এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির মেয়ে সরলাদেবী

সরলাদেবী, ঠাকুরবাড়ির অন্যতম এক প্রতিবাদী মেয়ে

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বিয়ে করে অনেক ব্রাহ্মণ যুবকদের ত্যাজ্যপুত্র হতে হয়েছিল। কারণ ঠাকুরবাড়ি ছিল পিরালী ব্রাহ্মণ। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়লে জাতিচ্যুত হতে হয়— এমনটাই ছিল বিশ্বাস। ফলে ঠাকুরবাড়ির বেশিরভাগ মেয়েই পরিবারসহ ঠাকুরবাড়িতেই থাকতেন। ব্যতিক্রম ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তাঁর স্বামী জানকীনাথ ঘোষালকেও স্বগৃহ থেকে ত্যাজ্য তকমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ এবং স্বকীয়তার কারণে বিয়ের আগে দেবেন্দ্রনাথের কথা মতো ব্রাহ্মধর্মও গ্রহণ করেননি। আবার স্ত্রীকে নিয়ে ঠাকুরবাড়িতেও থাকেননি। স্বর্ণকুমারীও সরস্বতীর বরপুত্রী ছিলেন। কলম আর শব্দ — এই দুই ছিল তাঁর সারাজীবনের সঙ্গী। এমন দুই দৃপ্ত মানুষের সন্তান সরলা দেবী। বাবার আত্মমর্যাদাবোধ, স্বকীয়তা আর মায়ের শিল্পীমন উত্তরাধিকার সূত্রে এই দুই-ই পেয়েছিলেন তিনি। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ থাকলেও, রবীন্দ্রনাথকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করলেও নিজের বক্তব্যকে সারাজীবন জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন সরলাদেবী। হতে পারে ছোটোবেলার একাকিত্ব তাঁকে নিজের মতো হয়ে ওঠার অবকাশ দিয়েছিল। মায়ের সাহচর্য তেমন না পেয়ে দাসির কাছেই শৈশবের অনেক মুহূর্ত কেটেছে। 

‘জীবনের ঝরাপাতা’য় পরে মা সম্পর্কে  লিখেছিলেন সরলা দেবী, ‘তিনি আমাদের অগম্য রাণীর মতো দূরে দূরে থাকতেন।’ রক্ষিণী দাসীর অতিশাসন তাঁর ছোটোবেলায় রীতিমতো বিভীষিকা ছিল। সেইসব মুহূর্ত পেরিয়ে বেথুন স্কুলের ছাত্রী হলেন সরলাদেবী। একেবারে বিএ পাশ করে বেথুন থেকে বেরোলেন। সেই আমলে এ বড়ো কম কথা নয়। ছোটো থেকেই গানে খুব দখল ছিল তাঁর। পিয়ানো বাজাতেন বড্ড ভালো। বারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ পিয়ানোতে প্রকাশ করে সকলকে অবাক করে দিয়েছিলেন সরলা। অনেক বাউল গান সরলার কন্ঠে শুনে রবীন্দ্রনাথ সেই সুর ভেঙে নতুন করে গান রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। গানগুলির মধ্যে ‘কোন আলোকে প্রাণের প্রদীপ’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘আমার সোনার বাংলা’ এইসব গান উল্লেখযোগ্য। সরলার সাহিত্যের রুচিও তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। থিয়োসফি চর্চায় খুব উৎসাহ ছিল সরলার। অতিলৌকিক সবকিছুই বারবার আকৃষ্ট করেছে সরলাকে। সেই কারণেই ব্রাহ্মদের মতো সম্পূর্ণ নিরাকারবাদী হতে পারেননি তিনি। রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীতগুলি কেবলমাত্র নিরাকার ব্রহ্মকে ভেবেই লেখা কীনা, এই বিষয়েও প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। আবার রবিমামার জন্মদিনের প্রথম উদ্যোগ এই সরলা দেবীরই নেওয়া। জ্ঞানদানন্দিনীদেবীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন সরলাদেবী। নিজেও বিপুল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সারাজীবন, আর আধুনিক মনস্ক যেকোনো মেয়ের কাছে নত হয়েছেন সরলাদেবী।

শান্তিনিকেতনে গিয়ে যেন তাঁকে লেখা পেয়ে বসল। ‘সখা’ পত্রিকায় লিখতে শুরু করলেন নিয়মিত। এরপর ‘বালক’, ‘ভারতী’ ইত্যাদি পত্রিকাতেও লেখা বেরলো। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিলেন সরলা। সংস্কৃত সাহিত্যের উপর লিখেছিলেন অনেক প্রবন্ধ। 

একটা সময় সরলা ঠিক করে নিয়েছিলেন অবিবাহিত থাকার। জ্ঞানদানন্দিনী তাঁর বিয়ে তলোয়ারের সঙ্গে দিয়ে তাঁকে দেশের কাজে নিয়োজিত হতে বলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে মায়ের একান্ত ইচ্ছায় আর দিদির উদ্যোগে সরলাদেবীর বিয়ে হয় পাঞ্জাবি সংস্কারক রামভজ চৌধুরীর সঙ্গে। লাহোরে ছিল তাঁর শ্বশুরবাড়ি। তাঁর স্বামী উগ্রপন্থী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু সরলাদেবী জীবনের একটি পর্বে মহাত্মা গান্ধির আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। গান্ধিজি লাহোরে এসে সরলার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। দাম্পত্যজীবনের পরিসমাপ্তি হয় রামভজ চৌধুরীর হঠাৎ মৃত্যুর সঙ্গে। তবে তাঁর দাম্পত্যের বর্ণনা পাওয়া যায় ইন্দিরাদেবীর স্মৃতিকথায়। তাঁর রান্নাঘরে হিন্দু ও মুসলমান একসঙ্গে রান্না করত। তখনকার সময় এ ছিল উল্লেখ করার মতো উদারতা। স্বামীর মৃত্যুর পর কলকাতায় এসে সরলাদেবী বিপুল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সাহিত্য সেবা ও জনহিতকর কাজে মগ্ন হন। ভারতী পত্রিকার সম্পাদনা, ভারত স্ত্রী মহামণ্ডলের কলকাতা শাখার কাজের ভার, নারীশিক্ষার জন্য একটি শিক্ষাসদন, ছাত্রীনিবাস ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর আচার্য বিজয়কৃষ্ণ দেবশর্মার সঙ্গে পরিচয় ও তাঁর শাস্ত্রব্যাখ্যায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে গুরুপদে বরণ করেন। ব্রাহ্ম পরিমণ্ডলে বড়ো হওয়া, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্রীর পক্ষে এ এক বিপ্লব। সরলাদেবী সারাজীবন নিজের জীবনচর্যায় বিপ্লবের ফুল ফুটয়ে গিয়েছেন। পুরোনো দিনের মেয়েদের কাছে তিনি মুক্ত দখিনা বাতাস, ছদ্মবেশী সরস্বতী। 

গ্রন্থঋণঃ
জীবনের ঝরাপাতা, সরলাদেবী

Developed by DXDasia