এই রাজ্যকে ঘিরে আছে তিনটি পাহাড় – খাশি, জয়ন্তিয়া এবং গারো

সুড়ঙ্গ বা গুহার নাম শুনলেই গা ছমছম করে। গল্প, উপন্যাসে সুড়ঙ্গ নিয়ে রয়েছে নানা ঘটনা। এর সবই প্রায় রহস্যময়। কিন্তু যারা অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় ভ্রমণ করেন তাঁদের কাছে গুহাভ্রমণ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। 

মেঘালয় একটি গুহার রাজ্য হিসাবেও পরিচিত। এখানে অসংখ্য গুহা আছে। যাদের আকার, আকৃতির দিক থেকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মেঘালয়কে ঘিরে আছে তিনটি পাহাড় – খাশি, জয়ন্তিয়া এবং গারো। সারা বিশ্ব থেকে আগত বহু সংখ্যক গুহাপ্রেমিকরা আসেন মেঘালয়ে। মেঘালয় রাজ্যে আছে প্রায় ১০০০-টি গুহা। এই সব গুহাগুলির মধ্যে কয়েকটি ভ্রমণের গল্প উল্লেখ করা হল।

ক্রেম মামলুহ
ক্রেম মামলুহ গুহা মেঘালয়ের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই গুহা চেরাপুঞ্জির কাছে অবস্থিত। ক্রেম মামলুহ থেকে পাঁচটি নদী তার গতিপথ পেয়েছে। ক্রেম মামলুহ-র এই গুহার উচ্চতা ৪৫০৩ মিটার। মৌসিনরাম গুহা তার বিশাল স্ট্যালাগমাইট্ গঠনের জন্য সুপরিচিত। এটি একটি “শিবলিঙ্গের” মত দেখতে। এই গুহার অন্য নাম হল মাওজিমবুইন। এই শিলার শিখরে একটি উর্ধ্বগামী ট্রেক চমৎকার। এখান থেকে উপত্যকা, পাহাড়, বাংলাদেশের নদী ও সমতল ভূমির এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা মেলে। এই দৃশ্য গুহাটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। মৌসমাই গুহা ক্রেম ফিলুত নামেও অভিহিত। এই গুহা নসিংথিয়াং জলপ্রপাত থেকে বেশী দূরে নয়। মৌসমাই গুহার প্রবেশদ্বার চেরাপুঞ্জির নিকটে মৌসমাই গ্রামে অবস্থিত। এই গুহা মৌসমাই গ্রাম থেকে বেশী দূরে নয়। এই গুহার প্রবেশপথ উলম্ব এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ। মেঘালয়ের অন্যতম আকর্ষণ মৌসমাই গুহা তার বিশাল কক্ষগুলির জন্য বিখ্যাত যেগুলি বিভিন্ন অন্যান্য গুহার সাথে সংযুক্ত। এই কক্ষগুলি অ্যামি্পথিয়েটারের মত।

সিজু গুহা
মেঘালয়ের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণের মধ্যে অন্যতম। এটি সিজু গ্রামের নিচে এবং নাফাক হ্রদের নিকটে সিমসাং নদীর তীরে অবস্থিত। বাগমারার ৩০ কিলোমিটার উত্তর দিকে অবস্থিত এই গুহা চুনাপাথরে গঠিত। সিজু গুহার সিমসাং স্ট্যালাকটাইট, নীল গ্রোট্টো গুহার অনুরূপ যা কাপড়ি উপদ্বীপের প্রধান আকর্ষণ। ভারতের সমস্ত গুহার মধ্যে এটি তৃতীয় দীর্ঘতম বলে বিবেচিত। গুহাটি ‘ডোবাক্কল’ নামেও পরিচিত, যার আক্ষরিক অর্থ হল ‘বাদুড়ের গুহা’।

মৌসমাই গুহা
৯-টা থেকে ৪.৩০-টা অবধি পরিদর্শকদের জন্য খোলা থাকে। মেঘালয়ের মৌসমাই গুহার অভ্যন্তর বৃহৎ কক্ষ নিয়ে গঠিত। এই গুহা অন্ধকারে ঢাকা। একটি টর্চের আলো বা হালকা অন্য কোন ধরনের আলো এই গুপ্ত সৌন্দর্যে বিস্ময়ের মত কাজ করে। গুহার অভ্যন্তর আলোকিত হয় এবং স্ট্যালাগমাইট্, স্ট্যালাকটাইট এবং দেওয়াল অসংখ্য স্ফটিক রং প্রতিফলিত করে। এই গুহার একমাত্র বৈশিষ্ট্য হল এদের নানারকমের আকার এবং আকৃতি।স্ট্যালাগমাইট্, স্ট্যালাকটাইট এই গুহায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করে আছে। এই গুহার অভ্যন্তর অত্যন্ত প্রশস্ত। 

ক্রেম বাঁধ গুহা
মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত ক্রেম বাঁধ গুহা প্রকৃতি মাতার জাঁকজমক দেখার একটি আদর্শ গন্তব্য। ক্রেম বাঁধ প্রকৃতপক্ষে ভারত তথা সমগ্র উপমহাদেশের বৃহত্তম গুহা যা সম্পূর্ণরূপে বেলেপাথর দ্বারা নির্মিত। এর সুবৃহৎ আকারের কারনে এখানে অনেক মানুষ আসেন। মেঘালয়ের ক্রেম বাঁধ প্রায় ১২৯৭ মিটার দৈর্ঘ্য জুড়ে প্রসারিত। খনিজ পদার্থ ও বালুকণা নিয়ে গঠিত এবং অন্যান্য শিলা দ্বারা এই শিলা বেলেপাথর নামে পরিচিত। এটি পাললিক শিলার একটি রূপ এবং কোয়ার্টজ বা ফেল্ডস্পার দ্বারা সমৃদ্ধ, যেগুলি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সংগৃহীত। মেঘালয়ের ক্রেম বাঁধ একটি বিরাটকার প্রবেশদ্বার দ্বারা গঠিত। বস্তুত, এই প্রবেশদ্বার মেঘালয়ের ক্রেম বাঁধের প্রধান আকর্ষণ। এই নদীর নীল পান্নার মত জল এই গুহাটিকে একটি নির্মল ও অকৃত্রিম পরিবেশ প্রদান করে। বেলেপাথর প্রধানত উজ্জ্বল রঙের হয় যেমন – হলুদ বাদামী, ধূসর, লাল এবং ট্যান। অন্য আরেকটি বৈশিষ্ট্য যার জন্য বেলেপাথর আরও বেশি উপযোগী সেটি হল – এর মধ্যে বিশাল অনুপাতে বিভিন্ন ধরণের উপকরণ ধরে রাখার ক্ষমতা আছে যা একে জলধারক হিসাবে কাজ করতে সহায়তা করে। তুষারপাত এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ খুব কমই এই বেলেপাথরকে প্রভাবিত করতে পারে, বরং এই ক্রেম বাঁধ গুহা যেকোন দুর্যোগের প্রতিরোধী হিসাবে কাজ করে।

ক্রেম কোতসাতি
মেঘালয়ের রাজ্যে অবস্থিত ক্রেম কোতসাতি একটি অবর্ণনীয় গুহা সম্পদ। মেঘালয় রাজ্যে গুহার একটি সুবিশাল শ্রেণীবিন্যাস রয়েছে, যেগুলি এখানকার পর্যটন গন্তব্যে রুপান্তরিত হয়েছে। বস্তুত, মেঘালয় রাজ্য ১০০০-টি বিস্ময়কর গুহার সমন্বয়ে গঠিত। এই গুহার মধ্যে উপস্থিত চুনাপাথরের গঠন সত্যিই দেখার মতো। আপনি আটটি প্রবেশপথের মাধ্যমে ক্রেম কোতসাতি গুহায় প্রবেশ করা যায়। তবে, প্রাথমিক প্রবেশপথটি হল জলের মধ্য দিয়ে। সুতরাং, এই প্রবেশদ্বারের মাধ্যমে মেঘালয়ের ক্রেম কোতসাতি গুহায় প্রবেশ করতে চাইলে, সাঁতারে অত্যন্ত দক্ষ হতে হবে। এই গুহা ৩৬৫০ মিটার দৈর্ঘ্য জুড়ে প্রসারিত হওয়ায় খুব সহজেই এখানে ঘোরাফেরা করা যায়। ক্রেম কোতসাতি জুড়ে প্রবাহিত স্বর্গীয় মনোহর নদী দুটি সম্ভাব্য উপায়ে পরিদর্শন করা যায়। একটি উপায় হল সাঁতার ও অন্য একটি উপায় হল রাবার বোটে চেপে।

এছাড়া আরও কয়েকটি আকর্ষণীয় গুহাগুলি হল ক্রেম সোহ সিম্পি, ক্রেম উমসংকট, ক্রেম সুইপ, সিজু গুহা।

Developed by DXDasia