ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুল : ১৯০ বছর ধরে কলকাতার শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ১৪

লর্ড বেন্টিংক তখন বাংলার গভর্নর জেনারেল। বাংলা তখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলার নবজাগরণের সময়। সতীদাহ প্রথা রদ করে পাশ্চাত্য শিক্ষার দরজা তখন সবেমাত্র খুলে যাচ্ছে বাংলার জন্য। শিক্ষা ও জ্ঞানের আলোয় তখন বাংলা উদ্ভাসিত হচ্ছে। কলকাতা থেকে তখন আলিপুরের দূরত্ব ৮ মাইল। এই ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে, ১৮৩২ সালে, বাংলার আলিপুরে লন্ডন মিশনারি সোসাইটির উদ্যোগে গড়ে উঠল একটি খ্রিষ্টান স্কুল। “খ্রিষ্টান বোর্ডিং স্কুল”। কালক্রমে যা রূপান্তরিত হয় “ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুল”-এ। কলকাতার পূর্বতন ১১০/২ রসা রোড, যা আজকের ৩ নম্বর আশুতোষ মুখার্জি রোড (কলকাতা ২০) বা ভবানীপুর, এখানেই অবস্থিত স্কুলটি।

১৮৩৭ সালে, মিস্টার ক্যাম্বেল ৫০০ জন ছাত্র থাকার ব্যবস্থা সহ “খ্রিষ্টান বোর্ডিং স্কুল” স্কুলটি ভবানীপুরে স্থানান্তরিত করে নতুনভাবে শুরু করেন। ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদের জন্যেও আলাদা একটি বিভাগ হয়। আরও পরে স্কুলটি  শুধুমাত্র মেয়েদের স্কুল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ক্লাস চলত মিস্টার ক্যাম্বেলের বাড়িতেই। স্কুলটির সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন মিসেস ক্যাম্বেল। ২৪ জন খ্রিষ্টান ছাত্রী বোর্ডিংয়ে থাকত আর ২০ জন ‘ডে স্কলার’ পড়াশুনা করত। প্রায় সব ছাত্রীই ছিল ভারতীয় খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের। ১৮৩৩ সালে কলকাতায় ভয়াবহ বন্যা হওয়ায় বন্যাদুর্গত কিছু অনাথ বাচ্চাও জুটে গিয়েছিল, এই ভাবেই লন্ডন মিশনারী সোসাইটি গার্লস স্কুলের সূচনা হয়। পরে এই স্কুলটিই ‘ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুল’-এ পরিণত হয়। ধীরে ধীরে ছাত্রী সংখ্যা বাড়তে থাকে। পড়াশুনোর সঙ্গে সঙ্গে সেলাই, গান, ছবি আঁকা ইত্যাদি বিষয় ছাত্রীরা পারদর্শী হয়ে উঠতে থাকে। ১৮৮১-তে স্কুলের জনৈক শুভার্থী লন্ডন থেকে ১০০০ পাউন্ড উপহার পাঠান তার সঙ্গে আরো কিছু অনুদান যুক্ত করে লন্ডন মিশনারী সোসাইটি একটি সুন্দর স্কুলবাড়ি তৈরি করে।

দেখতে দেখতে সেই স্কুলেরই বর্তমান ছাত্রী সংখ্যা ১৯০০-র কিছু বেশি। স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা ক্ষমা দাশগুপ্তর লেখায় পাই, “প্রথমে এই স্কুলের নাম ছিল লন্ডন মিশনারি স্কুল। আমি জেনেছি কারণ, আমার আত্মীয় ছিল এর ছাত্র। আমার ধারণায় প্রথমে ছাত্রদের পরে ছাত্র-ছাত্রীদের এবং সর্বশেষে শুধুমাত্র ছাত্রীদের জন্য এই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম প্রতিষ্ঠায় ক্যাম্বেল দম্পতির বিরাট অবদান রয়েছে। পরবর্তীকালে ব্যাপটিস্ট ও মিশনারি এই হাইস্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়। স্কুলে একটি সাদা ফলক আছে, তাতে লেখা আছে লেডি কারমাইকেল এই স্কুলের উদ্বোধন করেন। স্থায়ী ঠিকানা হয় ৩ আশুতোষ মুখার্জী রোড, কলকাতা ২০।”

এই স্কুলে প্রথম ভারতীয় প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে কাজ করেছেন কনকলতা দাস। সবাই তাঁকে ‘মামনি’ বলতেন। তিনি শিক্ষিকা হিসাবে রাষ্ট্রপতি সম্মান পান ১৯৬৪ সালে।

