বরেন্দ্রভূমির ইতিহাস কিন্তু ভুলে যাওয়ার নয়

বাংলাদেশের কিছু অংশ ও বর্তমান উত্তরবঙ্গের বিরাট অংশকে একসময় বলা হত বরেন্দ্রভূমি

বাংলাদেশের কিছু অংশ ও বর্তমান উত্তরবঙ্গের বিরাট অংশকে একসময় বলা হত বরেন্দ্রভূমি। এই বরেন্দ্রভূমি বা উত্তরবঙ্গ অখ্যাত স্থান বা অনার্যদের বাসস্থান হিসাবে বর্ণিত হয়েছে অনেক স্থানে। কিন্তু ইতিহাস গবেষকরা জানাচ্ছেন, বরেন্দ্রভূমি মোটেই অনার্যদের স্থান ছিল না। একদিকে বাংলাদেশের হিন্দুদের শিক্ষা সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে গ্রামের পণ্ডিতরা যে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলেন সেই আলোকের ছটা দূরদূরান্তে বিচ্ছুরিত হয়েছিল। বৌদ্ধশিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক অথবা বিভিন্ন শাস্ত্রে পণ্ডিতেরা এই বরেন্দ্র বা পুণ্ড্রবর্ধনে যেভাবে বিদ্যাচর্চা করেছিলেন তা শুধু নিজের দেশেই নয়, ভিন্ন দেশেও তা মর্যাদা ও স্বীকৃতি লাভ করেছিল।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও গবেষক ডঃ ইচ্ছামুদ্দিন সরকার জানাচ্ছেন, বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠভূমি এই উত্তরবঙ্গে যে বৌদ্ধ ভিক্ষুকেরা তাঁদের মঠে বা বিহারে অবস্থান করে বিদ্যাচর্চা করতেন তা বহুভাবে প্রমাণিত। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুকেরা এই বরেন্দ্রী অঞ্চলে এসেছিলেন এবং তাদের জীবনযাপনে সেরকম কোনও বিড়ম্বনা ছিল না বলে তারা বিদ্যাচর্চা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনে নিজেদের আত্মনিয়োগ করতে পেরেছিলেন। ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে বরেন্দ্রী বা উত্তরবঙ্গ থেকে এক বাঙালি শ্রমণ অনেক সংস্কৃত গ্রন্থসহ চীনে গিয়েছিলেন। চীনা ভাষায় তার নাম পউ–সি এবং বরেন্দ্রীর নাম দেখানো হয়েছে ফো-লিন-নই। জাপানের হোরিয়ুজি মন্দিরে রক্ষিত কিছু ধর্মপুস্তক একাদশ শতাব্দীর বাংলা অক্ষরে লেখা বলে প্রমাণিত হয়েছে। পণ্ডিতদের ধারণা, সম্ভবত বাংলার পালরাজা প্রথম মহীপাল অথবা নয়পালের যুগেই ঐ পুথিগুলো বাংলা থেকে হয় সরাসরি নয়তো স্থানান্তর হয়ে জাপানে প্রবেশ লাভ করে। তবে বরেন্দ্রী বা উত্তরবঙ্গ থেকে চীনে পদার্পণ তারপর জাপানে তার সমাদর প্রমাণ করে বরেন্দ্রীর মানুষেরা কোনও অর্থেই জ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে ছিলেন না।

এখন বাংলাদেশের রাজশাহীর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুরী মহাবিহার নিয়ে অনেকের জানা আছে। এই সোমপুরী নামক প্রাচীন বরেন্দ্রীর বৌদ্ধবিহারটি বিদ্যাশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্বীকৃত। কথিত আছে সোমপুরী মহাবিহারের সাথে তিব্বতের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। জানা গেছে একাধিক তিব্বতি ভাষায় লেখা বৌদ্ধশাস্ত্র এই মহাবিহারে সংস্কৃত ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। তাছাড়া এখানকার একজন পণ্ডিত বীর্যসিংহের সঙ্গে অতীশ দীপঙ্কর নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন।

এখনকার বাংলাদেশের রাজশাহী পাহাড়পুরে বৌদ্ধদের স্থাপত্য সে-আমলের বিরাট নিদর্শন। ১৮৪৯ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিংহোম প্রথম সেখানে খননকাজে হাত দেন। তারপর কিছুদিন তা বন্ধ থাকার পর আবার ১৯২৩-১৯২৪ সালে খননকাজ শুরু হয়। তারপর পাওয়া যায় অনেক শিলালিপি। তখন জানা যায় সেখানে বৌদ্ধদের বিরাট শিক্ষাকেন্দ্র ছিল অষ্টম শতাব্দীতে। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল ছিলেন বেশ বিত্তশালী ও প্রভাবশালী। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বৌদ্ধ ও হিন্দুরাজাদের বিদ্যাচর্চা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে যায়। এরপর লক্ষণ সেনের বাহিনী সেখানে আক্রমণ চালায়। আর তাতে বৌদ্ধ ও হিন্দুরা অনেকে সেই মন্দিরের মতো দেখতে বিরাট শিক্ষাকেন্দ্র থেকে সরে যায়। এরপর সেটি অনেকদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে। তারপর তা দেখতে অনেকটা পাহাড়ের আকার নেয়। এই বৌদ্ধবিহার দেখতে বাংলাদেশে শীতকালে ব্যাপক ভিড় হয়।

এই বরেন্দ্রীর একটি স্থান বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের বানগড়। তা নিয়ে খননকাজ চালিয়ে আজও গবেষণা হচ্ছে। ইতিহাস গবেষক ডঃ ইছামুদ্দিন জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের কিছু অংশ নিয়ে প্রাচীন উত্তরবঙ্গ থেকে বহুভাবে শিক্ষাসংস্কৃতি অন্যত্র ছড়িয়েছিল। বানগড়ের অদূরে একটি স্থানের নাম চম্পাতলি। সেখানে আজও অনেক ব্রাহ্মণ বসবাস করেন। সেখানে পুরানো দিনের প্রথিতযশা পণ্ডিতদের বাসস্থান আজও অনেককেই ভাবিয়ে তোলে। এই চম্পাতলি বা চম্পাহাটি বরেন্দ্রী অঞ্চলে শিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। বাংলার সেনবংশের অন্যতম রাজা বল্লালসেনের গুরু বিখ্যাত পণ্ডিত অনিরুদ্ধ ভট্টও নাকি ঐ চম্পাহাটি গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। 

Developed by DXDasia