আধুনিক প্রযুক্তির কাছে হার মেনেছে, স্থাপত্যবিদদের ভ্রুকুটি নিয়েই বাঁচছে ‘কড়ি বর্গা’

স্থাপত্যবিদদের মতে, কড়ি বর্গার ছাদযুক্ত বাড়িগুলো প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল

শোভাবাজার রাজবাড়ি

তুরস্ক ও সিরিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প সেই দুই দেশের বহু তরতাজা প্রাণ কেড়ে দেশ দু’টির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। স্থাপত্যবিদরা বলছেন, কলকাতায় ভূমিকম্প হলে প্রথমেই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল যে ভবনগুলির সেগুলি হল, মহাকরণ বা রাইটার্স বিল্ডিং, কলকাতা পুরসভার প্রধান ভবন, টাউন হল, কলকাতা জাদুঘর, প্রিন্সেপ ঘাট, শোভাবাজার রাজবাড়ি সহ সারা কলকাতা বিশেষ করে উত্তর কলকাতার ১৯৪০-এর আগে তৈরি হওয়া বাড়ি।

স্বাভাবিক ভাবেই এসব শুনলে মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, কেন শুধু এই ১৯৪০-এর আগে তৈরি হওয়া ভবনগুলোই ভূমিকম্পে পুরো ধ্বসে যাওয়ার সভাবনা এতোটা বেশি?

এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন স্থাপত্যবিদরা। তাঁরা বলছেন, ১৯৪০ এর আগে পাকা বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে ইটের চওড়া ২০, ২৫, ৩০ ইঞ্চি ভিত নির্মাণ করে বাড়ি তৈরি হতো। ছাদ নির্মাণ হত ‘কড়ি বর্গা’ নামক এক বিশেষ পদ্ধতিতে। এই বাড়িগুলো ভূমিকম্পনিরোধক নয়। কারণ চওড়া ইটের ভিতের উপর কড়ি বর্গার ছাদযুক্ত এই বাড়িগুলো প্রযুক্তিগত ভাবে দুর্বল, তাই ভূমিধ্বস, ভূমিকম্প জাতীয় ঘটনা কলকাতায় ঘটলে প্রথম আঘাত পড়বে কড়ি বর্গার বাড়ির উপর।

কড়ি বর্গার ছাদ

তাহলে কেন এই নির্মাণ প্রকৌশল কাজে লাগিয়ে মহাকরণ, টাউন হল, কলকাতার জাদুঘরের মতো বিশালাকার ভবনগুলো তৈরি হয়েছিল? এর উত্তর একটাই, তখন বাড়ি তৈরির জন্য ভূমিকম্পনিরোধক প্রযুক্তি যেমন তৈরি হয়নি, তেমনই আবিষ্কার হয়নি আজকের যুগে ব্যবহৃত বাড়ি তৈরির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক ইস্পাত ও নির্মাণ সামগ্রী।

জোড়াসাঁকো রাজবাটী

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ডক্টর পার্থপ্রতিম বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হচ্ছিল কড়ি বর্গার বাড়ি ও আজকের বিম, কলাম, স্ল্যাবের বাড়ির নিমাণ পদ্ধতি ও ভালোমন্দ নিয়ে। বঙ্গদর্শন-কে তিনি জানালেন, “কড়ি বর্গার বাড়ি তৈরির কাঠামো নির্মাণে মূলত ব্যবহার করা হত কাঠ ও ইস্পাতের কাঠামো। দৈর্ঘে বড়ো কাঠ বা ইস্পাতগুলো লম্বালম্বিভাবে ব্যবহার করা হত। আর তুলনায় যেগুলো ছোটো সেগুলো আড়াআড়ি ভাবে ব্যবহার করা হত। মূলত ছাদ তৈরির জন্যই এই পদ্ধতি তখন চালু ছিল।”

