
দেশের মধ্যে রোগ, অপুষ্টি, অনাহারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মহানায়করা প্রাতঃস্মরণীয় নন?
দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারপ্রাপ্ত শীর্ষ কেন্দ্রীয় সংস্থাটি হল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসি শুধু শিক্ষার গুণমান নিয়ামক সংস্থাই নয়, মঞ্জুরি বা অর্থ বরাদ্দকারী সংস্থাও বটে। ভাত জোগানোর ঠাকুরের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা থাকলে তার কিল মারার গোসাঁইয়ের ভূমিকা মাঝেমাঝেই প্রকটভাবে প্রকাশ পায়। গত সপ্তাহে ইউজিসি–র সর্বশেষ নির্দেশিকায় আবারও সেই ভূমিকা দেখা গেল। আগামী ৭ ডিসেম্বর সশস্ত্র বাহিনীর পতাকা দিবস দেশের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তাদের অধীন কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছে ইউজিসি। দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা রক্ষায় প্রাণ বলিদান করা বীরদের ছাত্ররা বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বক্তৃতা ইত্যাদির মাধ্যমে স্মরণ করবে, এমনটাই ইউজিসি–র অনুজ্ঞা। গত তিন মাসের মধ্যে ইউজিসি–র এই ধরনের এটি চতুর্থ নির্দেশিকা। ১১ সেপ্টেম্বর স্বামী বিবেকানন্দর শিকাগো বক্তৃতার ১২৫ বছর পূর্তির সঙ্গে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষকে যুক্ত করে ছাত্রসমাজের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেশের সব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে শোনানোর নির্দেশ ছিল ইউজিসি–র। তারপর ৩১ অক্টোবর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মদিন উপলক্ষে নির্দেশ ছিল দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতা নির্মাণে তাঁর ভূমিকা স্মরণে একগুচ্ছ কর্মসূচী পালনের। ২৬ নভেম্বর সংবিধান দিবসও কীভাবে পালন করতে হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট আদেশনামা জারি করা হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে ইউজিসি এখন বেশ ঘনঘনই এক্সট্রা–কারিকুলার কিল মারতে দক্ষ হয়ে উঠছে!
কিল মারা বলছি কেন? আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ প্রতিটি অনুজ্ঞা খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে একটা বিশেষ ধরনের রাজনীতি ইঞ্জেকশন দিয়ে উচ্চশিক্ষার শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ভারতে উচ্চশিক্ষার ট্র্যাডিশন এটা নয়। ইউজিসি–ও অতীতে কখনও এই ধরনের রাজনৈতিক অভিযানে সামিল হয়নি বা তাকে হতে হয়নি।
দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা সশস্ত্র বাহিনীর কাজ। সেই কাজ করতে গিয়ে বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগ, এমনকি প্রয়োজনে প্রাণ বিসর্জনের মতো অবদান গোটা দেশ সসম্মানে স্বীকার করে। উচ্চশিক্ষার আঙিনায় আসা পড়ুয়ারাও তার মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী যেভাবে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির স্পর্শমুক্ত থেকে স্বাধীনতার পর ৭০ বছর পেশাদারি দায়িত্ব পালন করে এসেছে তা গৌরবজনক। একই রকম ইতিহাসের ধারা বহন করা পৃথিবীর অনেক দেশের সেনাবাহিনীই এই গৌরব দাবি করতে পারে না। যার জন্য বিশ্বের যে প্রান্তেই হোক না কেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে ভারতের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। কয়েকটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র বাদে সাধারণভাবে ভারতীয় সমাজে সেনাবাহিনীর আসনটা কিন্তু শ্রদ্ধার, মর্যাদার, গৌরবের, ভালবাসার। কখনই ভয়ের বা ভক্তির নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে সশস্ত্র বাহিনীর পতাকা দিবস পালন নিয়ে নির্দেশিকায় একটা জোর করে ভক্তি জাগানোর প্রয়াস আছে। বিশেষ করে গত তিন মাসের মধ্যে এটি চতুর্থ এই জাতীয় নির্দেশিকা বলে এটাকে আর ‘পাগলামো’ বলে উপেক্ষা করা যায় না। এই পাগলামির মধ্যে একটা মেথড বা ছকে বাঁধা প্রক্রিয়া আছে।
