
কিন্তু তাঁর আছে দু-দুবার মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকার অধিকার, এরপর মরলে খেলা শেষ
এক যে ছিল গান। সে গান শুনলেই নাকি আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে। হাঙ্গেরিয়ান সেই ‘গ্লুমি সানডে’-র সম্প্রচারও বন্ধ করতে বাধ্য হয় বহু দেশ। সে গানের বেদনা, দহন ও যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে বহু শ্রোতা আত্মহত্যা করেন বলে শোনা যায়। আর ‘ব্লু হোয়েল’ কোনও গান নয়। একটি খেলা। কিন্তু ‘পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণ খেলা’। আর সে খেলা খেলতে গিয়েই মুম্বইয়ের আন্ধেরির সাত তলা বিল্ডিং থেকে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নিল ১৪ বছরের মনপ্রীত সিং। কে তাঁকে বাধ্য করেছিল ঝাঁপ দিতে? জানা যাচ্ছে, ব্লু হোয়েল নামক অনলাইন খেলার নিয়ম। এই খেলা ৫০ দিনের জন্য। প্রতিদিন একটা করে নতুন চ্যালেঞ্জ দেওয়া হবে অংশগ্রহণকারীকে। প্রথমদিকে সারা দিন গান শোনা, কখনও আতঙ্কের সিনেমা দেখার মত ‘সহজ’ টাস্ক। এরপর দিন যতই এগুবে টাস্ক হয়ে উঠবে গভীর আত্মপীড়ণমূলক। হাত কেটে ব্লু হোয়েলের ছবি আঁকার মতো চ্যালেঞ্জও দেওয়া হয়। প্রতিদিন টাস্ক শেষ করে ছবি পোস্ট করা হল গেমের নিয়ম। আর এ খেলার শেষ ধাপ হল প্লেয়ারকে আত্মহত্যা করানো। আর এই মরণ খেলা একবার শুরু করলে নাকি ফেরার রাস্তা নেই। হুমকি দিয়ে ভয় দেখিয়ে কিউরেটর প্রতিযোগীকে দিয়ে তার শেষ টাস্ক করিয়েই ছাড়বে। রাশিয়ার এই গেম ছিনিয়ে নিয়েছে গোটা বিশ্বে ১৩০ জনের প্রাণ। আর মুম্বইয়ের মনপ্রীত ভারতের পক্ষ থেকে ব্লু হোয়েলের প্রথম বলি।
ভার্চুয়াল পৃথিবীতে মৃত্যুর সংজ্ঞা এত দিন অন্য ছিল। সে মরণও ছিল ভার্চুয়াল। মনিটরের পর্দায় শত্রুশিবিরে প্রবেশ করছেন খেলোয়ার, তাঁর হাতের বন্দুকটিকে দেখা যাচ্ছে। শত্রুপক্ষের সৈন্য নিকেশ করাই তাঁর মূল লক্ষ। কিন্তু তাঁর আছে দু-দুবার মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকার অধিকার। কখনও তিনবার কখনও ছ-বার যদি তাঁর মৃত্যু হয় তাহলে খেলা শেষ হয়ে যায়। আর এই খেলা কৈশোরের মৃত্যু চেতনাকেও ভিন্নভাবে গড়ে তুলতো। কিন্তু কোল উজার করতো না বাবা-মার। তবে হাতের মুঠোয় যখন বোতাম টিপলেই বন্দুক আর সামনে ভার্চুয়াল হলেও মানুষ, তখন শৈশব বা কৈশোর যে খুব সুরক্ষিত, তাই বা বলা যাবে কী করে।
বাস্তবের সঙ্গে ভার্চুয়াল পৃথিবীকে যুক্ত করে দিয়ে চাঞ্চল্য সৃস্টি করেছিল পোকেমন। সেই গেম বহু দেশে নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ পোকেমন শিকারিরা রাস্তা-ঘাটে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছিলেন, অস্থান-কুস্থানে সময়ে- অসময়ে বিচরণ করছিলেন । তবে ব্লু হোয়েলের আত্মধ্বংসী প্ররোচনায় পা-দেওয়া কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীদের মনস্তত্বটা কী রকম? কত নিপুণভাবে আত্মপীড়নের টাস্কগুলো করা যায় সেটাই তাদের কাছে চ্যালেঞ্জ। শেষের দিন এগিয়ে আসছে জেনেও কোনও এক নেশার ঘোরে এই ধরণের খেলায় অংশগ্রহণ করেন প্রতিযোগীরা। এই নেশা আদিম নেশা। নিজেকে কষ্ট দেওয়া এবং দিতে দিতে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মধ্যে বিকারগ্রস্ত সুখের ক্ষমতার শাসন চারিয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই এই ভুবন তাদের কাছে ‘সুন্দর’ নয়, বা নয় ‘মাই চুজেন ওয়ার্ল্ড’ বা ‘আমার বেছে নেওয়া জগৎ’। নতুন জগৎ সৃজনের নতুন খেলায় মাততে গিয়ে গেম কিউরেটরের হাতের পুতুল হয়ে যায় প্রতিযোগীরা। খেলার নিয়ম মানতে বাধ্য হওয়ার ভিতর দিয়ে মৃত্যুতে গিয়ে ‘নিয়তিবদ্ধ’ হয় তাদের জীবন। স্বেচ্ছায় আত্মপীড়নের ইতিহাস ড্রাগের নেশার থেকেও প্রাচীন। এখন সেই প্রাচীন ‘প্রবণতা’-কে জাগিয়ে তুলতে এই ব্লু হোয়েলের মত গেমের ভিতর দিয়েই ফাঁদ পাতা হচ্ছে জীবনের ছন্দ এবং সভ্যতার ছন্দকে ধ্বংস করে দিতে।
কুমার শানুকে একটা সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, জীবনে আপনার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী? তিনি উত্তরে জানিয়েছিলেন, বিদেশী এক ভদ্রমহিলা কমপক্ষে ২০ বার সুইসাইড অ্যাটেম্পট নেন। কিন্তু একদিন তিনি শানুর গাওয়া একটি গান শোনার পর থেকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এই ঘটনাটিকেই শানু নিজের জীবনের সব থেকে বড় পাওয়া বলেছিলেন। আর গানটি ছিল ‘যব কোয়ি বাত বিগড় যায়ে, যব কোয়ি মুশকিল আ যায়ে, তুম দে না সাথ মেরা, ও হামনওয়া।’
মুম্বইয়ের মনপ্রীত পড়াশোনায় ভাল ছিল। বিমানচালক হওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। তার কাছে কি এরকম কোনও সুর পৌঁছয়নি কোনও দিন? কেউ কি তাকে বলেনি, পাশে আছি। নাকি বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুর ঘোর তার কাছে অনেক বেশি নেশাতুর ছিল? প্রশ্নগুলো সহজ নয়, আর উত্তর এখনও অজানা।
