উত্তরবঙ্গের প্রাচীন মেচ জনজাতি

একসময় মেচি নদীর দু-তীরে বসতি স্থাপন করে তারা

তাদের অনেকেই এখন রবীন্দ্র সঙ্গীত বা নজরুল গীতি গাইতে পারেন বেশ ভালো ভাবেই। তাদের কেউ আজ ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার। কেউ আবার স্কুল শিক্ষক। যদিও এর মধ্যেই তারা তাদের কিছু কিছু ঐতিহ্যের গান বা নাচ বজায় রেখেছেন। কিন্তু তাদের নাচ গানের বহু কিছু আবার আজ হারিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে বিশ্বায়নের জেরে তাদের অনেক ঐতিহ্যের পোশাকও হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যের কৃষি কাজও আর করতে চাইছে না। মাছ ধরাতেও অনেকের অনীহা। উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জনজাতি মেচদের অনেকেই হাজার বাধার পরও আজও তাদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে।

নিম্ন অসমে তারা ‘বরো’ উপজাতি হিসাবে পরিচিত। আর উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার থেকে ডুয়ার্স, তরাই অঞ্চল ও নেপালের কিছু অংশে তারাই ‘মেচ’ নামে পরিচিত। কিন্তু কীভাবে তারা এলেন উত্তরবঙ্গে, উত্তরবঙ্গের প্রান্তভূমির জনজাতি ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে লেখক মহেন্দ্র দেবনাথ জানাচ্ছেন, বর্মী তিব্বতীয় ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বড়ো জাতি মায়ানমার সীমান্তের পাটকাই পর্বত অতিক্রম করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে উত্তর পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেছে। তারা দিনের পর দিন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বসবাস করে নিজস্ব শাসনতান্ত্রিক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছিল। সময়ের নিয়মে বৃহৎ বরো জাতি উত্তরবঙ্গে চারটি মূল ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এরা হল, মেচ, কোচ, রাভা, গারো প্রভৃতি। এই বড়োদেরই একটি গোষ্ঠী নেপালের পশ্চিম অংশে মেচি নদী পর্যন্ত গিয়ে তার দুই পাশে বসতি স্থাপন করে। আর তারা নেপাল থেকে তরাই, ডুয়ার্স এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এরাই মেচ নামে পরিচিতি লাভ করে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ডঃ ইছামুদ্দিন সরকার এবং গবেষক অশোক গঙ্গোপাধ্যায় মেচদের ওপর এক আর্থ-সামাজিক সমীক্ষার পর জানাচ্ছেন, মেচ সহ অন্য উপজাতিরা তরাই অঞ্চলে কৃষিকাজ, মাছ ধরায় পারদর্শী ছিল। কিন্তু যতই তরাই অঞ্চলের গুরুত্ব বাড়তে থাকে ততই এদের জীবনধারায় পরিবর্তন ঘটতে থাকল। ইংরেজ আসার সঙ্গে সঙ্গে যখন এই এলাকায় ছোটখাটো নগর সভ্যতার উন্মেষ ঘটতে থাকল তখন সেই অবস্থার সাথে তারা সমান তালে চলতে পারল না। ফলে এখানকারই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাদের পলায়ন শুরু হল। নকশালবাড়ি অঞ্চলে যত বেশি বর্তমান সভ্যতার ছোঁয়া এসেছে তারা ততো বেশি বনের ধারে বা জলজ ভূমির খোঁজে নতুন জায়গায় বসতবাড়ি করেছে।

এরপর দার্জিলিং-এ চা বাগিচা শিল্পের সূচনা হয় পার্বত্য অঞ্চলে ১৮৪০ সালে এবং তরাই অঞ্চলে ১৮৬২ সালে। আর চা বাগান শুরু হতেই বাইরে থেকে নিয়ে আসা শুরু হল শ্রমিকদের। তার সঙ্গে জোতদারেরা তাদের জমি চা বাগানে বিক্রি করতে শুরু করল। ফলে সেই সময় কৃষি নির্ভর মেচদের জীবনেও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসা শুরু হল। ব্রিটিশদের চা বাগানে আধিপত্য, তাদের ব্যবসা নীতির জেরে মহাজন শ্রেণী, শ্রমিক ঠিকাদার এইসব নাম চলে এল। ইংরেজদের আইনের জেরেই পুরানো কৃষি পদ্ধতি ঝুম চাষ বাতিল হতে থাকে। এর পর এই এলাকায় চলে আসে কৃষক আন্দোলন। ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলনের প্রভাব খুব সামান্য হলেও এই অঞ্চলে পড়তে থাকে। তেভাগার পর শুরু হল বিপ্লবী কৃষক আন্দোলন বা নকশাল আন্দোলন। বহুদিনের নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য সেই নকশাল আন্দোলনে যোগ দেয় মেচ, ধিমাল, থারুরা। কিন্তু সেই আন্দোলন মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তা সেভাবে সফল হয়নি। আর তার জেরে মেচ সহ অন্যদের আর্থ সামাজিক জীবনে আঘাত আনল। তার বাইরে নদী ভাঙন, প্রাকৃতিক সমস্যাও তাদের বসতি স্থাপনে বিচ্ছিনভাবে প্রভাব ফেলে।