সেই প্রক্রিয়া উচ্চশিক্ষা আর সৈন্যবাহিনীর মধ্যে এক্কেবারে বুনিয়াদি চরিত্রগত পার্থক্যটাই সম্ভবত ভুলে যায় বা ভুলিয়ে দিতে চায়। কিন্তু দুটোর ডিএনএ–ই যে আলাদা; সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস তো সেই কথাই বলে! উচ্চশিক্ষা বলে, প্রশ্ন করো, নিরন্তর প্রশ্ন করো। সৈন্যবাহিনী বলে, কখনও প্রশ্ন কোরো না, প্রশ্ন করা তোমার কাজ নয়। উচ্চশিক্ষা বলে, তর্ক ও যুক্তির অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করো। সৈন্যবাহিনী বলে, কেন আর কীভাবে জিজ্ঞাসা করা তোমার কাজ নয়, তোমার কাজ বিনা প্রশ্নে কর্তব্য পালন। উচ্চশিক্ষা আর সৈন্যবাহিনীর প্রয়োজনটা আলাদা বলেই নতুন নিয়োগের জন্য সৈন্যবাহিনী কিন্তু উচ্চশিক্ষার ধার ধারে না। যেখানে তুলনীয় অন্যে যে কোনও কাজে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হল গ্র্যাজুয়েট, সেখানে বারো ক্লাসের পর সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণই সৈন্যবাহিনীর আদর্শ রিক্রুট। দেশরক্ষার কোনও বিকল্প নেই, সৈন্যবাহিনী তাই বরেণ্য। একই যুক্তিতে লেখাপড়ারও কোনও বিকল্প নেই, শিক্ষকরাও তাই বরেণ্য; চিকিৎসারও কোনও বিকল্প নেই, ডাক্তাররাও তাই বরেণ্য; খবরেরও কোনও বিকল্প নেই, সাংবাদিরাও তাই বরেণ্য; পরিচ্ছন্নতারও কোনও বিকল্প নেই, সাফাইকর্মীরাও তাই বরেণ্য; শৈশবে পুষ্টির কোনও বিকল্প নেই, অঙ্গনওয়ড়ি কর্মীরাও তাই বরেণ্য। দেশ জুড়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রদ্ধার সঙ্গে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী বা সাফাইকর্মীদের স্মরণ করার কোনও আহ্বান ইউজিসি জানায়নি। এটাই আমাদের কাছে কিঞ্চিৎ বৈষম্যমূলক ঠেকছে। দেশের কাজে একজন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর অবদান একজন সৈনিকের চেয়ে কোন হিসেবের কী অঙ্কে কম হল, এটা মানুষের জানতে পারলে ভাল হত।
সর্দার প্যাটেলের জন্মদিন ৩১ অক্টোবর কীভাবে পালন করতে হবে তারও বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করেছিল ইউজিসি। আট দফ কর্মসূচীর মাধ্যমে তাঁর জন্মদিন পালনের উদ্দেশ্যটা হল বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতকে একীকৃত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণ করা। স্বাধীনতার পর ভারতভূমির মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচশো করদ রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার ঐতিহাসিক কাজটির অগ্রপুরুষ হিসাবে বল্লবভাই প্যাটেল অবশ্য স্মরণীয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার প্রসঙ্গে বিশেষ করে ওই কাজটির আলাদা তাৎপর্য কী? আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি দেশ গড়ার কাজে অতীতের অবদানের জন্য প্রত্যেককেই স্মরণ করতে হয়, তবে একই দিনে যাঁর মৃত্যু সেই ইন্দিরা গান্ধীকে কী করে বাদ দেওয়া যায়? তারও পরে প্রশ্ন, দেশ গড়া মানে কি শুধু রাজনীতি আর প্রশাসন পরিচালনা? ১২৫ কোটি মানুষের এই দেশ যে আজ দুর্ভিক্ষের