বিশ্ব-কাঁপানো ইউটিউবের জন্ম দিয়েছেন যে বঙ্গসন্তান

ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিহাসে সাড়াজাগানো পালাবদল তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত

বাবা প্রবাসী বাঙালি, মা জার্মান। তাঁদের ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবী। কম্পিউটারকে যেমন খুশি ব্যবহারের সহজাত দক্ষতা আছে তাঁর। কিন্তু সমস্যা বলতে একটাই, মাথায় মাঝেমধ্যেই খেয়ালপোকা নড়েচড়ে ওঠে। এসব অবশ্য প্রতিভাবানদের ক্ষেত্রে একটু-আধটু হয়। ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়ের আর্বানা-সঁপা ক্যাম্পাসে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনার ফাঁকেও সেই পোকার নড়াচড়া শুরু হয়ে যায়। গ্র্যাজুয়েশন যখন শেষের মুখে, তখনই পড়ার পাট চুকিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেলেন ক্যাম্পাস থেকে। যোগ দিলেন অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ‘পেপ্যালে’। সেখানেই পরিচয় হল শাদ হার্লে আর স্টিভ চ্যানের সঙ্গে। তারপর, এই তিন বন্ধু মিলেই বানিয়ে ফেললেন ‘ইউটিউব’। সেটা ২০০৫ সাল। বাকিটা ইতিহাস।

জাওয়েদ করিম। বাবা নাইমুল আর মা ক্রিস্টিন দু’জনেই বিজ্ঞানী। পশ্চিম জার্মানির নোয়েসে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জাওয়েদের। কিন্তু সেখানে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বর্ণবিদ্বেষ। এরপরেই নাইমুল-ক্রিস্টিনা সপরিবারে চলে আসেন আমেরিকার মিনেসোটায়। বড়ো হয়ে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশনে ভর্তি হওয়ার ফাঁকেই সিলিকন গ্রাফিক্সে ইন্টার্নশিপ করে ফেলেছিলেন জাওয়েদ। অত্যন্ত মেধাবী জাওয়েদকে দেখে রত্ন চিনতে ভুল হয়নি ‘পেপ্যালে’-র কর্ণধারদের। একজন ‘ড্রপ-আউট’ ছাত্র হয়েও তাই চাকরি জুটে গেল। ২০০০ সালে অনলাইনে টাকা পাঠানো ব্যাপারটা প্রযুক্তি হিসেবে বেশ নতুন। সেই কারণেই হয়তো পেপ্যালের চাকরিতে আকর্ষণ বোধ করেছিল জাওয়েদ। নতুন প্রযুক্তির প্রতি তাঁর নেশাই আলাদা।

নতুন প্রযুক্তি একদিন পুরোনো হয়। এক কাজ বেশিদিন ভালোও লাগে না। ইতিমধ্যে পরিচয় হয়েছে শাদ হার্লে আর স্টিভ চ্যানের সঙ্গে। নতুন পরিকল্পনা চাগাড় দিচ্ছে মাথায়। চারপাশে থিকথিক করছে হাজারো ভিডিও। কোনোটা খেলার, কোনো সিনেমার, গানের কিংবা নিজেরই নানা মুহূর্ত। এইসব ভিডিওর জন্য যদি একটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বানানো যায়! অনলাইনে এমনি অঢেল সাইট থাকলেও ভিডিও শেয়ার করার মতো তেমন কোনো ভালো সাইট নেই। সানফ্রান্সিস্কোতে স্টিভ চেনের বাসায় নৈশভোজের আড্ডায় সিদ্ধান্ত পাকা হল। আর তার সঙ্গেসঙ্গেই ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিহাসে শুরু হয়ে গেল একটা নতুন অধ্যায়। সেই নতুন ইতিহাসের নেপথ্যে মূল মস্তিষ্ক হয়ে থেকে গেলেন এক বঙ্গসন্তান।