দৈর্ঘে বড়ো কাঠ বা ইস্পাতগুলোকে বলা হত কড়ি আর ছো্টোগুলিকে বলা হত বর্গা। এই কড়ি বর্গার উপর থাকত টালি, তার উপর চুন, সুরকি ও খোয়া অর্থাৎ ইটের ভাঙা ও ছোটো টুকরো। এই দিয়েই ছাদ তৈরি হত। এছাড়া কড়ি বর্গার বাড়ির ভার বহন ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ ছিল বাড়ির দেওয়ালগুলো। এই সব বাড়ির ছাদ এবং মেঝের ভার কড়ি বর্গা দিয়ে দেওয়ালে চলে যেত। তারপর দোওয়াল হয়ে সেটা বাড়ির ভিত বা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সোজা মাটিতে চলে যেত। ভিতের উপর কড়ি বর্গার ছাদ ও সেই ছাদের উপর দোতলা, তিনতলা বাড়ি নির্মাণ হত। কংক্রিটের কোনও ব্যবহার সেই সময় আবিষ্কার হয়নি তাই কড়ি বর্গার বাড়িতে কংক্রিটের ব্যবহারও ছিল না। এই ভাবে বাড়ি তৈরির কৌশলকে বলা হয় ‘ওয়াল ফাউন্ডেশন’। অর্থাৎ দেওয়ালটাই ভারবাহী অংশের কাজ করত আর কড়ি বর্গা সেই ভার বিস্তার ঘটিয়ে দেওয়াল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কাজ করত। কড়ি বর্গার বাড়ির দেওয়াল তাই ২০, ২৫, ৩০ ইঞ্চি চওড়া হত। “তবে এই ধরনের বাড়ির দেওয়ালগুলো অনেক চওড়া হলেও ভার বহন ক্ষমতা ছিল কম। মহাকরণ, টাউন হল এই কড়ি বর্গার নির্মাণ প্রযুক্তিতে তৈরি। তাই ভূমিকম্প বা কোনওভাবে মাটি বসে যাওয়া জনিত কারণে মহাকরণ, টাউন হলের মত বাড়িগুলোর ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি, যেটা আজকের ‘রিইনফোর্সমেন্ট কনসেপ্ট’ অর্থাৎ বিম, স্ল্যাব, কলামের বাড়িতে তুলনায় অনেক কম।” বলেন পার্থপ্রতিমবাবু।

কলকাতা তো বটেই, সারা বাংলা জুড়ে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই কড়ি বর্গার নির্মাণ প্রযুক্তিতে তৈরি ঘরবাড়ি। নস্ট্যালজিয়ায় ফিরে গিয়ে এখন অনেকেই ‘ফলস’ কড়ি বর্গা তৈরি করছেন, যা মূলত স্টিল দিয়েই নির্মিত হচ্ছে।

ভারতীয় জাদুঘর

কলকাতা তো বটেই, সারা বাংলা জুড়ে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই কড়ি বর্গার নির্মাণ প্রযুক্তিতে তৈরি ঘরবাড়ি। নস্ট্যালজিয়ায় ফিরে গিয়ে এখন অনেকেই ‘ফলস’ কড়ি বর্গা তৈরি করছেন, যা মূলত স্টিল দিয়েই নির্মিত হচ্ছে। ইতিহাস বলছে, ১৯৪০ এর আগে বা ১৯৪০ পরবর্তী অনেকটা সময় জুড়ে এই কড়ি বর্গার বাড়ি তৈরি হত কলকাতায়। তবে ১৯৪০ থেকেই রিইনফোর্সমেন্ট কনসেপ্ট বা আরসিসি কনসেপ্ট আসতে শুরু করল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও কলকাতা পুরসভার ভ্যালুয়েশন ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন আধিকারিক পি কে মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, কড়ি বর্গা থেকে আধুনিক আরসিসি বা রিইনফোর্স কংক্রিটের প্রযুক্তিতে বাড়ি তৈরির এই পট পরিবর্তনের কাহিনি। তাঁর কথায়, “মূলত ১৯৩৫-‘৪০ থেকেই কলকাতায় ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে কড়ি বর্গার বাড়ি তৈরি। এই সময় থেকেই নির্মাণ সামগ্রী ও প্রযুক্তি আধুনিক হতে শুরু করল। তাই কড়ি বর্গার পরিবর্তে বিম, স্ল্যাব, কলামের উপর বাড়ি তৈরি শুরু হল। কড়ি বর্গার বাড়িতে ছাদ তৈরির জন্য ভার বহনের কাজে লোহা বা কাঠ ব্যবহার করা হত, যদিও এইসব উপাদানের ভার বহন ক্ষমতা কম ছিল। তাছাড়া তখন কংক্রিটের ব্যবহার ছিলই না। আর এখন লোকার্বন স্টিল ব্যবহার করা হচ্ছে বাড়ি তৈরিতে। এই স্টিল বাকানো যায়, কাটা যায়, এই স্টিল দুমড়ে মুচড়ে গেলেও ভাঙে না। এই স্টিলের ভার বহন ক্ষমতাও বেশি।”

তিনি আরও বলেন, “কড়ি বর্গার বাড়িতে যেমন দেওয়ালই ছিল কড়ি বর্গার মাধ্যমে দেওয়ালে ও ভিতে মূল ভারবাহী ব্যবস্থা। এখনকার বাড়িতে বিম, স্ল্যাব, কলামের বাড়িতে মূল ভারবাহী ব্যবস্থাটা ছাদের স্ল্যাব থেকে প্রথমে বিম তারপর বিম থেকে কলাম হয়ে মাটিতে পৌঁছে যায়। আর এই বিম, স্ল্যাব, কলাম একটা বুনটে বাঁধা থাকে। যাতে করে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কঠিন ভাবে সংযুক্ত হয়ে থাকে। এখনকার নির্মাণ সামগ্রী কড়ি বর্গার বাড়ি তৈরির সময়কার নির্মাণ সামগ্রীর চাইতে অনেক বেশি ভার বা লোড নিতে সক্ষম। এই সব কারণেই কড়ি বর্গার জায়গায় বিম, স্ল্যাব, কলামের মাধ্যমে বাড়ি তৈরি শুরু হল। কড়ি বর্গার বাড়ির ছাদের তুলনায় আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি বাড়ির ছাদ অনেক পাতলা ও হালকা কিন্তু মজবুত হল। কলামগুলোও ২০,২৫,৩০ ইঞ্চি দেওয়ালের তুলনায় কমে হল ৮ থেকে ৯ ইঞ্চি।”