অভিশাপ থেকে মুক্ত তার জন্য সবুজ বিপ্লবের জনক এম এস স্বামীনাথন প্রাতঃস্মরণীয় নন? সারা দেশে অপুষ্টির বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করে যিনি ঘরে ঘরে দুধ পৌঁছে দিলেন, সেই ভার্গিজ কুরিয়েন প্রাতঃস্মরণীয় নন? পেটের অসুখ যে জাতিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী দমিয়ে রেখেছে সেখানে ওআরএস চিকিৎসা পদ্ধতির আবিষ্কর্তা ডাঃ দিলীপ মহলানবীশ প্রাতঃস্মরণীয় নন? যুদ্ধ কি শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে গোলাগুলি চালিয়ে? দেশের মধ্যে রোগ, অপুষ্টি, অনাহারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মহানায়করা প্রাতঃস্মরণীয় নন? ইউজিসি তো এঁদের স্মরণে কোনও নির্দেশিকা কখনও জারি করেনি। অথচ উচ্চশিক্ষার আঙিনা থেকে আরও কয়েকজন মহলানবীশ, কুরিয়েন বা স্বামীনাথন বের হবে, আগামী দিনে এটাই তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ ও জাতির প্রত্যাশা। সেই ভাত দেওয়ার ঠাকুর হতে পারল না ইউজিসি, হয়েছে কিল মেরে দেশভক্তি জাগানোর গোসাঁই।
১১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শোনানোর জন্য নির্দেশ, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট চর্চা হয়েছে। ইউজিসি–র চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘এই তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান ছাত্রদের জীবন বদলে দিতে পারে।’ সরকারের বেতনভোগীর মনে হতে পারে এই প্রচারের সঙ্গে বুকের কাছে দু হাত ভাঁজ করে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা যুক্ত করলেই যোগফলটা হবে স্বামী বিবেকানন্দর ২০১৭ সংস্করণ। তবে সকলের তা নাও মনে হতে পারে; অনেকেরই হয়ওনি। পশ্চিমবঙ্গ সহ বেশ কয়েকটি রাজ্য প্রকাশ্যে ঘোষণা করে ওই অনুষ্ঠান বয়কটের ডাক দিয়েছিল। তুলনায় অনেক কম চর্চা হয়েছে সদ্য চলে যাওয়া ২৬ নভেম্বরের ‘সংবিধান দিবস’ পালনের নির্দেশিকা নিয়ে। সংবিধানের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই, এটি নিশ্চিতভাবেই উচ্চশিক্ষার ফসল। এখানেও দেখছি ইউজিসি–র নিদান হল সকালে জমায়েতে সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশ এবং নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যের তালিকাটি পাঠ, নোটিস বোর্ডে সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক কর্তব্যগুলি লিখে টাঙানো, এবং ওই মৌলিক কর্তব্যের উপর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি লেকচার। ব্যস, সংবিধানের আর কিছু নিয়ে আলোচনার কথা মনে পড়েনি ইউজিসি–র। আমাদের মনে পড়ে যায় সংবিধানে মৌলিক কর্তব্যের অংশটি যুক্ত হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংশোধনীতে, জরুরি অবস্থার সময়ে। নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য হল রাষ্ট্রের নির্দেশমূলক নীতির মতোই, নৈতিকভাবে ‘উচিত’, আইনত বাধ্যতামূলক নয় (যদি না নির্দিষ্ট আলাদা আইন সেই বিষয়ে থেকে থাকে)। সংবিধানের অনেক বুনিয়াদি বিষয় হল নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য, যার উপর রাষ্ট্রের চরিত্র দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চশিক্ষার আঙিনায় শুধু কর্তব্য পালনের হুঁশিয়ারি? অধিকার সম্বন্ধে নাগরিককে সচেতন করা নয়? এটা তো সৈন্যবাহিনীর শিক্ষা: কর্তব্য করে যাও, অধিকারের প্রশ্ন তুলো না। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতদের কাছ থেকে ঠিক এটাই কি চাইছে রাষ্ট্র?
