দিয়ে থেমে থাকেননি তিনি, তেল রঙে এঁকেছিলেন কাঞ্চনজঙ্ঘা (Kanchanjangha)। রঙিন ছবি। সেই  ছবি আবার পরবর্তীতে বিহ্বল করে তুলবে তাঁর পৌত্র ‘মানিক’ ওরফে সত্যজিৎ রায়কে (Satyajit Ray)। ছোট্ট মানিকের ইচ্ছে ছিল ‘ঠাকুরদাদার আঁকা রঙিন কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সামনে থেকে দেখবে। সেই সাধ মেটে সাত বছর বয়সে যখন প্রথমবার দার্জিলিং ঘুরতে যান।

সত্যজিৎ নিজেই লিখেছেন, “কলকাতার বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো আছে ঠাকুরদাদার আঁকা কাঞ্চনজঙ্ঘা। অবশেষে এলগিন ভিলাতে একদিন ভোরবেলা মা ঘুম ভাঙিয়ে দিলেন। ছুটে গেলাম জানালার ধারে। ঠাকুরদাদার ছবিতে ছিল, বরফের ওপর বাঁ দিক থেকে পড়ছে বিকেলের রোদ, আর এখন চোখের সামনে দেখছি ডানদিকে থেকে রং ধরা শুরু হয়েছে। হাঁ করে চেয়ে রইলাম যতক্ষণ না সূর্যের রঙ গোলাপি থেকে সোনালী, সোনালী থেকে রূপালী হয়। এর পর নিজের দেশে আর বাইরে পৃথিবীর বহু দেশে বহু নাম করা সুন্দর দৃশ্য দেখেছি, কিন্তু সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো সুন্দর দৃশ্য আর কোথাও দেখিনি।” সত্যজিতের প্রথম রঙিন সিনেমা এবং নিজের গল্প অবলম্বনে বানানো প্রথম সিনেমা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। ঠাকুরদাদার রঙিন ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ই যে তাঁর মনে প্রথম রং ধরিয়েছিল, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অনেকবারই দার্জিলিঙে গিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। সঙ্গে রাখতেন রং, তুলি। তাঁর দার্জিলিং-ভ্রমণের বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর ছোটো ছেলে সুবিমল রায় ও মেয়ে পুণ্যলতা চক্রবর্তীর লেখায়।

‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমার টাইটেল কার্ড

অনেকবারই দার্জিলিঙে গিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর (Upendrakishore Roy Chowdhury)। ১৯০৪ নাগাদ যখন দার্জিলিঙে গিয়েছিলেন, উঠেছিলেন কার্ট রোডে প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের বাড়ি। সঙ্গে রাখতেন রং, তুলি। প্রকৃতির রূপ বোঝাতে তিনি বেছে নিতেন তেল রং। সেবারের দার্জিলিং-ভ্রমণের বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর ছোটো ছেলে সুবিমল রায় ও মেয়ে পুণ্যলতা চক্রবর্তীর লেখায়। ছবি আঁকিয়ে উপেন্দ্রকিশোরকে স্মৃতিকথায় তুলে এনে পুত্র সুবিমল লিখেছেন—‘ছেলেবেলায় আমরা তাঁর সঙ্গে দার্জিলিং গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম যে বাবা ছবি আঁকতে আঁকতে মধ্যে মধ্যে পিছিয়ে এসে শান্তভাবে ছবিটার দোষ-গুণ দেখছেন, আবার এগিয়ে ছবির কাছে গিয়ে দরকার বুঝে কয়েকটা দাগ বা টান বা একটু তুলির কারুকার্য জুড়ে দিয়ে ছবিটাকে আরও সুন্দর করে তুলছেন। ছবির চেয়ে বাবার সেই চেহারাটাই বেশি মনে পড়ে—কী শান্ত, সজীব আনন্দময় সে চেহারা।’

উপেন্দ্রকিশোর লিখেছেন, ‘তখনও সূর্য ওঠেনি, পুবের আকাশে লাজুক হাসির মতো একটু আলো দেখা দিয়েছে মাত্র। ক্রমে হিমালয়ের মুখ রাঙা হয়ে উঠতে লাগল, ব্যস্ত হয়ে রং ঢেলে তুলি নিয়ে বসলাম, মনে হল কতই কিছু আঁকব।’