টাউন হল

শ্রীরামপুর রাজবাড়ি

আসলে এই কড়ি বর্গার বাড়ি আমাদের অনেক কিছু মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় যৌথ পরিবারের ভিত্তির কথা, যা আজ আর নেই। কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণকে বাড়ির নির্মাণ শৈলীর ভিত্তিতে আলাদা করে চেনা যায়। উত্তর কলকাতা দক্ষিণ কলকাতার চাইতে বয়সে বড়ো। উত্তর কলকাতার কড়ি বর্গার বাড়িতে স্যাঁতস্যাঁতে বাথরুম আছে, একই রান্না ঘরে এখনও অনেক যৌথ পরিবারের রান্না খাওয়াদাওয়া হয়। কিন্তু আধুনিক ও মজবুত বাড়ির কাঠামোতে নির্মিত দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে একসঙ্গে ১০টা থালা পেতে এখন অনেক পরিবারেই রোজ দু’বেলা খাওয়া হয় না। তাই বলা যায় বাড়ি নির্মাণে কৌশলের, প্রযুক্তির দিক থেকে দক্ষিণ কলকাতা হয়তো অনেক মজবুত। কারণ বিম, স্ল্যাব, কলাম পরস্পরকে অনেক নিবিড় ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, কিন্তু আধুনিক এই দু-তিন কামরার ফ্ল্যাট যৌথ পরিবারের বাঁধনকে অনেকটাই আলগা করে দিয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর কলকাতার কড়ি বর্গার বহু বাড়ির ৩০ ইঞ্চির চওড়া দেওয়াল বাড়ির ভার বহন ক্ষমতায় দক্ষিণ কলকাতার বিম, স্ল্যাব, কলামের চাইতে পিছিয়ে থাকলেও এই কড়ি বর্গার বাড়িতে যৌথ পরিবারের ধারণা অনেকটাই মজবুতভাবে টিকে আছে। আছে কড়ি বর্গার ছাদ যুক্ত বিস্তৃত দালান, মণ্ডপ। বছরে একবার পুজাপার্বনের সময় রঙের পোচ পড়ে এই কড়ি বর্গায়।

আধুনিক নির্মাণ শৈলী ‘আরসিসি’ বলা হয় যাকে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীর্ণ হচ্ছে কড়ি বর্গার বাড়ি। কোনও কোনও বাড়ির উপর “বিপজ্জনক বাড়ি” নোটিশ লাগিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। কেউ বিপজ্জনক বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট বানাচ্ছেন। কিন্তু কড়ি বর্গার যে বাড়িগুলো দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে মানুষকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে, যৌথ পরিবারগুলো যেখানে আজও শত কষ্ট সহ্য করেও একসঙ্গে বেঁচে আছে, সেখানে নিশ্চয়ই কোনও না কোনও টান তো আছেই। সেই টানেই হয়তো জীর্ণতার সঙ্গে বাঁচায় আনন্দের খোঁজ মেলে। শেষ দুপুরের একফালি রোদ এখনও যেভাবে কড়ি বর্গার বাড়ির রোয়াককে আলোকিত করে যায় স্মৃতিকে উস্কে দিয়ে, আাধুনিক ফ্ল্যাটের ব্যালকনিকে হয়তো শেষ দুপুরের একফালি রোদ সেভাবে আলোকিত করতে পারে না। আর তাই প্রায়বিলুপ্ত কড়ি বর্গার বাড়ি ও বাড়ি তৈরির প্রযুক্তিকে পিছনে ফেলে আধুনিক বাড়ি তৈরির প্রযুক্তি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে ভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে মন কি তাতে সায় দেয়? মন বলে, পুরোনো-দুর্বল হলেও বেঁচে থাক কড়ি বর্গা। কংক্রিটের বুনট নয় মজবুত হোক সম্পর্ক, পরিবারের বুনট।

তথ্যসূত্র: ডক্টর পার্থপ্রতীম বিশ্বাস, অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

পি কে মুখোপাধ্যায়, ইঞ্জিনিয়ার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

ছবি: সংগৃহীত

Developed by DXDasia