ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের সাজও বর্তমান প্রজন্মের কাছে স্টাইল আইকন

ঠাকুরবাড়ির সকল পুরুষদের পোশাকে দুর্দান্তভাবে মুসলমান প্রভাব স্পষ্ট

‘যেমন আছো তেমনি এসো আর কোরো না সাজ’— কথাটি রবীন্দ্রনাথ খুব আবেগের সঙ্গে ব্যবহার করলেও ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ক্ষেত্রে তো নয়ই, ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের ক্ষেত্রেও একথা খাটে না। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি তো এক জমকালো রূপকথার মতো। কত যে নতুন কাণ্ড ঘটে গেছে ওই বাড়িটিকে কেন্দ্র করে। আজকের কথকতার কেন্দ্রে থাক ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যদের সাজপোশাক। তাঁদের বিলাসিতার কাহিনি গল্পের চেয়ে কম আকর্ষক নয়।

ঠাকুরবাড়ির যে পুরুষ প্রথম ‘প্রিন্স’ উপাধি পেয়েছিলেন, তাঁর সাজপোশাকের কথাই বলি প্রথমে। এক এক সময় এক এক রকম সাজে তাঁকে দেখা যেত। কালো মখমলের জামা, গলায় মোটা সোনার চেন, তাতে লকেট হিসেবে ছিল মহারানি ভিক্টোরিয়ার দেওয়া স্বর্ণপদক। ভারতীয় সংগ্রহালয়ে দ্বারকানাথের ব্যবহৃত দুটি সোনার নকশায় বাঁধানো রঙিন কাজ করা হাতির দাঁতের বাজুবন্ধ, মুক্তোর মালা, হিরের কণ্ঠির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। সব গয়নাতেই মুঘল চিত্রকলা ছাপ ফেলে গিয়েছে। দ্বারকানাথের পুরোনো ছবিতে শামলা আঁটা বাবরি চুল, পরণে জড়ির কাজ করা মখমলে জোব্বা, জমকালো কাশ্মীরী শাল— দ্বারকানাথের ছিল এমন অভিজাত সাজপোশাক। রামলোচন ঠাকুরের, উমানন্দন ঠাকুরের সাজ ও শৌখিনতা সেকেলে বাঙালিদের কাছে অনুকরণের বিষয় ছিল।

দ্বারকানাথ ঠাকুর, মাথায় পাগড়ি

আপামর বাঙালি তখন ধুতি পরলেও ঠাকুরবাড়ির পুরুষরা পরতেন পাজামা ও পিরহান। উৎসবের দিন পরতেন নীল কোর দেওয়া তিন আঙুল চওড়া পাড়ের দেশি তাঁতের ধুতি ও জড়ি দেওয়া সিপাই পেড়ে ধুতি। রমানাথ ঠাকুরের আঙুলে থাকত প্রিন্স অফ ওয়েলেসের দেওয়া সোনার আংটি। রমানাথ ঠাকুরের বিরাট এক শ্বেত পাথরের মূর্তি রয়েছে গ্রিসের প্যারোস দ্বীপে। রমানাথ ঠাকুর চোগা চাপকান পরা আর মাথা রয়েছে পাগড়ি। প্রসন্নকুমার ঠাকুরের বিয়ের দিন গোপীমোহন ঠাকুরের একটি হিরের আংটি খোওয়া যায়। অর্থাৎ কিশোর বর ওই হিরের আংটি পরেছিলেন। প্রসন্ন কুমারের মূর্তিটি রয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলের বারান্দায়। ঠাকুর পরিবারের মতো পাগড়ি, চাপকানআর ট্রাউজার, পায়ে জুতো, হাতে বই। দেবেন্দ্রনাথের বরবেশে আঁকা একটি ছবি পাওয়া যায়। একথা উল্লেখ করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। দেবেন্দ্রনাথের তখন ষোলো  বছর  বয়স। সলমা চুমকি দেওয়া কিংখাবের পোশাক পরা সে ছবি নাকি দেবেন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে দেখতেন। জগদ্ধাত্রী ভাসানের সময় তিনি যে বেশভূষায় আসতেন তা অনেকে অনুকরণ করতেন। সেকালে বড়োলোকেদের সাজ ছিল বড়ো বেশি। তাঁরা অত্যধিক গয়না পরতেন। 

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, গায়ে বাহারি কারুকাজের শাল

এই প্রসঙ্গে দেবেন্দ্রনাথের সম্পর্কে একটা গল্প মনে পড়ে। শোভাবাজার রাজবাড়ি থেকে নিমন্ত্রণের ডাক এসেছে। সকলের কৌতূহলের কেন্দ্রে সেদিন ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ, তাঁর সাজপোশাক। দেবেন্দ্রনাথ সেদিন আগাগোড়া সাদা পোশাক পরলেন। মাথায় দিলেন পাগড়ি। আর পায়ে পরলেন মুক্তো বসানো মখমলের জুতো। পা দুটি বের করে আরাম করে বসলেন দেবেন্দ্রনাথ। সকলে সেদিন যা মাথায় রেখেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ তাই রেখেছিলেন পায়ে। দেবেন্দ্রনাথের ছোটো ভাই নগেন্দ্রনাথ সাধারণত। কোট প্যান্ট পরতেন, তবে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণে তাঁর বহুমূল্য সবুজ শালের কথা জানা যায়। অভিনয়ের জন্য ঈশ্বর মুখুজ্যের দাড়ি রাখা দেখে দাড়ি রেখেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। তারপর সেটাই সকলে অনুকরণ করতে থাকেন। এর মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথের কাগজের জোব্বার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। দুটো কোট সোজা উল্টো করে পরতেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। বোতাম আটকানো বন্ধের জন্য। এর সঙ্গেই হঠাৎ আজব খেয়াল চাপলো আর নানারঙের কাগজ জুড়ে জোব্বা বানালেন তিনি। সে জোব্বা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়েও এলেন। রবীন্দ্রনাথ তো বরাবর নিজস্ব স্টাইলের জন্য অনুকরণীয়। তাঁর বিয়ের সময়কার চমকালো রংচঙে শালের উল্লেখ করেছেন অনেকেই। পরবর্তীকালে যে জোব্বা পরতেন রবীন্দ্রনাথ তা মুসলমান দরজিরা তৈরি করে দিতেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরনে জোব্বা

ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের এইসব সাজের গল্পও এখনকার স্টাইল আইকন। তবে এইসব পোশাকে মুসলমান প্রভাব স্পষ্ট। একটি প্রশ্ন মনে রয়ে যায়। কখনো কি ঠাকুরবাড়ির পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মুসলমান কারো সংসর্গ হয়েছিল? সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর জ্ঞানদানন্দিনীদেবীকে লেখা একটি চিঠিতে এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত করেছিলেন। কারণ যাই হোক, ঠাকুরবাড়ির পুরুষদের এই বিশেষ সাজ সেকালে শুধু নয়, একালেও নয়নভুলানো এক সংবেদন তৈরি করে। 

তথ্য ঋণঃ
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল, চিত্রা দেব
ঠাকুরবাড়ির সাতকাহন, শান্তা শ্রীমানী

Developed by DXDasia