ইউটিউব জন্মের পিছনে প্রযুক্তিগত দায়িত্বটা মূলত পালন করেছিলেন জাওয়েদই। বাকি দু’জন ব্যবসায়িক দিকটা দেখতেন বেশি করে। জাওয়েদ নিজের খেয়ালে থাকেন, আড়ালে থাকাই তাঁর বেশি পছন্দ। কোম্পানির সামনের সারিতে আসতে চাননি কখনোই। শেয়ারের সিংহভাগ রাখতেও চাননি নিজের কাছে। যে-কারণে, প্রথমে অনেকেই জানতে পারেনি তাঁর নাম। ২০০৬ সালে যখন ১৬৫ কোটি ডলারে ইউটিউব কিনে নেয় গুগল, তখনই প্রকাশ্যে আসে জাওয়েদের নাম। তিনি অবশ্য মোটে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের শেয়ার পেয়েছিলেন।

জন্মের পরেই ইউটিউব কেন সাড়া ফেলেছিল, তার উত্তর খুঁজতে অতীতে ফেরার প্রয়োজন নেই। এখনো যে-কোনো ট্রেলার, গানের ‘সিঙ্গল’ তৈরির পরে লঞ্চ করার প্রধান মাধ্যম ইউটিউব। ‘ইউটিউবার’ হয়ে নিজস্ব চ্যানেল বানিয়েই কতজন রোজগার করেন লক্ষ লক্ষ টাকা। ইউটিউবের ভিডিও-সাম্রাজ্য দেখে-শুনে শেষ করতে গোটা দুই-তিন মানবজন্ম লাগবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির দুনিয়ায় এহেন বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছিল সেদিন একজন বঙ্গসন্তান। শাদ হার্লে আর স্টিভ চ্যানের ভূমিকা অস্বীকার না করেও বলা যায়, ইউটিউব জন্মের প্রধান কারিগর ছিলেন জাওয়েদই।

ইউটিউবের প্রথম ভিডিওটিও আপলোড করেছিল জাওয়েদ নিজে। ‘মিট অ্যাট দ্য জু’ নামের সেই আটপৌরে, আন্তরিক ভিডিওটি এযাবৎ ৬ কোটিরও বেশি ভিউ পেয়েছে। সে যাহোক, ইউটিউব ‘লঞ্চ’ করার পর ফের ঘরে ফেরে ছেলে। ঘর মানে আর্বানা-সঁপা ক্যাম্পাস। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। ডাক পান ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দেওয়ার। ইউটিউব ছাড়াও পোর্টেবল ত্রিমাত্রিক গ্রাফিক্স, থ্রিডি স্প্রিং সিমিউলেশন, সলভিং ড্যাড পাজল, রেডিওসিটি ইনজিন, রোবটিক ওয়েবক্যাম, রে-ট্রেসার, লাইফ থ্রিডি, কোয়াক ২ মডেল ভিউয়ারের মতো আর বেশ কয়েকটি প্রযুক্তির জন্মও দিয়েছেন জাওয়েদ। তারপরে ফের বেপাত্তা।

জাওয়েদ এখন ঠিক কী করছেন? সঠিক উত্তর জানা নেই। অনেকে বলেন, এয়ারবিএনবি নামের বহুজাতিক হোমস্টে সংস্থার অন্যতম মাথা তিনি। এ-কথা সত্যি হলে জাওয়েদ এখনো একইভাবে কাজ করছেন নেপথ্যে থেকেই। ফেসবুক-ট্যুইটার-ইন্সটাগ্রামে তাঁর কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। নতুন কোনো পরিকল্পনা হয়তো গিজগিজ করছে এখন তাঁর মাথায়। ইউটিউব অতীত, ভিডিওর জগতে তিনি আর ফিরবেন কিনা, তাও জানা নেই। কিন্তু, চমক দিতে যাঁর জুড়ি নেই, তাঁকে নিয়ে শেষ কথা বলা মুশকিল।

Developed by DXDasia