
সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ দেওর হতেন হেমলতাদেবীর
ঠাকুরবাড়ি সরগরম। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর গরম লুচির থালা সামনে নিয়ে রেগে অস্থির। ঘি চপচপে লুচি তিনি কিছুতেই খাবেন না। হুকুম জারি করলেন, জল দিয়ে লুচি ভেজে আনার জন্য। এমন আজব কাণ্ড তিনি মাঝেমধ্যেই করতেন। সকলে চিন্তায় পড়ল। তখন এগিয়ে এলেন দ্বিজেন্দ্রনাথের ছেলের বউ হেমলতাদেবী। ঘিয়ের বদলে শুকনো ময়দা দিয়ে বেলে লুচি ভেজে আনা হল। দ্বিজেন্দ্রনাথের মুখে ইচ্ছেপূরণের হাসি। তারপর হেমলতাদেবীর কাছে আসল গল্প শুনে শিশুর সারল্যে স্বীকার করলেন, কাণ্ডটা ঠিক হয়নি। পুত্রবধূর মুখে তখন প্রতিবাৎসল্যের হাসি। এমনি ছিলেন হেমলতাদেবী, দ্বিজেন্দ্রনাথের ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী। ঠাকুরবাড়িতে ছোটো বড়ো কাউকে বঞ্চিত করেননি তাঁর স্নেহ ও সেবা থেকে। তাঁর জীবনের গল্প লিখতে বসে শ্রদ্ধায় নত হতে হয়। বিদূষী ও গুণবতী এই মেয়েটি একসময় ঠাকুরবাড়ি আলো করেছিলেন।
হেমলতাদেবী রাজা রামমোহন রায়ের বংশের মেয়ে ছিলেন। ষোলো বছর বয়সে তিনি দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী হিসেবে ঠাকুরবাড়িতে আসেন। তিনি ছিলেন দ্বিপেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় স্ত্রী। দ্বিপেন্দ্রনাথের প্রথম স্ত্রী সুশীলা ছিলেন সকলের খুব প্রিয়। তাঁর অকালমৃত্যু ঠাকুরবাড়িতে এক শূন্যতা তৈরি করে। হেমলতার পক্ষে কাজটা কঠিন ছিল। কিন্তু নিজস্ব ভঙ্গিতে তিনিও সকলের মনে জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন। মাত্র ষোল বছর বয়সে ঠাকুরবাড়িতে এসেই তিনি সুশীলা আর দ্বিপেন্দ্রের দুই সন্তানের মা হয়ে উঠলেন। নিজের কোনো সন্তান ছিল না। তবু তিনি ছিলেন সকলের বড়ো মা। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মতোই হেমলতাও তাঁর পরিবার থেকে শিক্ষার সংস্কার নিয়েই এসেছিলেন। একাধারে পারিবারিক ও সামাজিক কাজকর্ম দিব্যি সামলে গিয়েছেন। তাঁর মতো বিদ্যোৎসাহী এবং সাহিত্যিক খুব কম ছিলেন। তখনকার দিনে মেয়েদের বিদ্যাচর্চা খুব সহজ ঘটনা ছিল না। হেমলতা লেখাপড়া তো করেছিলেনই, সেইসঙ্গে করেছিলেন জ্যোতিষচর্চা। মেয়েদের জ্যোতিষচর্চা নাকি নিষিদ্ধ! তাই হেমলতার মা বাধা দিতেন। কিন্তু তাঁর বাবা ললিতমোহন বলতেন, ‘এই মেয়ে আমার ব্রাহ্মণ’। পুরাণ, ইতিহাস মন দিয়ে পড়েছিলেন হেমলতা। বিয়ের পরে পড়েছিলেন এক শ্বেতাঙ্গিনী মিস ম্যাকস্কলের কাছে। পিয়ার্সন সাহেব, এন্ড্রুজ সাহেব ছিলেন তাঁর ইংরেজির মাস্টারমশাই। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর খুড়শ্বশুর ছিলেন।
হেমলতা দেশবিদেশের প্রবন্ধ অনুবাদও করতেন। তাঁর উৎসাহ ছিল অধ্যাত্মবাদের দিকে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব স্নেহ করতেন হেমলতাকে। পণ্ডিত হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নকে ডেকে মহর্ষি বলেছিলেন, হেমলতার ব্রহ্মজ্ঞানে অধিকার আছে। দশটা উপনিষদ পড়ার ক্ষমতা আছে হেমলতার, এমন বিশ্বাস ছিল দেবেন্দ্রনাথের। হেমলতা অন্দরমহলে ধর্মালোচনাও করতেন। মহর্ষি নিজের দীক্ষার আংটি দিয়ে গিয়েছিলেন হেমলতাকে। এ যে কত বড়ো সম্মান! নিজের ধর্মসাধনার যথার্থ উত্তরাধিকারী নিশ্চয়ই মনে করেছিলেন হেমলতাকে। সব ধর্মকেই ভালোবাসতেন হেমলতা। রামকৃষ্ণ মিশনেও বক্তৃতা দিতেন, আবার সুফি সাধনার প্রতি শ্রদ্ধাবনতও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বেশ কিছু সুফিবাদের বই পড়তে দিয়েছিলেন। হেমলতার প্রবল উৎসাহ দেখে রবীন্দ্রনাথ মজার ছলে বলেছিলেন, হেমলতা মুসলমান হবেন কীনা! হেমলতা বলেছিলেন অন্য কথা। সুফিরা মহাতাপস! কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে উৎসাহ থাকা মানে কোনো নির্দিষ্ট কোঠায় প্রবেশ করা নয়।
হেমলতা নিরন্তর সাহিত্যচর্চাও করে গিয়েছিলেন। ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিলেন। শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের দেখাশোনা করতেন। ‘সরোজনলিনী’ আর ‘বসন্তকুমারী’ নামের দুটি বিধবা আশ্রমের ভার ছিল তাঁর উপর। তিনটি কবিতার বই ছিল তাঁর— ‘জ্যোতিঃ’, ‘অকল্পিতা’, ‘আলোর পাখি’। তাঁর গানে সুর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, ইন্দিরাদেবীর মতো নক্ষত্ররা। দুটি গল্পের বইও ছিল — ‘দুনিয়ার দেনা’ আর ‘দেহলি’। রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্করের মতো সাহিত্যিকরাও হেমলতার গল্প পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ হেমলতার গল্প সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘অভিজ্ঞতার চিত্রপ্রদর্শনী’। সর্বপ্রথম লীলা পুরস্কার তিনিই পেয়েছিলেন। নেতৃত্ব দেওয়ার সহজাত ক্ষমতা থাকায় সমাজসেবার কাজও করেছেন হেমলতা। বিশেষ করে নারীকল্যাণের কাজে মগ্ন হয়ে কাজ করেছেন। মেয়েদের শুধু অন্দরমহলের সীমায় আবদ্ধ থাকতে দেখতে পছন্দ করেননি। তাদের ‘বিশ্বহিতের যোগ্য’ করে তুলতে চেয়েছিলেন। ইউরোপের নারীমুক্তি আন্দোলন তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। হেমলতার লেখা ঠাকুরবাড়ির স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধগুলির ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। হেমলতার এই বিপুল কর্মযজ্ঞের গল্প লিখতে বসে মনে হচ্ছে, তিনি যেন এক গুপ্ত যোগী ছিলেন।
আসলে যে পারে সে আপনি পারে! হেমলতা পেরেছিলেন। পুরোনো সময় কোনোভাবেই তাঁকে শুধু গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখতে পারেনি।
সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
