
কলকাতার যাপনের ইতিহাস নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে পণ্যসংস্কৃতি
প্রথম পর্ব
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তার ব্যোমকেশ সিরিজের অন্যতম বিখ্যাত গল্প ‘পথের কাঁটা’-র একদম শুরুতে ব্যোমকেশ এবং অজিতের একটি কথোপকথন রয়েছে যেটি বেশ মনোযোগ দাবি করে। একটি রহস্যকাহিনীর শুরু হচ্ছে, একজন গোয়েন্দা এবং তার বন্ধু আলোচনারত – স্বাভাবিকভাবেই আশা করা যাবে রহস্যের প্রেক্ষাপট তৈরি হবে এই সংলাপ থেকেই; যেভাবে রেনেসাঁর আলোকে আলোকিত ইউরোপে বসে যুক্তিবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে করতে শার্লক হোমস এবং ওয়াটসন ঢুকে পড়েন রহস্যের অন্দরমহলে। 'পথের কাঁটা'-তে রহস্যের চাবিকাঠি ছিল সংবাদপত্রে ঘাপটি মেরে থাকা একটি রহস্যময় বিজ্ঞাপনে। সেই বিজ্ঞাপন নিয়ে যখন কথোপকথন শুরু হয় ব্যোমকেশ আর অজিতের মধ্যে, তখন ব্যোমকেশ জোরালো সওয়াল করে বিজ্ঞাপন মনোযোগ দিয়ে পড়ার বিষয়ে, সে বলে বিজ্ঞাপনেই সুলুকসন্ধান থাকে সমাজে কোথায় কোন প্রান্তে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে কী ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত।
এই ব্যোমকেশ কাহিনীর সময়কাল বিশ শতাব্দীর তিরিশের দশক। পরাধীন ভারত। ঔপনিবেশিকতার সমস্ত গ্লানি এবং ক্লেদ বুকে নিয়ে শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালি তখন বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে কৈশোরে পা দেবে। এরকম সময়ে ব্যোমকেশের এই বিশেষ উক্তির তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে ওই বিশেষ সময়টির আর্থসামাজিক চেহারাচরিত্তির কেমন ছিল। লুইস মামফোর্ড বলেছিলেন শহর হল 'কালেক্টিভ ওয়ার্ক অফ আর্ট'। বিনয় ঘোষ তাঁর 'মেট্রোপলিটান মন. মধ্যবিত্ত. বিদ্রোহ' বইতে বলেছেন, জব চার্ণক একজন অর্থলোলুপ পাশ্চাত্যের বণিকের মন নিয়ে কলকাতা শহর তৈরি করেছিলেন, এবং এই বাজার শহর কলকাতায় নাগরিকদের মননকেও পণ্যকেন্দ্রিক করে তোলা হয়েছে ঐতিহাসিকভাবে। বিনয় ঘোষের এই কথার সূত্রে বলা চলে, পণ্যসংস্কৃতি কলকাতার যাপনের ইতিহাস নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেই। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত সময়ে কলকাতা কীভাবে অটোমোবিলসর্বস্ব হয়ে উঠেছিল তার খতিয়ানও ছিল বিনয় ঘোষের এই বইয়েই। আবার এইসময়েই অগ্নিযুগ। ব্রিটিশবিরোধী চরমপন্থী আন্দোলনে বাঙালি এত সক্রিয় হতে পারে, তা প্রথম দেখা গেল। তবে তা সম্পূর্ণত অন্য প্রসঙ্গ। মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হতে শুরু করেছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি, বিশ শতকের প্রথম দু তিন দশকেও সে কূল পাওয়ার মতন করে সাঁতার কাটতে শেখেনি।
