
১৯০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম গড়ে ওঠে পিৎজারিয়া বা পিৎজার দোকান
শুনলে অবাক লাগতে পারে – মেক্সিকান পিৎজা, আমেরিকান পিৎজা, কানাডিয়ান পিৎজা – এই এলিট নামজাদা খাবার পিৎজার শুরু কিন্তু অনুন্নত গরিব খেটে খাওয়া মানুষের হাত ধরেই। যা হয়ত অনেকেরই অজানা। বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন, আমেরিকাতেই হয়ত এর জন্ম। কিন্তু একেবারেই তা নয়। পিৎজার জন্ম ইতালিতে। গরিবের বিরক্তিকর দায়সারা খাবারটি কীভাবে চলে এল বিশ্বের এক নম্বর ফাস্টফুড ও ফানফুডের তালিকায় সেই গল্প কিন্তু বড়ই আশ্চর্যের।
'পিৎজা' হল গোলাকৃতি রুটির ওপর পনিরের প্রলেপ, টমেটোর সস, বিভিন্ন মশলা ও সবুজ সবজি সহযোগে তৈরি একধরনের সুস্বাদু খাবার। স্থান, সংস্কৃতি এবং রুচি ভেদে পিৎজায় আরো অনেক কিছু যোগ করা হয়, যেমন মাংসের টুকরো, পেঁয়াজ কুচি ইত্যাদি।
যে সময় ভারতীয়রা আগুনে পোড়ানো নান ও তন্দুরি রুটি খেতে অভ্যস্ত ছিল, সে সময় প্রাচীন মিশরীয়রা পাতলা রুটি বানানোর অভিনব কৌশল আবিষ্কার করে ফেলেছিল। আর প্রাচীন রোমানরা সেই পাতলা রুটির ওপর পনির, মধু, ও তেজপাতা লাগিয়ে খেত। তবে পারস্যে রুটির ওপর নানান রকমের মশলা দিয়ে খাওয়ার চল ছিল এর অনেক আগে থেকেই। মনে করা হয়, এভাবেই নাকি এসেছিল পিৎজার আইডিয়া।
আবার প্রাচীন গ্রিসের অধিবাসীরা পাতলা রুটির ওপরে তেল, মশলা, বিভিন্ন সবজি, পনির এসব দিয়ে খাওয়া পছন্দ করত। এই ধরনের পাতলা রুটিগুলি ‘প্লাকোনাটস’ নামে পরিচিত ছিল। যা থেকে এসেছিল 'পিৎজা'।
এবার জেনে নেওয়া যাক কীভাবে এল আজকের আধুনিক পিৎজা।
একসময় গ্রিক উপনিবেশে গড়ে উঠেছিল ইতালির নেপলস শহর, যা পরে ‘উন্নয়নশীল নদী সরোবরের শহর’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই নেপলস ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য। কিন্তু এখানকার মানুষজন ছিল খুবই গরিব। এখানকার জনগণের বেশিরভাগ সময়ই কাটত বাইরে কাজ করে। তাদের ঘরে থাকার ফুসরত ছিল না। সেকারণে তাদের খাবার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন কিছু, যা কম খরচে ও কম সময়ে দ্রুত খেয়ে ফেলা যায়। আনুমানিক ১৬০০ সালের কথা, তাদের রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে ছোট ভ্রাম্যমান দোকানে শুরু হয় সমতল রুটির উপর বিভিন্ন সস, সবজি এসব দিয়ে তৈরি একপ্রকার খাবার বিক্রি। যা পথচলতি মানুষ সহজেই খেতে পারবেন। এই খাবারই হল আজকের আধুনিক পিৎজার প্রথম রূপ। তবে অনেকই পথচলতি মানুষদের এভাবে খাদ্য গ্রহণের পদ্ধতিকে ‘বিরক্তিকর’ বলে মনে করতেন।
১৮৩০ সালের আগে পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচেই বিক্রি চলত এই পিৎজার। নেপলসের প্রথম পিৎজার দোকানটির নাম সম্ভবত ‘অ্যান্টিকা পিৎজারিয়া পোর্ট-অ্যালবা’। দোকানটি এখনও রয়েছে।
বিভিন্ন নামের ও বিভিন্ন ধরনের পিৎজাগুলি কীভাবে এসেছে এবার তারই এক-আধটা গল্প শোনা যাক।
ইতালির এক নাবিকের সহধর্মিণী লা-ম্যারিনারার স্বামী ছিলেন নাবিক। তিনি যখন সমুদ্রযাত্রা শেষে বাড়ি ফিরে আসতেন তখন ম্যারিনারা তাঁকে পিৎজা বানিয়ে দিতেন। যে পিৎজা পরবর্তীকালে ‘ম্যারিনারা পিজ্জা’ নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
আরও পড়ুন
মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’-র গল্প
