গুরুসদয় মিউজিয়াম বন্ধ হওয়া বাঙালির লজ্জা

বাংলার শিল্পজগতের একটা বড় সম্পদ এই মিউজিয়াম

গুরুসদয় মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে – এই কথা প্রকাশ্যে আসতেই ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক, স্মৃতিচারণ। কিন্তু একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে, সত্যিই কি বাংলার মানুষ এই বিষয়ে চিন্তিত? বা কতজন মানুষ তাঁদের ছেলে-মেয়েদের বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ সংগ্রহশালা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন বা ঘুরতে গেছেন? প্রশ্ন উঠছে…

আপনি কি জানেন যে এই যাদুঘরটিতে সংরক্ষিত আছে অবিভক্ত বাংলার শিল্পকর্মের? আইসিএস অফিসার গুরুসদয় দত্ত বহু বছর ধরে গ্রামবাংলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন। এই যাদুঘর বন্ধ হচ্ছে, কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলে থেকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া বন্ধ করা হচ্ছে।

যাদুঘরের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি ডঃ বিজন মণ্ডলের কথায়, ‘যাদুঘরে বর্তমানে কর্মরত ১৩ জন। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে এখানকার কর্মচারীদের মাসিক বেতন দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি যাদুঘরের নিরাপত্তারক্ষী-কেও মাসিক বেতন দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত সংগ্রহশালা বন্ধ করে চলে যেতে আমরা পারছি না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের পক্ষে খুব কঠিন হচ্ছে।’

গতবছর ২৯ নভেম্বর কেন্দ্রীয় বস্ত্রশিল্প মন্ত্রক একটি চিঠি পাঠায় যাদুঘরকে। তারা জানায়, গুরুসদয় মিউজিয়াম হস্তশিল্প উন্নয়ন দপ্তরের অধীন তাই কেন্দ্রীয় বস্ত্রশিল্প মন্ত্রকের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। প্রতিবছর এই যাদুঘর দেখতে আসা দর্শনার্থীদের থেকে আয় হয় এক থেকে দুই লাখ টাকা। কিন্তু যাদুঘর চালাতে এবং ৩৩০০টি উপাদান সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন হয় প্রতি বছর ৪৬ লক্ষ টাকা। আগে কেন্দ্র সরকার থেকে ৪৫ লক্ষ টাকা পাঠানো হত। বাকি টাকা জোগাড় করতেন যাদুঘরের কর্মচারীরা স্ব-উদ্যোগে। কিন্তু এখন যদি পুরো টাকা আসা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে মিউজিজাম বন্ধ করতে হবে। শিল্পকর্মগুলিকে রক্ষা করতে নিলামে ওঠাতে হবে। বিজন মণ্ডলের কথায়, এই বিষয় নিয়ে তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক আলোচনা করেছেন। সংগ্রহশালা পরিদর্শনে আসার জন্য বাংলার মানুষদের অনুরোধ করেছেন। কিন্তু কোন মানুষের সাহায্য পাননি তাঁরা। এটা খুব দুঃখের বিষয় যে এই মিউজিয়ামের বাংলার শিল্পকলা রক্ষা করা যাবে না। পরবর্তী প্রজন্ম জানতেই পারবে না তাদের ঐতিহ্যকে।

এবার একটু দেখে নেওয়া যাক, এই ঐতিহ্যবাহী যাদুঘরে কী কী আছে যা বাংলার শিল্পজগতকে সমৃদ্ধ করে।

গুরুসদয় মিউজিয়ামের মধ্যেকার ঘরে সংগৃহীত আছে ছয় ধরনের হারিয়ে যাওয়া কাঁথা শিল্প। সুজানি, দুরজানি, বায়তান, আরশিলতা, রুমাল, এবং লেপ। কুমিল্লা জেলার সুজানি কাঁথার দুইদিকেই অপূর্ব এমব্রয়ডারি কাজ করা হয়। উনিশ শতকের এই কাঁথার মধ্যে উঠে এসেছে একটি দৃশ্যপট। যেখানে অন্দর মহল থেকে দেখা হচ্ছে বাহির মহলকে, শিকারের দৃশ্য, বন্য প্রাণী এবং ভারতীয় ও ব্রিটিশ সৈন্যদের। এখানে আছে ষোল শতাব্দী আঁকা পটচিত্র। অমূল্য পাম পাতার পাণ্ডুলিপি, হস্তাক্ষর এবং মুদ্রিত। ষোল শতাব্দীর প্রচুর পুঁথি, দশমহাবিদ্যা ও দশাবতার তাস। এইসব তাস খেলার সময় যেসব গান গাওয়া হত সেইগুলির তালিকাও সংগ্রহ আছে এখানে।

ঐতিহ্যবাহী এইসব অমূল্য সম্পদ রক্ষার জন্য প্রয়োজন অর্থের। নইলে বিলীন হয়ে যাবে কালের অতলে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় সরকার যাদুঘরকে একটি চিঠিতে জানায়, অনেক বছর ধরে সরকারের তরফ থেকে টাকা দেওয়া হয়েছে। তাই এখন যাদুঘর নিজেই নিজের খরচ চালাতে সক্ষম।

১৯৮৪ সালে, ব্রতচারী সমিতি ও ভারতের রাষ্ট্রপতির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে বলা হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পরে টেক্সটাইল মন্ত্রণালয় কর্তৃক  জাদুঘরের দেখাশুনা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করবে। কমিটির ১৫ সদস্যের মধ্যে ৮ জন সদস্য ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, কমিটির সভাপতি এবং অতিরিক্ত উন্নয়ন কমিশনার গত বছরের আগস্ট মাসে যাদুঘর পরিদর্শন করে যান। এবং তহবিল বরাদ্দ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।  এই সব প্রচেষ্টা এবং প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, চুক্তি প্রত্যাহারের চিঠি পাঠানো হয় ডিসেম্বর মাসে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়েছে যে, এই মিউজিয়াম এক লাভহীন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সুতরাং এই সংস্থা পরিচালনার ভার কেন সরকার নেবে? এই বিষয়ে আর্ট হিস্টোরিয়ান দেবদত্ত গুপ্তের কথায়, গুরুসদয় মিউজিয়াম বাংলার শিল্পজগতের একটা বড় সম্পদ। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে গুরুসদয় দত্ত আইসিএস অফিসার ছিলেন। অন্যদিকে তিনি ছিলেন স্বদেশী। ঠিক যেমন কৃষ্ণমোহন সেন ও যামিনী রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাংলার গ্রামগুলি থেকে শিল্প ও নৈপুণ্যের সন্ধানে গিয়েছিলেন, অনুরূপ গুরুসদয়ও বহু বছর ধরে এই কাজ করেছিলেন। এই সব সংগ্রহ বাংলার শিল্প ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটিকে বাঙালি হিসাবে আমি নিন্দা করি। বাংলার শিল্পকে অসম্মান করা হচ্ছে এতে। এটা অনেক বড় ক্ষতি।  

Developed by DXDasia