লাট বাগানের মূর্তিগুলো বসুক কলকাতায়

আমাদের দেশের ভিসুয়াল কালচারের চর্চার স্বার্থেই তো বসানো যেতে পারে মূর্তিগুলি

কলকাতার পথে ঘাটে ইংরেজ প্রভুদের যে সব মূর্তি বিরাট বৈভব নিয়ে তেজ দেখিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো তাদের আবার বসিয়ে দেওয়া হোক কলকাতায়। কথাটায় আপত্তি ওঠাটাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাসের চলনকে ধরে রাখার এ এক চমৎকার উপায়। আমরা যখন দেশের সতেরো থেকে বিশ শতক পর্যন্ত ইতিহাস নিয়ে চর্চা করি বা গবেষণা করি তখন কি আমরা ব্রিটিশ প্রভুদের নাম ঠিকুজি বাদ দিয়ে ইতিহাসকে পাতিহাঁস বানাই নাকি ? তাহলে ইতিহাসের জলজ্যান্ত উপাদানগুলি নিয়ে আমাদের এত স্বাধীনতার আবেগ গেলো, দেশের প্রতি বোধ গেল, এসব করি কেন? এখন তো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক তাজা আর যুক্তি মেনে চলার মতো তৈরি হয়েছে। লেক টাউনের মোড়ে তো আমরা বিগ বেনের প্রতিলিপি স্থাপত্যকে খুশি মনে তারিফ করি। নতারদম গির্জার ঘণ্টার মতো তার মিষ্টি দং দং শুনতেও আমাদের বেশ লাগে। তাহলে ব্রিটিশ আমলের অসাধারণ মূর্তি যেগুলি অরিজিনাল ওয়েস্টার্ন আর্টের নিদর্শন সেগুলি শিল্পচর্চার খাতিরে কলকাতার পথে ঘাটেই আবার বসানো হলে আপত্তি কোথায়? তাতে আমাদের দেশের ভাস্কর্য চর্চাকেও এবং আমাদের উত্তর ঔপনিবেশিক যুগের পথে ঘাটে বসানো মূর্তি গুলি নিয়েও নানাভাবে তুলনামূলক আলোচনায় বিশ্লেষণ করার সুযোগ থাকবে। ভালো- মন্দ বিচার করার নয়। সে বিচার অনেকেই করেছেন।

এবার কতগুলো তথ্য দিতে চাই। যেমন কলকাতার প্রথম মূর্তি কর্নওয়ালিসের। মূর্তিটি আসে ইংল্যান্ড থেকে। লন্ডনের জন বেকন এর শিল্পী ছিলেন। কিন্তু মূর্তি শেষ হওয়ার আগেই এই শিল্পীর মৃত্যু হয়। তাহলে কি আর বসবে না মূর্তি? তখন দেখা গেলো বেকনের সন্তান জুনিওর জন পিতার অসমাপ্ত মূর্তিটি শেষ করলেন। আর্ল হো জাহাজে মূর্তি আসে। ইংল্যান্ডের পোর্টস মাউথ বন্দর থেকে মূর্তি রওয়ানা দেয় এসবও জানা যায় খবর থেকে। এই যে স্টুডিয়ো সিস্টেম।একজন শিল্পীর কাজ শেষ করছেন আরেকজনের, এ হল এক ধরণের গ্রুপ আর্টের চর্চার নিদর্শন। এমন ধরণের নিদর্শন দেখার সুযোগ হলে ক্ষতি কি। তাই ফিরিয়ে আনা হোক কলকাতার রাস্তায় বসা এই জাতীয় মূর্তিগুলি যা এসেছিল কলকাতায় বসানোর জন্যেই। কিন্তু মূর্তি গুলি এখন পড়ে আছে লাট বাগানের অন্দরে গভর্নর এস্টেটে। সেখানে গিয়ে গবেষণার সুযোগ কোথায় ? আর কত যত্ন করে যে মানুষগুলি কলকাতাকে চোখেও দেখেননি তাঁরা নির্মাণ করেছিলেন মূর্তিগুলি সে কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না। কর্নওয়ালিস কেমন লোক তা দিয়ে আমাদের কি হবে? আমরা একটু অন্য ভাবে দেখতে চাই। হ্যাঁ, আমরা এটাও দেখতে চাই কি ভাবে ব্রিটিশ প্রভুরা মূর্তি বসিয়ে নিজেদের প্রতীকী উপস্থিতিকে জাহির করেছিলেন। কি ভাবে গ্রেকো- রোমান প্রতীকের প্রাচুর্যে নিজেদের দেবতা বানিয়েছিলেন। এগুলি শিল্পকলা চর্চার আবশ্যিক অঙ্গ। ভিক্টোরিয়ার অন্দরে আছে কর্নওয়ালিসের মূর্তি। আমাদের কজনের জানা আছে তার প্রতীকী তাৎপর্য।