তবে ১৯০৪ সালেই তিনি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ এঁকেছিলেন কিনা তা সঠিক ভাবে জানা যায় না। ১৯০৭-৮ নাগাদ আরও দু-একবার সপরিবার দার্জিলিং ভ্রমণের ইঙ্গিত আছে তাঁর ‘দার্জিলিঙের পথে’-র রচনাকালের সূত্রে। জানা যায়, ১৯১৪ সালে শেষবার স্ত্রী বিধুমখী, ছেলে সুবিমল আর মেয়ে শান্তিলতাকে সঙ্গে করে দার্জিলিং গিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। সেবার উঠেছিলেন ড. বিনোদবিহারী সরকারের বাড়ি ‘নর্থ ভিউ’-এ। এই ভ্রমণের স্মৃতিকথা, ‘মেঘের মুলুক’-এ নিজেই লিখেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। লিখেছেন, ‘তখনও সূর্য ওঠেনি, পুবের আকাশে লাজুক হাসির মতো একটু আলো দেখা দিয়েছে মাত্র। ক্রমে হিমালয়ের মুখ রাঙা হয়ে উঠতে লাগল, ব্যস্ত হয়ে রং ঢেলে তুলি নিয়ে বসলাম, মনে হল কতই কিছু আঁকব।’

উপেন্দ্রকিশোরের ছবি নিয়ে বাজারে অনেকরকম রটনা ছিল। সেসময় তাঁর ছবিকে আক্রমন করেছেন এক দল সমালোচক। আসলে তিনি যে সময় ছবি আঁকছেন, সেই সময় অবনীন্দ্রনাথ প্রমুখ শিল্পী প্রাচীন ভারতের চিত্রকলার ধারাকে নতুন আদল দিচ্ছেন। উপেন্দ্রকিশোরের ছবির সমালোচকদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন এঁদের ‘ফ্যান’। উপেন্দ্রকিশোরকে শুনতে হয়েছিল, তাঁর ছবি “আড়ষ্ট”, “বিদেশীর অনুকরণে অঙ্কিত মেকী”। প্রতিবাদের বদলে মৃদুহাস্যবদনে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল: “শিল্পের জগৎ খুব বড়ো ও মহৎ।”

সত্যজিৎ রায়ের স্কেচ-এ শিল্পী উপেন্দ্রকিশোর

এইসব কারণেই হয়তো চিত্রশিল্পী উপেন্দ্রকিশোর নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারেননি। ‘ফাইন আর্ট’ চর্চায় উপেন্দ্রকিশোর রায়ের অবদান আজ উপেক্ষিত। উপেন্দ্রকিশোরের আঁকা গিরিডির উপবন ও শৈলমালা, পুরীর সমুদ্রের মতো অন্যান্য ল্যান্ডস্কেপগুলির মধ্যে শুধু ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিটিই পাওয়া যায়। ১৯২০ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্ট-এর জার্নালে ছবিটির প্রথম প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়। সত্যজিৎ যে বাড়িতে জন্মেছেন অর্থাৎ ১০০-গড়পার রোডের বাড়িতে সে ছবি বেশ কিছুদিন ছিল। তারপর তা হাতছাড়া হলেও ছবিটি বর্তমানে রায় পরিবারেই সংরক্ষিত আছে। ১৯৬৩ সালে উপেন্দ্রকিশোরের জন্মশতবর্ষে স্কুল অফ প্রিটিং টেকনোলজি-র অধ্যক্ষ শ্রীনিরঞ্জন চক্রবর্তী বিশেষ উদ্যোগ নেন। উপেন্দ্রকিশোরের বিভিন্ন রচনার ফ্যাক্সিমিলি-র সঙ্গে ‘কাঞ্চঞ্জঙ্ঘা’রও একটি অনবদ্য প্রতিচ্ছবি তখন মুদ্রিত হয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে নিরঞ্জনবাবু মূল চিঠিটি পেয়েছিলেন। ছবিটির বর্তমান ঠিকানা বিশপ লেফ্রয় রোড।

 

তথ্যসূত্রঃ

প্রবন্ধ সংগ্রহ : সিদ্ধার্থ ঘোষ

https://www.kulayefera.com/

 

Developed by DXDasia