১৮৭৬ সালে ডাবলু ডাবলু হান্টার যে স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গল  তৈরি করেন তার ৪৫ নম্বর পৃষ্ঠা এবং পরবর্তীতে অন্য তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে তরাই অঞ্চলে মেচদের একটি সংখ্যার তালিকা, সেই তালিকা বলছে, ১৮৭৬ সালে তরাই এলাকায় মেচদের সংখ্যা ছিল ৮৯৩ জন, ১৯০১ সালে তা নেমে আসে ৩৪০ এ, ১৯৩১ সালের সেই হিসাব বলছে ৩৭৯, ১৯৪১ সালে আবার নেমে হল ২৭২ এবং ১৯৫১ ও ১৯৬১ সালের হিসাবে সেই সংখ্যা যথাক্রমে ২২৪ ও  ১৩৪। লেখক অশেষ কুমার দাসের উত্তরবঙ্গের দলিত জাতি ও উপজাতি বিষয়ে লেখা থেকে ২০০১ সালের আদম সুমারি অনুযায়ী জানা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গের মোট জনসংখ্যা এক কোটি সাতচল্লিশ চব্বিশ হাজার ৯৪০ জন। আর ৪৪১৩২৩৯ জন তফশিলি জাতি ও ১৪৫৪৩৩০ তফশিলি উপজাতি ভুক্ত মানুষ। এখানে তফশিলি জাতির ৫৩টি শাখা রয়েছে আর তফশিলি উপজাতির ৩৫টি শাখা রয়েছে। সেই আদমশুমারিতেই প্রকাশ দার্জিলিং জেলায় মেচদের সংখ্যা হয়েছে ২১৫৯ জন। জলপাইগুড়ি জেলায় এই সংখ্যা ৩২৯১২ জন, কোচবিহারে তাদের সংখ্যা ১৬৭ জন, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ৪ ও মালদহে ৩ জন। জলপাইগুড়ি জেলায় তাদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে তাদের টিকে থাকা আজ বড় চ্যালেঞ্জ।

