
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭৩তম পর্ব
ভোর হল। ভটভটির একঘেয়ে শব্দ কমে আসতেই লোকজন নামার জন্য তৈরি হওয়া শুরু করল নিজেদের মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে। দেখি ফেরিঘাটে আমাদের স্বাগত জানাবার জন্য একদল পুলিশ রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সব যাত্রী ও মালপত্র নেমে যাওয়ার পর আমাদের সঙ্গে আসা পুলিশেরা ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশদের হাতে আমাদের তুলে দিয়ে কী সব কাগজপত্র সইসাবুদ করতে চলে গেল। ঘাটের পুলিশরা আমাদের দু’জনকে আর গরুচোরদের আলাদা জোড়া হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে দিল। আমাদের দু’জনকে নিয়ে একটা পুলিশ ভ্যান শহরে ঢুকল। দোকানপাটে্র সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম, আমরা চলেছি বসিরহাটে। পুলিশদের কাছ থেকে জানলাম, আমাদের বসিরহাট পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গাড়ি ওই দপ্তরের গেটে এসে পৌঁছল। পুলিশরা জোরে কী একটা সংকেত বলে চেঁচিয়ে উঠতেই গেট খুলে দিল পাহারাদারেরা। গাড়ি ভেতরে ঢুকে গেল। থানা লক-আপে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে এই পুলিশদের কাজ শেষ।
(গত পর্বের পর)
ছোট্ট একটা গারদ ঘর। একটা বড়ো জানলা ডান দিকে। তা দিয়ে ওই সদর দপ্তরের প্রায় সবটা দেখা যায়। বিশাল চত্বর।। তার একদিকে রয়েছে থানার বড়োবাবুর ঘর। অন্যদিকে পুলিশদের কোয়ার্টার। তবে থানার মূল গেটটা অনেকটাই দূরে থাকায় রাস্তার লোকজনকে কিছু দেখা যায় না। আমাদের দরজায় একজন রাইফেলধারী পুলিশ পাহারায় নিযুক্ত।
এখানেও আবার শুরু হল পালা করে পুলিশি ভাষায় ‘ইন্টারোগেশন’। রবিন দাস ও হরিপদ দাস যে আমাদের আসল নাম নয়, তা বুঝতে পুলিশের কোনো অসুবিধে হয়নি। তাই আমাদের আসল নাম ও ঠিকানা, আমাদের মূল রাজনৈতিক আস্তানা কোথায়, আমাদের লোকজন এখানে কে কোথায় আছে, পালা করে এটা জানার প্রচেষ্টা চলল দিন তিনেক ধরে। আমরা একই কথা বলে চলেছি দু’জনে। এমন সময় ঘটল এক মজার ঘটনা!
আরও পড়ুন
দ্বীপের জঙ্গলে গুলি করা হবে আমাদের!
বসিরহাট পুলিশ হেডকোয়ার্টার হওয়ায় এখানে অধিকাংশ পুলিশের যাতায়াত লেগেই থাকে। গাড়ি থেকে নামার পর একবার থানা লক-আপের জানলা দিয়ে দেখা ওদের রোজকার অভ্যেস। আমাদের লক-আপের গেটে প্রতিদিন যাকে পাহারায় নিযুক্ত থাকতে দেখেছিলাম, তাকে একজন তরুণ বলা যেতে পারে। ধীরে ধীরে তার সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠতে আমাদের দেরি হল না। আমরা রাজনৈতিক বন্দি ও আমাদের রাজনীতি যে আলাদা আলাদা ভাবনায় পুষ্ট, তাও পুলিশের বড়োবাবু থেকে সাধারণ পুলিশরা বুঝে ফেললেন তাড়াতাড়ি। কিন্তু আমাদের আসল পরিচয় আবিষ্কার না করা পর্যন্ত আমাদের ওপর যে মানসিক অত্যাচার চলবেই, তাও আমরা বুঝতে পারলাম। অচিরেই সকালের পাহারাদার তরুণ পুলিশটি আমাদের সত্যি সত্যি বন্ধু হয়ে উঠল। তারই দৌলতে চিঠি লেখার জন্য একটি ইনল্যান্ড লেটার পেলাম। বন্ধুটি আমাদের জন্য একটি ছেঁড়া কম্বলের টুকরো এনে দিল। শিখিয়ে দিল, কখন কীভাবে আমরা চিঠি লিখব, তার পায়ের শব্দ পেলেই কীভাবে তা কম্বলের টুকরোর নিচে চালান করে দিয়ে ভালোমানুষ হয়ে বসে থাকব। অচিরেই আমাদের বন্দি হওয়ার সংবাদ সমীরদার কাছে পৌঁছে গেল। আমরা একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলাম যে ক্যানিংয়ের ঘরে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসে কেউ আর পুলিশের ফাঁদে পড়বে না।
অন্যান্য পুলিশরা অনেকেই ধীরে ধীরে আমাদের পরিচিত হয়ে উঠল।এ পর্যায়ে একটা ঘটনা ঘটে আমাদের এতদিনের গোপনীয়তাকে একেবারে চুরমার করে দিল। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সন্ধেবেলা ডিউটি শেষে এক পুলিশ গারদে উঁকি মেরে আমাকে দেখে অবাক বিস্ময়ে বলে উঠলেন, “আরে, আপ ইধার?”
আরও পড়ুন
লক-আপে কথা বলার মতো দু’জনকে পাওয়া গেল!
পুলিশটি আমার চেনা। আমাদের চাঁপাদানির বাড়ি থেকে সামান্য দূরে একটা পাড়া আটাপাড়া নামে পরিচিত। শ্রমিক ও বাড়িতে কাজ করে এমন নারীদের আধিক্য সেই পাড়ায়। শ্রমিক ও গরিব মানুষের বাস হওয়ায় সেখানে আমাদের যাতায়াত বেশি ছিল। রাজনৈতিক আড্ডা দেওয়ার ফলে বন্ধুবান্ধব হয়ে উঠেছিল অনেক। তেমনই এক বন্ধুর বাড়িতে এই পুলিশটি ভাড়া থাকতেন পরিবার নিয়ে। সম্ভবত চন্দননগরের দিকে ডিউটি করতেন। ওনারা বিহারনিবাসী মানুষ। আমাকে চিনতেন, জানতেন নামধামও। এবার কর্তৃপক্ষ আমার নাম জেনে গেলে হরিপদ আর নাম গোপন করল না। স্বাভাবিকভাবে ওনার নির্দোষ আনন্দের ফল পরিণতিতে আমাদের নাম জেনে গেল পুলিশ। কিন্তু আমরা যতদিন বসিরহাটের ওই পুলিশ গারদে ছিলাম, তিনি ‘অপরাধী’, ‘অপরাধী’ মুখ করে আমাদের সাহায্য করে গেছেন।
(চলবে…)