কর্নওয়ালিস এখানে পাক্কা রোমক জেনারেল। মূর্তিটি ট্রায়াড শৈলীতে তৈরি। রেনেসাঁসে মাঝখানে প্রধান চরিত্রকে রেখে দু পাশে ভক্তদের চরিত্র রাখা হত। অথবা মাঝখানে মেরি আর তাঁর দু পাশে যীশু ও জন কে রাখা হত। মাঝের জন হতেন দৈবিক চরিত্র। কর্নওয়ালিসের ক্ষেত্রেও এমনটাই দেখা গেলো। তিনি মাঝখানে আর তাঁর দুপাশে পায়ের কাছে তাঁর ভক্তরা। এঁদের মধ্যে এক রমণীর হাতে রয়েছে সাপ। গ্রীক পুরাণে সাপ হল ভুমির প্রতীক। আমাদের মনে রাখতে হবে কর্নওয়ালিস ভুমি রাজস্ব আইন করেছিলেন। অর্থাৎ দেশের ইতিহাস পড়া যায় মূর্তিতে। এই ট্রায়াড শৈলী অবলম্বন করে তাঁকে দেবতা বানানো হয়েছিলো তাঁর জীবদ্দশাতেই। এই ট্রায়াড শৈলীর মূর্তি দেখার সুযোগ আর কোথায়?  তিনি টিউনিক পরিহিত রোমক জেনারেলের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে রয়েছে একটি শিং মূর্তি। এই শিং টিকে বলা হয় কর্ণকুপিয়া বা হর্ন অব প্লেন্টি। যা প্রাচুর্যের প্রতীক। রোমক কাহিনী অনুযায়ী ষণ্ড রূপী নদ দেবতা আকেলাউসের শিং ভেঙে তাঁকে পরাস্ত করেছিলেন হারকিউলিসএবং তাঁর ভালোবাসার পাত্রীকে উদ্ধার করেছিলেন। সেই থেকে সেই আকেলিউসের ভাঙা শিং সারা বছর ফুলে ফলে ভরে থাকতো। অর্থাৎ কর্নওয়ালিস যেন সেরকম বীর যার আমলে দেশ ভরে থাকবে প্রাচুর্যে। আর যিনি হারকিউলিসের মতো তাঁর আকেলা উসমানে টিপু সুলতানকে পরাস্ত করেছিলেন। এই যে মূর্তির গায় জড়িয়ে জাপ্টে থাকা কাব্য এরকম হাজার কাব্য ও শৈলীর গল্প আজ পড়ে আছে লাট বাগানে।

আসলে কি ভাবে গ্রেকো- রোমান ধারায় সেই সময়ের রয়্যাল আকাদেমিতে শিল্প চর্চা হচ্ছে তা জানা যায় এই মূর্তি গুলি থেকেই। কোনও সমর নায়ক পূর্ব দিকে মাথা ঘুরিয়ে আছে। মানে সে তখন পৃথিবীর পূর্ব অভিযানের নেতা। কোনও সমর নায়ক পড়ে আছেন রোমান পণ্ডিতের পোশাক মানে সে চায় ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শিক্ষা নীতির প্রসার। কোনও সমর নায়ক হাতে ধরে আছেন ক্রুশের মতো তলোয়ার। সে চায় ক্রুসেডের মতো এ দেশে বাইবেলের প্রচার। সব মিলিয়ে ভারতেরই ইতিহাস পড়ে নেওয়া যায় ওই সব লাট- বড় লাটের মূর্তিতে। আমাদের দেশের ভিসুয়াল কালচারের চর্চার স্বার্থেই তো বসানো যেতে পারে মূর্তিগুলি। আমাদের দেশে কলকাতার স্ট্যাচু নিয়ে দু একটি প্রামান্য কাজ হলেও প্রতীকগুলিকে পড়ে দেখার চেষ্টা হয় নি। মনে রাখা দরকার ওই প্রতীকের আড়ালেই পড়তে হবে দেশের ইতিহাস।

তাই ফিরিয়ে আনা হোক মূর্তি গুলি, ইতিহাসের পাঠ নিতে। মাথা নোয়ানোর গল্প শুনতে নয়। তা ছাড়া ভাবা যাক লাট বাগানে পড়ে থাকা সম্রাট পঞ্চম জর্জের মূর্তির কথা। মূর্তিটি গড়েছিলেন উইলিয়াম ম্যাকমিলান। পঞ্চম জর্জের স্ত্রী মেরি নিয়মিত স্টুডিওতে গিয়ে শিল্পীকে পরামর্শ দিতেন। কিন্তু আজ আমরা কজন জানি যে মূর্তির জন্যে তোলা তহবিলের যে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হয়নি তা তুলে দেওয়া হয়েছিলো বঙ্গীয় যক্ষ্মা নিবারণী সমিতিকে।

তথ্য ঋণ
কলকাতার স্ট্যাচু- কমল সরকার।
ওপেনটি বাইস্কোপ- শোভন সোম।
হিকির গেজেট।
ইউরিপিয়ান এক্সত্রাক্তস ১৮০৩ লন্ডন।

Developed by DXDasia