আলিপুরদুয়ার লাগোয়া শালকুমার হাটের বাসিন্দা তথা স্কুল শিক্ষক সুবল কারজি নিজে মেচ সম্প্রদায়ের। তিনি শালকুমারহাট হাই স্কুলে বাংলা পড়ান। তিনি মেচদের নাচ টিকিয়ে রাখতে নাচের একটি টিম তৈরি করেছেন। তিনি নিজে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে পারেন। তার দুই মেয়ে মৌমিতা ও মন্দিরা রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখেছে। তিনি জানালেন, মেচদের নতুন প্রজন্ম আর মেচ গান, মেচ নৃত্য শিখতেও চাইছে না। তবে তিনি তার মেচদের নিয়ে কিছু নাচগান বিভিন্ন স্থানে মঞ্চস্থ করছেন। বসন্ত উৎসবের সময় তারা পরিবেশন করেন মেচদের ঐতিহ্যময় বাগুরুমা নৃত্য। বর্ষবরণের সময় বৈশাখে তারা করেন বৈশাগু। তার বাইরে তাদের আছে যুদ্ধের নৃত্য সত্রালি। মাছ শিকারের জন্য তাদের নাচ গান আছে, সেটা হল না-গুরনায়। সামনে মাছ রাখার পাত্র রেখে সেই ঐতিহ্যের নাচ হয়। ধান রোপনের সময় তাদের গান হল, মায়গায়নায়। তবে নবান্নের সময় এই অঘ্রাণে তাদের গান নাচ ছিল, কিন্তু তা আজ হারিয়ে গিয়েছে। এতো গেল তাদের সংস্কৃতির কিছু কথা। তাদের মহিলারা আজকাল বাঙালিদের মতো শাড়ি পড়েন। তবে তাদের ঐতিহ্যের অনুষ্ঠান হলে ঐতিহ্যের  পোশাক ডোকনা পড়েন। ওড়নাকে তারা বলেন আরনাই । তাদের পুরুষরা তাদের ঐতিহ্যের অনুষ্ঠান হলে তাঁতে বোনা এক ধরনের গামছা পড়েন। তার সঙ্গে একরকম জওহর কোট শরীরে থাকে। মাথায় মাফলারের মতো কাপড় বেঁধে নেওয়া হয়। খাবারের মধ্যে বাঙালিদের মতো সব খাবার তারা খান। তবে শুয়োরের মাংস প্রিয় খাবার। শিলিগুড়ি মহকুমার তরাই অঞ্চলে কিছু মেচ লোকজন ছড়িয়ে আছেন। মাটিগাড়া এলাকার তালুক জোতের ৮৫ বছর বয়স্ক বলেন শৈব্য জানালেন, আগে তাঁরা এক টাকায় চার কেজি চাল কিনেছেন। এক টাকায় পাঁচ কেজি মাছ কিনেছেন। জমিতে গোবর সার দিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন অনেক কেমিক্যাল সার। তা খেয়ে রোগব্যাধি বাড়ছে। আগে ম্যালেরিয়া আর নিউমোনিয়া ছিল। তাও জড়িবুটি খেলেই সেরে যেত। এখন তো প্রেসার, সুগার ছাড়া আরও কত রোগ। তিনি আগেই গামছা পড়ে খালি গায়ে বাড়িতে থাকতেন। এখনও থাকেন। রোগব্যাধি সেভাবে নেই। এখন তাদের ছেলেমেয়েরা প্যান্ট শার্ট পড়ে। জন্মের পর আগে তারা উলঙ্গ থাকতেন। এখন জন্ম থেকেই প্যান্ট শার্ট।

ঐ গ্রামেরই যুবক উদিল কারজি জানালেন, তিনি নিজে পকেটের পয়সা খরচ করে মেচ সংস্কৃতি প্রসারে টিম তৈরি করেছিলেন। কিন্তু টাকার অভাবে তা ধরে রাখতে পারেননি। তাই তিনি এখন পশ্চিমি গান, পশ্চিমি নাচ নিয়ে মেতেছেন। তার সঙ্গে মেচ, রাভা, টোটোদের তিনি ক্যারাটে, বক্সিং শেখাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গিয়ে। তবে তাদের গ্রামে অনেক বাড়িতেই আজকাল কালী মন্দিরও আছে। তাদের আদি ধর্ম বাথৌ। বিশ্ব জগত সৃষ্টির পূর্বে অবং নামে মহাপরাক্রমশালী এক দেবতার অস্ত্বিত্ব স্বীকার করা হয়েছে বাথৌ ধর্মে। তিনি নিরাকার, অনাদি অনন্ত। হিন্দু ধর্ম বিকাশের আদিম অবস্থায় তাদের মধ্যে মূর্তি পুজোর প্রচলন ছিল না। ফণীমনসা বা সিজ গাছকে দেবতা হিসাবে তারা পুজো করেন। ফণীমনসা গাছকে পূজা বেদিতে বসিয়ে তারা শিবের প্রতীক হিসাবে পুজো করেন। ব্রিটিশরা আসার পর তাদের হাত ধরে উত্তরবঙ্গের চা বাগানে মিশনারিরা চলে আসে। আর সেই সময় তাদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রসারও ঘটে। অতীতে তিস্তা নদীর ভাঙন ও প্লাবন থেকে নিজেদের বাড়ি ঘর বাঁচাতে তিস্তাবুড়ি বৃক্ষপূজাও মেচ জনজাতির প্রকৃতি পূজার অন্তর্ভুক্ত। তবে মাটি গাড়ার তালুক জোত ও তার আশপাশে কিছু মেচ জনজাতির মানুষ বসবাস করে। তাদের উঠোনে মন্দিরের সামনে ফণীমনসা গাছ দেখা গিয়েছে। আগের মতো তাদের বাড়িঘর আর সকলের কাঁচা মাটির বা ছনের ঘর নেই। প্রায় সকলের ঘর সেখানে পাকা। শহুরে হাওয়া তাদের মধ্যে লেগেছে। দুই এক জনের ঘর ঐ এলাকায় এখনও কাঠের বা টিনের ছাউনি দেওয়া। বয়স্ক পুরুষ বা মহিলারা পুরানো ঐতিহ্যের পোশাক পড়ে আছেন, দেখা গিয়েছে।

Developed by DXDasia