কথা হচ্ছিল ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা লীনা জর্জের সঙ্গে। তিনি বললেন, “২০২২-এর ১২ সেপ্টেম্বর ১৯০ বছর পূর্ণ করেছে ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুল। অঙ্কুর থেকে আজ এই স্কুল মহীরুহর রূপ নিয়েছে। বছরটিকে স্মরণীয় করে তুলতে এবং পড়ুয়াদের প্রতিভা বিকাশের জন্য ইতিমধ্যেই স্কুলের অ্যালুমনি অ্যাসোসিয়েশন UNITY’র পক্ষ থেকে স্কুলকে উপহার দেওয়া হয়েছে বাস্কেট বল পোস্ট, বাস্কেট বল, ফাইবার বোর্ড এবং নেট। এই প্রজেক্টে আমাদের খরচ হয়েছে ১,০৫,০০০ টাকা। স্কুলের তরফ থেকে গত বছর পুজোয় দুটো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—গিফট অ্যা স্মাইল এবং “আশা নিকেতন” বৃদ্ধাশ্রমের জন্য উপহার। ছোটো থেকেই যাতে সব কিছু ভাগ করে নেওয়ার একটা অভ্যাস তৈরি হয়, সেদিকটা আমরা মনোযোগ সহকারে দেখি। এর জন্য বছরে একটা ‘গিফট এক্সচেঞ্জ’ অনুষ্ঠান হয় স্কুলে।”

স্কুলের পরিবেশ, স্কুলের ভেতরের চ্যাপেল (প্রার্থনাঘর)-এ পিয়ানো বাজিয়ে প্রাত্যহিক প্রেয়ার, স্কুলের সব ছাত্রীর কাছেই একটা প্রিয় ও পছন্দের বিষয়। নবম/দশম শ্রেণীর ছাত্রীরা, যারা কয়ারের (প্রার্থনাসংগীত গায় যাঁরা) সক্রিয় সদস্য, তারা ছোটোদের প্রেয়ারের প্রশিক্ষণ দেয়।  স্কুলের বকুলতলার স্মৃতি প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রীদের মনে একটা বড়ো জায়গা নিয়ে আছে। এ বিষয়ে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী শিবরঞ্জনী দাশগুপ্ত বলছিলেন, “তখন ক্লাস টু-তে পড়ি। আমাদের ক্লাস টু বি-র ক্লাস টিচার আলপনা আন্টি একদিন বললেন, সবাইকে ৩০ টাকা দামের মধ্যে কোনও গিফট কিনে আনতে। সেটা বই হলেই সবচেয়ে ভালো হয়। এরপর বই কিনে ক্রিসমাসের আগে জমা দিলাম। বইয়ে নিজেদের রোল নাম্বার লিখে দিতে বলা হয়েছিল, তা লিখে দিলাম। কিন্তু, কেন এসব করছি তখন বুঝিনি। এরপর ক্রিসমাসের দিন গেলাম স্কুলে। একটা বাক্সে কাগজের টুকরো ছিল অনেকগুলো। সেগুলো থেকে একটা করে আমাদের এক একজনকে তুলতে বলা হল। তুললাম। আমার হাতে যে রোল নাম্বার লেখা কাগজের টুকরোটা এলো সেই রোল নাম্বারের বইটা আমি পেলাম। আমারটা আমারই ক্লাসের কোনও এক বন্ধু পেল। এভাবেই আমাদের স্কুল ভাগ করে নিতে শিখিয়েছে। আমি দ্বাদশ শ্রেণী  পর্যন্ত এই স্কুলে পড়েছি। প্রতি বছর এই দিনটার অপেক্ষায় থাকতাম। এছাড়াও রোজ স্কুল শুরুর আগে প্রেয়ার, সেন্ট মেরি’জ ও সেন্ট পলস চার্চ অনুষ্ঠানে থ্যাঙ্কস গিভিং সার্ভিসে যোগ দেওয়া কোনওদিন ভুলতে পারব না।” 

স্কুলের চ্যাপেল, রাখা আছে পিয়ানোটিও

সব স্কুলেই কয়েকজন ছাত্রছাত্রী অন্তঃপ্রাণ শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকেন, যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বাইরে পড়ুয়াদের সমাজ সম্পর্কে, জীবন সম্পর্কে অবহিত করেন, পড়ুয়াদের বন্ধু ওঠেন। ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুলের জীববিজ্ঞানের শিক্ষিকা লীনা ভট্টাচার্য তেমনই একজন শিক্ষিকা। স্কুলের ছাত্রীদের মধ্যে তাঁর অসীম গ্রহণযোগ্যতা আছে।  

