
পাশ্চাত্যে স্বামীজি হয়ে ওঠেন ভারতীয় আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার জাজ্বল্যমান প্রতীক
স্বামী বিবেকানন্দ – বিশ্বখ্যাত ভারতীয় সন্ন্যাসী, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং দার্শনিক। রামকৃষ্ণ পরমহংসের তিনি প্রধান শিষ্য। তাঁর লেখা এবং বক্তৃতা আজও বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
রামকৃষ্ণ পরমহংসের মহাপ্রয়াণ হয় ১৮৮৬ সালে। নরেন্দ্রনাথ দত্ত-সহ তাঁর কয়েকজন শিষ্য কলকাতার পাশে বরানগরে রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তাঁরা গুরুর থেকে শেখা আধ্যাত্মিক সাধনাগুলি অনুশীলন করতে থাকেন। দেহত্যাগের আগেই রামকৃষ্ণ তাঁদের সন্ন্যাস প্রদান করেছিলেন। ১৮৮৭ সালে নরেন্দ্রনাথ এবং আরো ৮ জন আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাসীর জীবন গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ পরিচিত হন স্বামী বিবিদিশানন্দ নামে। পরবর্তীকালে তিনি স্বামী বিবেকানন্দ নাম গ্রহণ করেছিলেন।
এরপর কয়েক বছর তিনি পরিব্রাজক হয়ে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেছেন। বিভিন্ন তীর্থে গিয়েছেন। ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করেছেন। কখনও রাজা-মহারাজা এবং ধনী ব্যক্তিদের সাহায্য পেয়েছেন, কখনও বা দরিদ্র মানুষদের সংস্পর্শে থেকেছেন। এইভাবে ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির বিষয়ে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করেন স্বামী বিবেকানন্দ।
সেই সময়েই তিনি জানতে পারেন, আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। তাঁর ভক্ত এবং অনুরাগীরা চেয়েছিলেন, স্বামীজি ওই সম্মেলনে যাতে অংশগ্রহণ করেন। স্বামীজিও অনুভব করেছিলেন, গুরুর ভাবধারা বিশ্বে প্রচার করতে এবং ভারতের দরিদ্র মানুষদের সেবার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে সম্মেলনে যোগ দেওয়া প্রয়োজন। তবুও অপেক্ষা করছিলেন অন্তরাত্মার নির্দেশের জন্য। কন্যাকুমারীর এক পাথুরে দ্বীপে ধ্যানমগ্ন থাকাকালীন সেই নির্দেশ তিনি লাভ করেন। মাদ্রাজের ভক্তরা স্বামীজির আমেরিকা যাওয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। বাকি অর্থ দিয়েছিলেন খেতড়ির রাজা।
বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ
১৮৯৩ সালের ৩১ মে স্বামীজি বোম্বে থেকে জাহাজে ওঠেন। হংকং এবং জাপান হয়ে ভ্যাংকুভারে পৌঁছন, সেখান থেকে ট্রেনে শিকাগো। বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে অংশগ্রহণের কোনো আমন্ত্রণপত্র তাঁর কাছে ছিল না, তবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইট তাঁকে যোগদানের ব্যবস্থা করে দেন।
১১ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলন শুরু হল। বিকেলবেলা হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি স্বামী বিবেকানন্দ সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। বক্তৃতার শুরুতে “আমার প্রিয় আমেরিকার ভ্রাতা ও ভগিনীগণ” বলায় জনতার করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সভাস্থল। মহাসম্মেলনে তিনি বেদান্তের আদর্শ ও রামকৃষ্ণের বাণী প্রচারের সঙ্গে বিশ্ব-সৌভ্রাতৃত্বের বার্তাও তুলে ধরেন। ২৭ সেপ্টেম্বর সম্মেলন শেষ হয়। স্বামী বিবেকানন্দের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। পাশ্চাত্য জগতের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার জাজ্বল্যমান প্রতীক।
এরপর কয়েক বছর স্বামীজি আমেরিকা ও ইউরোপে ধর্মপ্রচার করতে থাকেন। ১৮৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতে ফেরেন। সেই বছরই ১ মে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন।