এবার ১৭৬০ সালের ঘটনা। নেপলস-এ ‘দ্যা পিয়েট্রো পিৎজারিয়া’ নামে একটি পিৎজার দোকান গড়ে ওঠে। পরে দোকানটির নাম হয় – ‘পিৎজারিয়া ব্র্যান্ডি’। তো ১৮৬১ সালে ইতালি সমন্বিত হবার পর রাজা প্রথম আম্বারটো এবং রানি মার্গারিটা ইতালি ভ্রমণে বের হন। তাঁরা ১৮৮৯ সালে নেপলসে আসেন। শোনা যায়, রাজা-রানি তাদের একঘেয়ে ফরাসি খাবারের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেন। বলেন শহরের ঐ ‘পিজ্জারিয়া ব্র্যান্ডি’ দোকান থেকে পিৎজার মালমশলা সংগ্রহ করে আনতে ও পিৎজা বানাতে।
রাজ আদেশ বলে কথা। রাফায়েলে এস্পোসিটো নামে এক রুটির কারিগরকে আনা হল পিৎজা বানানোর জন্য। রাফায়েলে বিশেষ ধরনের এক পিজ্জা তৈরি করলেন – সাদা মোজারেলা পনির, লাল টমেটো সস এবং সবুজ পুদিনা পাতা দিয়ে সুসজ্জিত পিৎজা। এই পিৎজাতে তিনি ইতালির পতাকাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেন এবং পিৎজার নাম দিলেন 'পিৎজা মোজারেলা'।
রানিকে পরিবেশন করা হল সেই সুসজ্জিত পিজ্জা। রানী পিৎজা দেখে ও খেয়ে অভিভূত। পিৎজার স্বাদে অভিভূত হয়ে রানি সর্বস্তরে পিজ্জার প্রসারের কথা বললেন। তারপর থেকে এই ধরনের উপাদান সমন্বিত পিৎজা রানি মার্গারেটের নামে ‘মার্গারিটা পিৎজা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
নেপলসের মানুষেরা বিভিন্ন কারখানায় কাজের জন্য ও ব্যবসা করার তাগিদে আমেরিকা গিয়েছিল। আর তাদের সাথে গিয়েছিল সুস্বাদু পিৎজা বানানোর কৌশল। আর সেখান থেকেই গরিব মেহনতি মানুষের খাবার পিৎজা নেপলস শহর থেকে ধীরেধীরে ছড়িয়ে পড়ল নিউইয়র্ক, বোস্টন, শিকাগো সহ আমেরিকার বিভিন্ন শহরে।
যে বিশেষ ধরনের দোকানগুলোতে পিৎজা বিক্রি হয়, তা মূলত 'পিৎজেইরা' বা 'পিজারিয়া’ নামে পরিচিত। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরণের দোকান 'পিৎজা পার্লার', 'পিৎজা প্লেস', এবং 'পিৎজা শপ' নামে পরিচিত।
১৯৫০ সালের শেষের দিককার কথা। কানাডাতেও পিৎজা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, গড়ে ওঠে ছোট ছোট পিৎজা ক্যাফে।
শোনা যায়, ১৯০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম পিৎজারিয়া বা পিৎজার দোকান গড়ে ওঠে মানহাটানের স্প্রিং স্ট্রিটে। এর নাম দেয়া হয়েছিল এর প্রতিষ্ঠাতা জেনারো লোম্বারডি এর নামানুসারে ‘জি লোম্বারডিস’। এটি ছিল লাইসেন্সযুক্ত পিৎজার দোকান।
<'পিৎজা হাট 'একটি মার্কিন রেস্টুরেন্ট বিজনেস চেইন এবং আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি। যারা পিৎজা, স্যালাড, পাস্তা ইত্যাদি প্রস্তুত করে। এক তথ্য থেকে জানা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০০-এর বেশি পিৎজা হাট রেস্তোরা এবং বিশ্বের অন্য ৯৪টি দেশে ৫,১৩৯টির বেশি 'পিৎজা হাট' রয়েছে। ভাবা যায়!
এরপর ১৯৫৯ সালে ‘লিটল সিজারস’, ১৯৬০ সালে ‘ডমিনোস’ এবং ১৯৮৯ সালে ‘পাপা জনস’ এর মতো বিখ্যাত পিৎজা কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠার পর পিৎজা পৌঁছে যেতে থাকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে। 'পিৎজা হাট' এবং 'ডমিনোস' বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে শাখা সৃষ্টির মাধ্যমে পিৎজা তৈরিতে সুখ্যাতি লাভ করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পিৎজার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়, সহজলভ্য খাবার হিসেবে। শহর থেকে শহরতলি, পূর্ব থেকে পশ্চিম, সবদিকেই পিৎজার জয়জয়কার। 'পিৎজা' যা ছিল নেপলসের ‘গরিবের খাদ্য’ তা আজ 'ফাস্টফুড' এবং 'ফানফুডে'র তালিকায় বিশ্বের এক নম্বরে। আর আট থেকে আশি জনপ্রিয়তার নিরিখে 'পিৎজা'র সাফল্য অবশ্যই আকাশছোঁয়া।।