শিবরঞ্জনীর কথায়, “স্কুল আমাদের যে নিয়মে বেঁধে দিয়েছিল, তার থেকে আজও আমি বেরতে পারিনি। জীবনে ডিসিপ্লিনটা যে কত বড়ো বিষয়, সেটা আমি স্কুল থেকেই শিখেছি। আজও মনে পড়ে প্রাইমারির বীণা, মাধবী, মধুমিতা, আলপনা আন্টির কথা। হাইস্কুল স্তরে মৈত্রেয়ী আন্টি, পম্পি আন্টি, লীনা ভট্টাচার্য আন্টি, ঊর্মী আন্টি, মঞ্জুশ্রী রঙ্গা আন্টি, নন্দিনী আন্টি, অনুরাধা আন্টি, লীনা জর্জ আন্টির কথা ভুলবো না। এছাড়াও মনে পড়ে রামলক্ষণ দাদুর কথা। স্কুলে যেদিন প্রথম ঢুকি আমার হাত ধরে স্কুলের গেট থেকে ভেতর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি যেদিন স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়ে যাচ্ছি, সেদিনও শিক্ষিকাদের পাশাপাশি রামলক্ষণ দাদুর আশীর্বাদ নিয়েছিলাম। আজও সেই সব দিনগুলোর কথা ভুলতে পারি না।”

মিস ই রিভেট ছিলেন এই স্কুলের প্রথম প্রিন্সিপাল। প্রধান শিক্ষিকাদের মধ্যে প্রথম ভারতীয় প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে কাজ করেছেন কনকলতা দাস। সবাই তাঁকে ‘মামনি’ বলতেন। তিনি শিক্ষিকা হিসাবে রাষ্ট্রপতি সম্মান পান ১৯৬৪ সালে। ১৯৭০ সালে প্রিন্সিপাল হন হাস্য অধিকারী। ১৯৭৬ সালে মিসেস জাহানারা টমাস প্রিন্সিপাল হন ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুলের। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন। ছাত্রী, শিক্ষিকা সবার পছন্দের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন তিনি। অঞ্জলী দাস প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে অবসর নেওয়ার পর স্কুলের টিচার ইন চার্জ হন সুস্মিতা পাল। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে আছেন লীনা জর্জ।

লীনা জর্জের সঙ্গে কথায় কথায় জানা গেল, মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমি স্তরে স্কুল এখনও ভালো ফল করার ধারা বজায় রেখেছে। স্কুলে এখন ইভিএস, নিউট্রিশন নতুন বিষয় হিসাবে একাদশ-দ্বাদশের পাঠক্রমে এসেছে। এছাড়া উচ্চমাধ্যমিকে সায়েন্স, আর্টস আগের মতোই পড়ানো হয়। নিউট্রিশনের ল্যাবরেটরি তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের জন্য স্কুলে সোলার প্যানেল বসেছে। এখনও এটাই একমাত্র বাংলা মাধ্যম মিশনারি স্কুল যেখানে ইংরেজিতে প্রেয়ার হয়। এখনও রাজ্যস্তরের সেমিনার, ডিবেটে অংশ নিচ্ছে এবং সাফল্য ছিনিয়ে আনছে ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীরা।

পুরোনো স্থাপত্যশৈলির নিদর্শন নিয়ে আজও অক্ষত স্কুলের করিডর

দূরন্তপনা শৈশবের ধর্ম কিন্তু তার পাশাপাশি নিয়মানুবর্তিতার পাঠটাও এই স্কুলের শিক্ষিকারা সঠিক সময় সঠিক ভাবে ছাত্রীদের মধ্যে দিয়ে দেন, যার ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছাপ রাখতে পারছে ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীরা। এখনও স্কুল চলাকালীন স্কুল কমপাউন্ডে প্রবেশ করলে মনে হবে না ১৯০০-র বেশি ছাত্রী বিভিন্ন ঘরে বসে ক্লাস করছে। সঠিক অনুশাসনের ফলাফল। এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন প্রয়াত সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্য, থিয়েটার ও বাচিকশিল্পী বিজয়লক্ষ্মী বর্মণ সহ একাধিক গুণী মানুষ, সমাজে যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুল শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার পীঠস্থান হিসাবে তার ঐতিহ্য বজায় রেখেই এগিয়ে চলেছে।

_________________________

তথ্যসূত্রঃ প্রবাহিণী, স্কুল ম্যাগাজিন

লীনা জর্জ, প্রধান শিক্ষিকা, ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুল

লীনা ভট্টাচার্য, শিক্ষিকা, জীববিজ্ঞান, ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুল

ছবি: সংগৃহীত

*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia