জেল ভাঙার ডাক – ধরা পড়লেন চারু মজুমদার

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৮৩তম পর্ব

জেলের ওয়েলফেয়ার অফিসার আমার খুব নিকটজন হয়ে উঠেছিলেন ক’মাসের মধ্যে। আমি ওনার কাছে বাইরে থেকে রাজনৈতিক বইপত্র আনার আবেদন করলে উনি জানালেন – ডাইরেক্ট বইপত্র আনায় অনেক ঝামেলা। গেটে বই জমা পড়বে, সেটা আবার গোয়েন্দা বিভাগের কাছে যাবে, তারা পারমিশন দিলে উপযুক্ত ছাপ্পা মেরে সেই বই আসবে। সে অনেক হেপা। উনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, “আমি যখন ডিউটিতে আসব, তখন আপনার দিদিকে আমার হাতে বই দিয়ে দিতে বলবেন। আমি ভেতরে এনে ‘সেনসরড অ্যান্ড পাসড’ ছাপ্পা মেরে আপনাকে দেবার ব্যবস্থা করব। কাউকে জানানো চলবে না কিন্তু।”

যতদিন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ছিলাম, তিনি এ সাহায্য বজায় রেখেছিলেন। আজ তাঁর নাম মনে না থাকায় খুব খারাপ লাগে। তাঁর ছাপ মারা ও সই করা বাংলায় মার্কস-এঙ্গেলস রচনাবলীর (রুশি) প্রথম খণ্ড এখনও আমার কাছে আছে। 

(গত পর্বের পর)

এদিকে জেলের বাইরে চারু মজুমদারের আহ্বানে ১৯৭১ সালের মধ্যে ভারতের সমস্ত জেল ভেঙে ফেলা ও ১৯৭৫ সালের মধ্যে সারা ভারতকে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ তথা কৃষিবিপ্লবের মাধ্যমে মুক্ত করার আহ্বানে ওই গোষ্ঠীর কমরেডরা সংগ্রামে উদ্বেল। নানা জেল ভেঙে কমরেডরা পালিয়ে গেছেন – এ খবর জেলে এসে পৌঁছতেই এখানকার কমরেডরা স্লোগানে স্লোগানে জেল কাঁপিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি দেখতাম – সাগররা, ভোম্বলরা গ্রুপ গ্রুপ হয়ে ফিস ফিস করে কীসব আলোচনা করছে। আমি পাশ দিয়ে গেলে সাবধান হয়ে পড়ছে। অনুমান করেছিলাম – ওরাও বোধ হয় জেল ভেঙ্গে পালানোর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ওরা তো আমাদের কিছু জানাবে না। তবে ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার পর যে আক্রমণটা নেমে আসবে, সেটা শুধু নকশালদের ওপর নয়। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নির্বিশেষে সমস্ত বন্দিদের ওপর।

একদিন আমাদের মধ্যে আমি আলোচনা তুললাম। বললাম, বাইরের ঘটনা যেভাবে এগুচ্ছে, তাতে এখানে যে কোনো দিন যে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে এবং সেক্ষেত্রে পাগলি ঘণ্টা বাজা অবশ্যম্ভাবী। ওয়ার্ডের মধ্যে সাধারণ বন্দিদের দায়ভার তখন আমাদের নিতে হবে, তাদের ওপর আঘাত এলে প্রতিরোধ করতে হবে। সামনের সারিতে লড়তে হবে আমাদের। ঠিক হল, যদি পাগলি হয়, তবে ওয়ার্ডে ঢোকার মূল গেটের দায়িত্বে থাকব আমি। যাতে তালা ভেঙে জেল সেপাই ও মেটরা ভেতরে ঢুকতে না পারে। আর অন্যান্য কমরেডরা ইট-পাটকেল এবং প্রয়োজনে বারান্দার চালার টালি ভেঙে টালির টুকরোকেই মিসাইলের মতো ব্যবহার করবে শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে। 

কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে গেল চারু মজুমদারের ধরা পড়ে যাওয়ার ঘটনা। তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে আসবে। তাই একটি ডিভিশান ওয়ার্ডকে সাজানো গোছানো আরম্ভ হল। সেন্ট্রাল জেল খালি করে সমস্ত ‘নকশাল’ বন্দিদের বিভিন্ন জেলে পাঠানো হতে লাগল। কিন্তু সে প্রক্রিয়া শেষ না হতেই চারু মজুমদারের মৃত্যুর খবর কমরেডদের শোকে স্তম্ভিত করে দিল। কিছুদিন পরে একটা সামান্য কারণে জেলে সত্যি সত্যি পাগলা ঘন্টি বেজে উঠল, সময়টা সকাল সাতটা-আটটা হবে। 

আলিপুর সেন্ট্রাল জেলটা বৃত্তাকার। বৃত্তের একভাগে রয়েছে জেল ওয়ার্ড, হাসপাতাল, ডিভিশন ওয়ার্ড, কনডেন্স সেল, আরেক অংশে রয়েছে জেলের রসুইখানা, একটি প্রেস – যেখানে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করত, মেন গেট, তার পাশে কারা অফিস, ইন্টারভিউ-এর স্থান, ওয়েলফেয়ার অফিসারের অফিস, ফাঁসি দেবার জায়গা। মাঝখানে একটা বিশাল গাছ। তার গোড়ায় হেড জমাদারের আস্তানা। আমাদের ওয়ার্ডের সামনে ছিল মনুমেন্টের মতো একটা টাওয়ার। সে টাওয়ার থেকে সারা জেলকে লক্ষ করার ব্যবস্থা। সর্বদা দু’জন সম্ভবত ওখানে ডিউটিতে থাকতেন। জেলের পুব দিক দিয়ে বয়ে গেছে আদিগঙ্গা। দক্ষিণে আলিপুর রোড। কিছু দূরে প্রেসিডেন্সি জেল। 

আমাদের ওয়ার্ডের পরেই উঁচু টিনের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা যে ওয়ার্ডটা ছিল, তাতে আঠারো বছর এখনো হয়নি, এমন বন্দিরা থাকত। সেখানেও বেশ কিছু ‘নকশাল’ ছেলে ছিল। আমাদের ওয়ার্ড যেখানে শেষ হয়ে টিনের পাঁচিল শুরু হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ‘বয়েজ ফাইলের’ কয়েকটা ছেলের সঙ্গে আমাদের ওয়ার্ডের কেউ নাকি কথা বলাবলি করতে গেলে অ্যাসিসটেন্ট মেটরা তাদের সরিয়ে দিতে যায়। বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ছেলেরা ধরাম ধরাম করে টিনের দেওয়ালে ইট পাটকেল ছুড়ে মারা আরম্ভ করলে একজন জেল সেপাই বাঁশি বাজাতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে পাগলি ঘন্টি বেজে ওঠে। 

সকালবেলা ওয়ার্ডের গেট খুলে দেওয়ার পর আমরা বারান্দা-রেলিং ঘেরা জায়গাটুকুতে ঘোরাফেরা করতে পারি, স্নান-পায়খানা করে নিতে পারি। আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ টিফিন দেওয়া হলে বন্দিদের ওয়ার্ডে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেওয়া হয়। ওয়ার্ডে ঢোকার মূল গেটে সব সময় তালা দিয়ে একজন জেল সেপাই ডিউটিতে থাকেন। লোহার গ্রিলের গেটে শেকল দিয়ে একটি তালা বন্ধ অবস্থায় থাকে। চাবি সেপাইয়ের কাছে।

(চলবে…) 

Developed by DXDasia