বাংলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে গ্রামীণ কথ্যভাষাই

ধ্বনি-উচ্চারণে বিকৃতি থেকেই এসেছে নানা পরিবর্তন

লোকের মুখের মধ্যে দিয়ে যে ভাষা অর্থাৎ অর্থবোধক বহুজনবোধ্য ধ্বনি যুক্ত হয়ে নিগর্ত হয় তাকে মুখের ভাষা বা কথ্য ভাষা বলা হয়ে থাকে। সাধারণ ভাবে ভাষার দুটি রূপ হয়, একটি হল কথ্যভাষা, অন্যটি লেখ্য বা লিখিত ভাষা, যা আমরা অর্থবোধক, নিয়মে সাজিয়ে গুছিয়ে কাগজে লিখে প্রকাশ করি। আর লোকের মুখ থেকে উচ্চারিত হয় বলে ব্যাপক অর্থে এই ভাষাকে মুখের ভাষা বা কথ্যভাষা বলে।

খুব ছোট্ট কথায় বলি যে, আমরা যে বাংলা ভাষায় কথা বলি এই ভাষার জন্ম নিয়ে রহস্য রয়েছে। অনেকেই বলেন যে, বাংলা ভাষার জন্ম হয় সংস্কৃত থেকে, কিন্তু এটি ভ্রান্ত ধারণা, বাংলা ভাষার জন্ম ‘মাগধী অপভ্রংশ’ থেকে। এই মাগধী অপভ্রংশের একটি শাখা থেকে জন্ম হয় ভোজপুরী, মৈথিলি, ও মগহী-র এবং আরেকটি শাখা থেকে জন্ম নেয় বাংলা, অসমিয়া ও ওড়িয়া। বাংলা ও অসমিয়া ভাষা অভিন্ন থাকলেও পরে দুটি স্বতন্ত্র ভাষা হয়। অর্থাৎ আমাদের মাতৃভাষা বাংলা জন্ম হল মাগধী অপভ্রংশ থেকে।

তবে বাংলা ভাষার ব্যবহার ক্ষেত্রে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার মানুষের মুখের কথ্য ভাষাকে বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম অথবা আবাদ ও লাট অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাকে কথ্যভাষার অন্যতম রূপ বলা যায়। আর এই ভাষা সম্প্রদায় হল প্রধানত হল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ। এনাদের মধ্যে বেশিরভাগ লেখাপড়া জানে না, আবার কেউ অল্প লেখাপড়া জানে, কিন্তু তাদের জীবনে তেমন কোনো উন্নতির ছাপ ফেলতে পারেনি। তাদের জীবন-জীবিকা সংক্রান্ত কথ্যভাষাই হল আদর্শরূপ। যেমন :- কেউ মাছ ধরে, কেউ বা মাটির জিনিস তৈরি করে, নৌকা চালায়, অনেকে মধু, মোম, কাঠ সংগ্রহ করে, কেউ মাঠে চাষ করে, লাঙল টানে এই ভাবেই তাদের জীবিকা অর্জন করে।

দক্ষিণ ব্বিশ পরগণায় বিভিন্ন প্রান্তে যেমন:-

ঝড়খালি, চুনাখালি, বাসন্তী, গোসবা, লেবুখালি, সোনাখালি, টেংরাখালি, মনসাখালি, ডাবু, সাতমুখী, পিয়ালি, হেড়োভাঙ্গা, গদখালি, ও বেশিরভাগ সুন্দরবন অঞ্চলের দিকে, মানুষেরা তাদের কাজকর্ম, গৃহস্থলী উৎসব, আমোদ- প্রমোদ, ও ক্রোধ -কলহ ইত্যাদিতে এমন কতগুলি শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করে আসছে যেগুলি এইসব অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এছাড়া তারা সমাজের মধ্যে মাননসই কিছু ভাষা, শব্দ, বাক্য,  গান, হেয়ালী, ধাঁধা, ও কৌতুক প্রভৃতি নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছে।

যেমন :- আওটানো-জ্বাল দেওয়া, আঙ্গার-আমাদের, দোকামালা-উড়কিমালা ডাল ঘাটার জন্য নারকোল মালা দিয়ে তৈরি, একনো-এখনো।
বাক্য ব্যবহার :- "একনো দুধটা আওটানো হলুনি।" "সাঁঝের বেলা আঙ্গার বাড়ি এস"। "দোকা মালা দে ডালটা ঘেঁটে নি"।

এই কথ্য ভাষাগুলি রূপান্তরিত ও নতুন নতুন শব্দের সৃষ্টির অন্যতম কারণ হল ধব্বনি উচ্চারণে বিকৃতি। উচ্চারণে ধব্বনি বিকৃতির ফলেই এখানকার মানুষের মুখের ভাষা পরিবর্তন হয়েছে। এতে নতুন কথ্য ভাষার রূপ তৈরি হয়েছে। আমরা একটু গ্রামের বা লাটের দিকে গেলে সেখানকার মানুষের মুখে মুখে এই রকম কথা হামেশাই শুনতে পাই। যেমন :- ঋতু-ইতু, মৃগী-মিরগি, লোক-নোক, লাউ- নাউ, লাল-নাল, লুট-নুট, লঙ্কা-নঙ্কা, লোহা -নোহা, লিচু- নিচু, ও লেখা-নেকা ইত্যাদি। এছাড়া কিছু ক্রিয়াপদের উচ্চারণ যোগে কথ্যভাষার বিকৃতি যেমন :- বলছে -বলতেছে, করছে -করতেছে, চলছে-চলতেছে, হাসছে-হাসতেছে, লিখছে-লিখতেছে ইত্যাদি বহু কথ্য ভাষা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মানুষেরা গ্রাম অঞ্চলে ব্যবহার করে।

এছাড়া এখানকার গ্রাম, আবাদে ও লাটের দিকে মানুষেরা ছড়া হেঁয়ালির মাধ্যমে কথ্য ভাষা ব্যবহার করে।
যেমন :-

"এক পালি ধানে দুপালি খুই।
 "বিছনে মোতার ঘর কই।
কুড়ুনির বেটা উড়ুনি গায়। 

  "এক পালি ধানে দুপালি খুই।
  বিছনে মোতায় ঘর কই।।

হেঁয়ালি:-
১. কাঁচা বেলায় তুপতাপ পাকলে সিঁদুর।
যেনা বলতে পারে তার বাবা বড় ইঁদুর :- কুমোর দের হাঁড়ি তৈরি করা, 
২.এক নৌকা সুপারি গুনতে নারে ব্যাপারী। :- আকাশে তারা।
৩.বন থেকে বেরল হুমো, তার গায়ে ডুমোডুমো :- কাঁঠাল।
৪.রাজার ছেলে ভোম্বল দাস, খায় ছেবেলা ফেলে শাঁস :- চালতা।
৫.হাজার চোখো ফল, তাড়াতাড়ি বল:- আনারস।
৬.আকাশ থেকে পড়ল জল
  ফলের মধ্যে শুধু জল :- শিলা।
৭. ওপারাতে বুড়ি মারল, এপারাতে গন্ধ এল :- কাঁঠাল।

তবে এইরকম বহু হেঁয়ালি আছে যেগুলো আমরা ছোট্টবেলায় শুনেছি বা বলেছি। বিভিন্ন সময়ে,  অথবা খেলার ছলে হোক, বা কাজের সূত্রে হোক।

এইরকম কত গ্রাম্য ছড়া, ধাঁধা, হেঁয়ালি ছড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গ্রামে-গঞ্জে, আবাদ ও লাটে। এগুলির মধ্যে দিয়ে এখানকার মানুষের কথ্যভাষার যেমন পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি এদের সহজ সরল জীবনচিত্র ফুটে ওঠে।

এইরকম বহু কথ্যভাষা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাধারণ মানুষের মুখে শোনা যায় ঠিকই, কিন্তু গ্রামীণ কথ্যভাষা আজকালকার শহরে লোকেদের কাছে হাস্যকর ছাড়া কিছু নয়। এই কথ্যভাষাগুলির মধ্যে রস সৌন্দর্য ও মনের ভাব রয়েছে। এখনও পর্যন্ত আমাদের মাতৃভাষা বাংলার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে এই গ্রামীণ কথ্যভাষাগুলি। তাই আজও বাংলার গ্রামে-গঞ্জে, আবাদে ও লাটের মানুষের মুখে মুখে এই রকম কথ্যভাষা শুনতে পাওয়া যায়।

Developed by DXDasia