ফলে এইসময়ের মধ্যবিত্ত জীবনে বিজ্ঞাপনের ভূমিকা জরুরি। নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন জনসংযোগ এক বৃহৎ শিল্প। বিজ্ঞাপন জনসংযোগের এক অন্যতর মাধ্যম। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন কোনো একটি বিশেষ পণ্যকে 'ব্র্যান্ডিং'-এর মাধ্যমে জনমানসে পৌঁছে দিতে চায়। কিন্তু সব বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য এক নয় মোটেই। যেমন 'পথের কাঁটা'-তে একজন সিরিয়াল কিলার বিজ্ঞাপন দেয়, যার 'পথের কাঁটা' সরানোর প্রয়োজন সে সেই বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেই কাজ হাসিল। এখানে কোনো পণ্য, ব্র্যান্ড জরুরি নয়। যে বিশেষ বাজার নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞাপন দুনিয়া চালিত হয় তার সঙ্গে এইসব বিজ্ঞাপনের বিস্তর তফাৎ। থিওডোর অ্যাডোর্ণো গণমাধ্যমের দুনিয়াকে 'কালচার ইন্ডাস্ট্রি' আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, বিজ্ঞাপন জনমানসে একরকম বাধ্যবাধকতার বোধ তৈরি করে, যাতে সেই বিশেষ পণ্যটি কিনতে প্রায় বাধ্য হতে হয় জনগণকে। এইধরনের বিজ্ঞাপন সময়বিশেষে রাষ্ট্রের বিবিধ অ্যাজেন্ডার প্রচারক হয়ে ওঠে। যেমন সাম্প্রতিকের ভারতবর্ষে একটি ডেয়ারি দ্রব্যবিক্রেতা কোম্পানি বিভিন্ন ইস্যুর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদকে ধুনোর গন্ধ দিয়ে চলেছে। হিটলারের রাজনৈতিক প্রচারমাধ্যমের দেখভাল করতেন গোয়েবেলস, তিনিও বিজ্ঞাপনকে ব্যবহার করেছেন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচীর প্রচারের জন্য। তবে এসব থেকে কয়েক যোজন দূরে অনালোকিত পরিসরের অবহেলিত বিজ্ঞাপনদের নিয়ে ভাবেন কজন? মজার বিষয়, বিশ্বায়ন-পরবর্তী এই কর্পোরেটলালিত সময়েও কিন্তু এসব বিজ্ঞাপন টিকে আছে স্বমহিমায়, টেলিভিশন বা যেকোনো অডিওভিসুয়াল মাধ্যমে এদের দেখা মেলে না, এদের দেখা পাওয়া যায় দেওয়ালে, খবরের কাগজে, গঠনে গড়নে এরা প্রাগাধুনিক।
'হ য ব র ল'-তে কাক্কেশ্বর কুচকুচের বিখ্যাত হ্যান্ডবিল স্মরণে আছে অনেকেরই। সেই হ্যান্ডবিলের ভাষা সেইসময়ের বিজ্ঞাপনের ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানে নিশ্চয়তা দেওয়া ছিল "আমরা হিসাবী ও বেহিসাবী খুচরা ও পাইকারী সকল প্রকার গণনার কার্য বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করিয়া থাকি", এই বিজ্ঞাপনের শুরুতে ছিল "ভূষন্ডী কাগায় নমঃ" বলে ঠাকুরের শরণ নেওয়া, আর শেষ পাতে ছিল সাবধানবাণী, 'নকল হইতে সাবধান' জাতীয়, সেখানে নকলনবিশদের "বিজ্ঞাপনের চটক দেখে প্রভাবিত" না হওয়ার হুঁশিয়ারি ছিল। সেইসময় এই অনভিজাত বিজ্ঞাপনগুলির বয়ান ছিল কতকটা এইরকমই। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'অদ্ভুতুড়ে' সিরিজের 'গজাননের কৌটো' কাহিনীর শুরুতে একটি সাইনবোর্ডের উল্লেখ ছিল যেখানে সুলভে কাটা হাত পা জোড়া লাগানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছিল, এতটা অবাস্তব না হলেও এজাতীয় বিবিধ বিচিত্র পরিষেবার বিজ্ঞাপন একটু খোঁজ চালালেই চোখে পড়বে। এইসব বিজ্ঞাপনের খানিক সুলুকসন্ধান দেওয়ার চেষ্টা থাকবে পরবর্তী কিস্তিগুলোতে, সেখানে যেমন খুলে দেখা হবে প্রাচীন বিজ্ঞাপনের মহাফেজখানা, তেমন যেসব বিজ্ঞাপন এখনও মূলস্রোতের বিজ্ঞাপনী দুনিয়ার মস্ত হাঁ-কে সামলেও টিকে আছে যত্রতত্র, তাদের নিয়েও চলবে কাটাছেঁড়া।
