শ্রীজাতের বিরুদ্ধে এফআইআর

কখনও গোঁফ কখনও ত্রিশূল কবিরা কোথাও নিরাপদ নয়। কিন্তু এটাই তাদের অহঙ্কার।

ভাবছি, মণিভূষণ ভট্টাচার্যের গান্ধিনগরে রাত্রি বইটা নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে থানায় যাব। এফআইআর করব। কারণ ওই বইয়ের বেশ কিছু লেখা আমার ভাবাবেগকে দারুণ ভাবে আহত করেছে। স্বাধীনতা দিবস নামের একটা কবিতায়, মণিভূষণ লিখেছেন, লোক জন নিশ্চয় পাগল, না হলে কি এই দুর্ভিক্ষের বাজারে অত খানি রঙিন কাপড় কেউ নষ্ট করে! তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নাম না করে, তিনি লিখেছিলেন, ভাত দে হারামজাদি। এই যে বললাম, ভাবাবেগ আহত হয়েছে, এই ভাবাবেগ মাপবে কে? শুনেছি থানায় নাকি ভাবাবেগ মাপার যন্ত্র আছে। মেটাল ডিটেকটরের মত যন্ত্র, সেটা পুলিশ বুকের কাছে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বলে দেবে, হাফ কেজি ভাবাবেগ গলে গেছে। এত দূর বলার পর এক সাংবাদিক বন্ধু বললেন, তুমি ব্যাপারটাকে হালকা ভাবে দেখছ।

না। বিষয়টি হালকাও নয়, নতুনও নয়। রবীন্দ্রনাথের বাড়ির সামনে কংগ্রেস বিরাট বিক্ষোভ দেখিয়েছিল, কবি বিদেশি পণ্য বর্জন সমর্থন করেননি বলে। ‘টেগোর ইন ব্রিটিশ প্রেস’ বইয়ে এই খবরটা যে কেউ দেখে নিতে পারেন। সব রাজনৈতিক দলই লেখক কবিদের কব্জা করার চেষ্টা করে। নানা ভাবে। এই সমস্যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও পড়তে হয়েছিল, বাদ ছিলেন না সলিল বা ঋত্বিকও। মাত্র কয়েক বছর আগে, কবি জয় গোস্বামীকে তৎকালীন শাসকদলের দৈনিক মুখপত্রে এবং ওই শাসকদলের অনুগামী কিছু দৈনিকে যে ভাষায় গাল দেওয়া হয়েছিল, যে কেউ জাতীয় গ্রন্থাগারে গিয়ে সেই ফাইল দেখতে পারেন। এই ক’দিন আগেও শাসকদলের কাছের এক দৈনিকে নোংরা ভাষায় গাল দেওয়া হয়েছে কবি শঙ্খ ঘোষকে। মনে আছে, বিনপুরের বিধায়ক নরেন হাঁসদা একবার সন্ধ্যাবেলায় খবরের কাগজের অফিসে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা বই হাতে। বই খুলে একটা জায়গা দেখালেন। যেখানে ‘সাঁওতাল মাগি’ বলে একটা কথা আছে। নরেন বললেন, এটা সাঁওতালদের পক্ষে অসম্মানজনক। তাদের ভাবাবেগকে আঘাত করবে। আমরা যদি এটা নিয়ে খবর করি। নরেন হাঁসদাকে বললাম, সুনীল গাঙ্গুলি ওই ধরনের মানুষ নন, কাউকে ছোট করার জন্য এটা লেখেননি, আপনি এটাতে অত গুরুত্ব দেবেন না। নরেন বুঝলেন এবং চা খেয়ে চলে গিয়েছিলেন। থানায় গেলে কী হত কে জানে!  রাজনৈতিক দল, এবং তার হ্যাঁ হ্যাঁ বলা সংয়েরা, কখনই বিরুদ্ধ মত সহ্য করতে পারে না। এ তো অতি পুরনো কথা। শিলিগুড়ির ওই ভাবাবেগবাবু বরং গাল টাল না দিয়ে থানায় গেছেন নালিস করতে। থানায় গেছেন, কারণ এখানে তার প্রাণের দলটির পায়ের নীচে মাটি হয়তো আছে, কিন্তু তা কতটা শক্ত, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে বলেই।

একটা কাজে আমি তখন ক’দিনের জন্য বরোদায়। এক দিন শুনলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবির প্রদর্শনী এক দল যুবক এসে হিন্দুত্বের স্লোগান দিতে দিতে ভেঙে দিয়ে গেছে। কারণ? ওখানে একটা ছবি ছিল এক বহুরূপীর। সেখানে বহুরূপী শিব সেজে ট্রেন ধরবেন বলে একটি স্টেশনের সিমেন্টের আসনে বসে সিগারেট খাচ্ছেন। গাঁজা হলে হয়তো পার পেয় যেত, কিন্তু শিবের মুখে সিগারেট, ভাবাবেগে দুম দাম করে আঘাত লেগে গেল। ওই রাজ্য ওদের শক্তি বেশি। তাই এফআইআর নয়, সরাসরি অ্যাকশন। একই ভাবে শ্রীজাতর লেখায় শিবের ত্রিশূলের কভার ওদের পছন্দ হয়নি। কিন্তু দম কম বলে এফআইআর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের কলার ধরে বের করে আনার শখ তো সেই কবেকার। কিন্তু দম কম বলে হচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যদি ভবিষ্যতে এই সব ভাবাবেগবাবু এবং তাদের নেতাদের ভোট দেয়, তখন সে সব খেলও দেখা যাবে। ফলে ব্যাপারটা মোটেই হালকা নয়। শুরুটা এভাবে মিন মিন করেই হয়।

গত তিরিশ বছরে যাদের হাতে কোনও কবিতার বই দেখিনি, তাদের অনেককে বলতে শুনছি, শ্রীজাতর লেখাটা নাকি তেমন কবিতা হয়নি। না হয়নি। কালের নিরিখে সুকান্ত, নজরুলেরও অনেক লেখা দুর্বল কবিতা। কিন্তু ওই লেখার কখনও কখনও ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিদ্রোহী, বোধন থেকে বাবরের প্রার্থনা, সেই একই সুতোয় গাঁথা। ১৯৭৭ সালে আমরা যখন বন্দিমুক্তির দাবিতে রাস্তায় মিছিল করছি, কারার ওই লৌহ কপাটই ছিল আমাদের ভাষা।

রুশ কবি ওসিপ ম্যান্দেলস্টামকে স্তালিন ১৯৩৩ সালে জেলে ভরে দেন। কবির সব লেখা পুড়িয়ে ফেলা হয়। স্ত্রী নাদেজদা একটা কারখানায় নাইট শিফটে কাজ নিলেন। সারা রাত ছুটে ছুটে কাজ করতেন আর স্বামী কবিতাগুলো বিড় বিড় করে আউড়ে যেতেন। যাতে কোনও দিন স্মৃতি থেকে কবিতাগুলো ফের লিখে ফেলতে পারেন। কী লিখেছিলেন ওসিপ ম্যান্ডেলস্টাম? তিনি একটি ব্যঙ্গ কবিতা লিখেছিলেন।  গোটা কবিতায় ছিল, একটা দেশ কী ভাবে ভয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। সেই লেখায় এক জনের গোঁফ ছিল আরশোলার মতো। স্তালিনের মনে হয়েছিল, ওটা তাঁর গোঁফ নিয়ে ঠাট্টা করা হয়েছে।

কখনও গোঁফ। কখনও ত্রিশূল। কবিরা কোথাও নিরাপদ নয়। এটাই তাদের অহঙ্কার।

Developed by DXDasia