সামনে বিনয়ের অবতার, আসলে মিটমিটে শয়তান

‘যখন তরলে ওর মতি গেল, ভাবলাম – যাক এবার কবিতা ওর মাথায় উঠবে’

সুভাষ মুখোপাধ্যায়
শক্তির ষাট? বললেই হল! তাহলে তো আমার বয়সের গাছপাথর থাকে না।

ওর এই তো ছিল আঠারো-উনিশ। নিজেকে বলত হিন্দ মোটর্সের শ্রমিক। কফিহাউসে আড্ডা দিত। কবিতাকে বলত ‘পদ্য’। আমাদের পিলে চমকাতে সাধু ক্রিয়া ব্যবহার করত।

খাঁকি শার্ট। একটু একটু দাড়ি।

সামনে বিনয়ের অবতার। আসলে মিটমটে শয়তান। পেছন ফিরলে সামনের আয়নায় ধরা পড়ে যেত ওর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ। ও সেটা জানত না। নাকি জানত? অনর্গল কবিতা লিখত। বাঁধাধরা ছন্দের পরোয়া করত না। ভদ্র সমাজে অপাঙক্তেয় শব্দগুলোকে সমস্মানে কবিতায় স্থান করে দিয়ে আমাদের মত সেকেলেদের চটিয়ে দিত। মাঝে মধ্যে কবিতা লিখলেও , যাকে কবি বলে আমি তা ছিলাম না। সাহিত্যে আমি বরাবরই বেপাড়ার লোক। কবিতা পড়ি কম। বুঝি আরও কম। ফলে, শক্তির কবিতা পড়লেও খুব একটা ভিতরে ঢুকতে পারিনি। এমন সময় ‘দেশ’ পত্রিকায় বার হল শঙ্খ ঘোষের সমকালীন কবিতার বিষয়ে একটি প্রবন্ধ। শঙ্খই প্রথম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শক্তিকে চিনিয়ে দিল।

এরপর টনক নড়ল যখন শক্তি আমার বাড়া ভাতে ছাই দিতে শুরু করল।

যে অল্পবয়সীদের কবিতা শুনিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমি কোনোরকমে এক টেবিলে জড়ো করেছিলাম, এক সময়ে দেখি তারা নানা অছিলা করে উঠে গিয়ে শক্তির টেবিলে গিয়ে ভিড় করছে। তখন আমার কী রাগ হয়েছিল বলার নয়।

রেগে গিয়ে একজনকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘শক্তির কবিতার মাথামুন্ডু কিছু বোঝো তোমরা?’

‘নিশ্চয়ই। খুবই সহজ। কেন, আপনি বুঝতে পারেন না?’ তার উত্তরে যদি ‘না’ বলি তাহলে তো আমার ওপর ওদের আরও ভক্তি চটে যাবে। কাজেই আমি হ্যাঁ না কিছুই বলিনি।

শক্ত ছেড়ে যখন তরলে ওর মতি গেল, ভাবলাম – যাক এবার কবিতা ওর মাথায় উঠবে। ছাই! যখন বেকার হয়ে কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন ভাবলাম – কবিতা লেখা ছুটে যাবে। ছাই হল! তারপর বিয়ে হল। ছেলেমেয়ে হল। ভাবলাম – সংসারের ফাঁস গলায় দিয়ে ওর কবিতা এবার পটল তুলবে। কিন্তু আমার একটা হিসেবও মিলল না। পাঁকাল মাছটি হয়ে কবিতায় ও শুধু টিকে রইল না, সমানে অশ্বমেধের ঘোড়া হাঁকিয়ে চলেছে।

কবিতায় ওর সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে এখন আমি নানা কায়দায় ভুলিয়ে ভালিয়ে ওর বউ মীনাক্ষী, মেয়ে তিতি আর ছেলে তাতারকে আমার টেবিলে এনে বসিয়েছি। একটা চেয়ার খালি রেখেছি। শক্তি চাইলে বসতে পারে।

টাকে হাত বোলাতে বোলাতে শক্তি দাড়ি গজিয়ে প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে, ওর এখন ষাট হল। ওর কোনো কথাই বিশ্বাস করে না ওর কবিতা, ওর বয়সের কথা তো নয়ই।

তো এই হল শক্তি। চুলোয় যাক্‌ ওর কবিতা। যে আমার হাঁটুর বয়সী, তাকে ষাট! ষাট তো আমি বলবই।

(‘শক্তির কাছাকাছি’ সংকলন থেকে গৃহীত)

Developed by DXDasia